আমি সংশোধনের আশা করছি, আপনার আমার আগামীর পথচলায় সকলের। বিচার হলে সব কিছুরই যেন রাষ্ট্র সর্বোচ্চ ও নির্মোহ বিচার করে। একটা নিরপেক্ষ জুডিশয়াল বিচার কাঠামোর আওতায় যেন সাম্প্রতিক হতাহত ও নিরীহ ছাত্র আন্দোলনের সত্যিকারের ভিকটিমদের একটা বিচারিক সুরাহা করবে রাষ্ট্র, যা কিনা দেশের অধিকাংশ মানুষের জন্য স্বস্তির নিশ্বাস হবে- গ্রহণযোগ্য হবে।
পাশাপাশি, আমি এদেশের ইতিহাসে বাংলাদেশের জন্মলগ্ন সেই একাত্তর হতে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সকল রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, ক্ষমতার অপব্যবহার, সামরিক শাসনসহ সকল প্রকার রাষ্ট্র কর্তৃক ঘটানো দুষ্কর্মের একটা নিদেনপক্ষে খতিয়ান জনসম্মুখে প্রকাশ করার জন্য দাবি তুলে ধরছি। ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের আজকের দিনের নানান অনভিপ্রেত ও অনাকাক্সিক্ষত জটিল ঘটনার সাথে পূর্বে ঘটে যাওয়া অনেক জাতীয় পর্যায়ের আজ অবধি অমীমাংসিত বিষয়ের পরম্পরা বিদ্যমান ও বলবৎ আছে। এদেশের নতুন প্রজন্ম সকল কিছুই যেন ওয়াকিবহাল হয়। সবার সব জানার অধিকার আছে। রাষ্ট্রের কলঙ্কজনক সব অধ্যয় উন্মোচিত হোক। তারপর তরুণাই ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করুক আপন মহিমায়।
আমার সঙ্গে আপনার সবকিছুতেই মিল খুঁজে পেতে হবে এমন কথা নেই। কিন্তু এই রাষ্ট্র আমাদের সবার। এই রাষ্ট্র আমাদের প্রজন্মের। দেশে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনার মধ্য নিহিত সকল তাজা প্রাণের জন্য মাগফিরাত কামনা রইল।
সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য আর নয়, মানুষ সহ্য করে না, সন্মান করে না, বিশ্বাস করে না এমন নেতারা কেন এখনও বক বক করে। চেয়ার-টেবিল থাকলেই কথা কখন বন্ধ করতে হবে সেই কমনসেন্স অন্তত থাকা উচিত। দলের নেতা এক জিনিস আর গণমানুষের আস্থার প্রতীক আর এক কথা। টকশোতে একই অবস্থা। বিশেষ একজন বক্তার অসম্ভব নোংরা ব্যবহার মানুষের তিরস্কার কেবল কুড়িয়েছে। দলে তো এখনও কিছু সৎ, আদর্শবান ও মানুষের পালস বুঝে কথা বলে; এমন কিছু নেতা এখনও তো আছে।
একটা জিনিস আমি বুঝতে পারছি না যে, কেন আমাদের রাজ্য পরিচালিত যোগ্য সংস্থা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে খারাপভাবে ব্যর্থ হয়েছে, একটি সম্ভাব্য শক্তিশালী ‘কোটাবিরোধী’ সিস্টেম আন্দোলনের খুব গুরুত্ব এবং প্রভাব উপলব্ধি করতে বা উপলব্ধি করতে বা এমনকি উপলব্ধি করতে পারে সাধারণ ছাত্রদের দ্বারা, এত অল্প সময়ের মধ্যে।
আমি শিক্ষার্থীদের অধিকারকে খর্ব করছি না তাদের ন্যায্য উদ্বেগ বা কষ্ট দূর করতে যা তাদের থাকতে পারে। তাদের বৈধ দাবি সম্পর্কিত শান্তিপূর্ণ মিছিল বের করতে তাদের অনুমতি দেওয়া উচিত। কিন্তু এই ধরনের কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনার উপর নজর রাখা এবং উল্টো উদ্দেশ্য বা এর সম্ভাব্য প্রভাবগুলো পর্যবেক্ষণ করা, অবশ্যই সতর্কতা এবং আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সমস্ত শীর্ষ মেশিনারি দ্বারা অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টি আকর্ষণ করার আহ্বান জানান।
কিন্তু তখন, এখন এটা ছিল বলে মনে হচ্ছে না। বরং, পুরো ব্যাপারটাই প্রায় হাতের বাইরে, ঠিক বলতে গেলেÑ যদি আমি একদম ভুল না হই। কিন্তু আন্দোলনের পুরো পর্বটি ধীরে ধীরে জ্বলতে দেওয়া এবং এখন এটি একটি আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হওয়া প্রত্যক্ষ করা, আইন-শৃঙ্খলার হুমকি পর্যবেক্ষণের কাজ দেওয়া হয়েছে তাদের জন্য সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য এবং ক্ষমা করা যায় না। আমি অসহায়ভাবে হতাশ বোধ করি এই চিন্তা করে, কেন, এই মানুষগুলো চরম চরম চরম চরম, তাই অস্বস্তিকর উদাসীনতার উপর এটি হারিয়ে যাক এবং এটি একটি প্রান্ত বা ফিরে-কোন- স্থানে ঠেলে দেয়।
সহনশীল কেউ কি আর আছে আমাদের এই ষড়যন্ত্রের ভূখণ্ডে। সবকিছুই লণ্ডভণ্ড এত বছর পরেও। রাজনীতি তো ধৈর্যের খেলাÑ মনন ও মেধার খেলা। সেই চেষ্টা কাজ করে কি আর আমাদের মাঝে। এমন দেশ এখন যে, টিভির সামনে দাঁড়ানোর মানেই আপনি বিশাল নেতা।
একজন প্রধানমন্ত্রী শত শত কাজ করেন, আর আমার-আপনার কাজ ও কথা ভুলে ঠাসা। এতই ভুল চারিদিকে। অন্যতম বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ও হঠকারিতা। সাধারণ মানুষ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চায় একটু। অনেক আগে থেকেই কিছু অপরিহার্য কথা বলার শুরু করেছিলামÑ যা সার্বজনীন বলে ভেবেছি। নিজেদের কত কিছুই না নিয়ে একধরনের সমালোচনাও করেছি। সাহসের সাথে কথা বলেও কোন ফায়দা তেমন নেই। আমি হতাশ নই, কিন্ত আশ্বস্ত হতে পারছি না। এই সোনার বাংলাদেশ এত ভাগে ভাগ। আহা!
রাজনীতিবিদদের অতি কনফিডেন্স খারাপ একটা দিক। বিশেষত, বাংলাদেশর মতো বহুদা বিভক্ত চিন্তার খোরাক যে দেশে বিদ্যমান, সেখানে প্রতিদিন জনমত ঝালাই করে নিয়ে কাজ করার জন্য কম বুদ্ধির একজন মানুষ হিসেবে সুপারিশ করলাম। আর আল্লাহর ওয়াস্তে, সবাই কথা বলেন তাতে আপত্তি নেই; কিন্ত পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য কল্যাণকর চিন্তা মাথায় রাখা জরুরি। সাধু সাবধান!
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, ভাল বোধ শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে। সরকার ও আন্দোলনরত ছাত্র আন্দোলন নেতারা টেবিলে বসলেই দেশের বিভিন্ন পর্যায় ও কোনায় এই দুর্ভাগ্যজনক ‘বিদ্বেষী পরিস্থিতির’ একটি বিচক্ষণ সমাধান অবিলম্বে পৌঁছে দেওয়া যাবে। সবকিছু ঠিক জায়গায় ফিরে যেতে বাধ্য। আমি আশাবাদী, আজকের মধ্যে যেকোনো সময় বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে, এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শীতল হবে।
সাধারণ ছাত্রদের বৈধ দাবি ঠিক বা বেঠিক, দখল করে রাজনৈতিক স্বার্থে হাইজ্যাক করতে দেওয়া হোক না কেন, অন্যদের ক্যু উদ্দেশ্য নিয়ে। ছাত্রলীগ, পুলিশসহ আরও অনেকেই কিছু ভুল আচরণ করে থাকতে পারে। সাধারণ ছাত্রদের কাছে ডেকে তাদের কথা শুনে যুক্তিযুক্ত আশ্বাস দিলে আমি নিজেও খুব খুশি হতাম। কথা ও আলোচনার প্রয়োজন আছে। সবাই তো এই দেশের ছেলেপুলে। জীবন নিয়ে তাদের প্রচণ্ড আক্ষেপ আছে, থাকা স্বাভাবিক বটে। এই জন্য যে, বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত কল্যাণকর রাষ্ট্র হয়ে উঠে নাই সবার জন্য।
বুঝলাম, সরকার উচ্চ আদালতের নির্দেশের জন্য সময় নিচ্ছিলেন। কিছুটা অনীহাও হয়তো প্রকাশ করেছেন করণীয় নিয়ে। নরম সুরে কথা বললে আরও উদার মনোভাবের পরিচয় হত। তাই বলে, গোটা দেশ মেধার নামে আগুনের উপর তুলে দেওয়ার এই ধরনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক কোটার আন্দোলন নয়। ধ্বংস মেনে নেওয়ার উপায় নেই। এটা এখন অনস্বীকার্যভাবেই অন্যদিকে ব্যবহার হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার আন্দোলন হয়ে যাচ্ছে।
লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা ও চেয়ারম্যান, শের-ই-বাংলা ফাউন্ডেশন