আর্নেস্তো চে গুয়েভারা। যার নামে বিপ্লব শব্দটি গেঁথে আছে। ইতিহাস তাকে স্মরণ করে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। এই কিংবদন্তী জন্মগ্রহণ করেছেন আর্জেন্টিনার রোজারিওতে । ছোটবেলা থেকে বইপড়ার অভ্যস্ত ছিলেন তিনি। খেলাধুলা ও কবিতা পড়া ছিল তার শখের মধ্যে অন্যতম। বই পড়েই তিনি পুথিগত জ্ঞানের বাহিরে গিয়ে অন্য জগৎ, ইতিহাস, সংস্কৃতি, শ্রেণিবৈষম্য সমপর্কে জ্ঞাত হোন। কিন্তু তার জীবনে আমুল পরিবর্তন ঘটে ভ্রমণের মাধ্যমে। চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশুনা শেষ না করেই তিনি তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে বেড়িয়ে পড়েন দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণে। সেটা আরেক বিস্ময়কর কাহিনি। দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমনের পিপাসা নিয়ে মোটর সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি এবং তার বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদো। তারা চিলি, ভেনিজুয়েলা ও পেরু ভ্রমণ করে। সেই ভ্রমণে গুয়েভারা বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সাথে কানেক্টেড হয়ে নিজেকে অন্যভাবে আবিষ্কার করেন। সমাজে শ্রেণিবৈষম্য কীভাবে সমাজকে বিভক্ত করে রেখেছে, শোষণ-উৎপীড়নের মাধ্যমে সমাজ দ্বিবিভাজিত হওয়ার কারণে আভিজাত এবং দারিদ্র্য সম্প্রদায়ের প্রতি যে অত্যাচার তা তিনি সেই ভ্রমণে খুব কাছ থেকেই অবলোকন করেন।
তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘মোটরসাইকেল ডায়েরি’তে তিনি লিখেন, ‘ভ্রমণের পর আমি নিজেকে অন্যভাবে খুঁজে পাই। আমার ভেতরে আমি আকস্মিক পরিবর্তন লক্ষ করি।’ নয় মাসের এই ভ্রমণ চে গুয়েভারাকে নিয়ে যায় রেভুল্যিউশনারি মনোভাবের দিকে। ১৯৫৩ সালে চিকিৎসা শাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন গুয়েভারা ৷ ১৯৫৪ সালে তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রে চাকরির জন্য চলে যান গুয়েতেমালায়। সেখানে গিয়ে উপযুক্ত কোনো চাকরি না পেয়ে তিনি অনেক ধরনের নিম্ন পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। পরবর্তীতে তিনি ধীরে ধীরে মার্ক্সবাদ নিয়ে পড়াশুনা করেন। মার্ক্সবাদ নিয়ে পড়াশুনা করে তিনি কমিউনিস্ট রাজনীতির সাথে মিশে যান। গুয়েতেমালায় সি-আইএর আক্রমণের পর সেই যুদ্ধে নিজেকে স্বেচ্ছায় জড়িয়ে ফেলেন গুয়েভারা। তখন থেকেই রাজনীতি ও বিপ্লবের সাথে নিজের নামকে উৎসর্গ করে দেন তিনি । অন্যদিকে কিউবায় স্বৈরশাসক বাতিস্তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন তৎকালীন সময়ের নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। ফিদেলের সশস্ত্র বিপ্লবীদেরকে বাতিস্তা সরকার কারাগারে আবদ্ধ করে রেখেছিল। কিন্তু বিপ্লবীদের তুমুল আন্দোলনের কাছে টিকতে না পেরে বাতিস্তা সরকার তাদেরকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এরপর বিপ্লবীরা নির্বাসিত হয়ে মেক্সিকোতে আবাস গড়েন। এবং ফিদেল সেখানে কিউবায় গেরিয়া আক্রমণের পরিকল্পনা করছিলেন। চে গুয়েভভারাও গুয়েতেমালা ছেড়ে চলে যান মেক্সিকোতে। সেখানেই তার সাথে দেখা হয় কিউবার বিপ্লবের মূল নায়ক ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে। ফিদেল কাস্ত্রোর সেই দলে গুয়েভারা যোগ দেন। চে গুয়েভারা প্রথমত চিকিৎসক হিসেবে যোগদান করলেও পরবর্তীতে গেরিলা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করেন ফিদেল। তার মুল নাম ছিল আর্নেস্তো গুয়েভারা, তবে আর্জেন্টাইন ভাষা কাউকে সম্বোধন করার জন্য তারা চে ব্যবহার করেন। এরপর থেকেই সবাই গুয়েভারাকে চে নামেই চিনেন। তিনি চে নামেই ছিলেন খ্যাত।
ফিদেল কাস্ত্রো এবং গুয়েভারা ছিলেন কাছাকাছি বয়সের। দুজনের মধ্যে আদর্শিক চেতনা ছিল অভিন্ন। সেই অভিন্নতার কারণে বিপ্লবের মাঝে এসেছিল প্রাণ। তাদের প্রত্যেকটা পরিকল্পনা ছিল যুক্তিনির্ভ ও সুচিন্তিত । তাদের বিপ্লবের কাছে স্বৈরশাসক বাতিস্তার পতন ঘটে। কিউবার মানুষদের অভিবাদনে সিক্ত হোন ফিদেল কাস্ত্রো। ফিদেল কাস্ত্রোকে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসানো হয়। গুয়েভারার প্রতি মানুষের ভালোবাসা ছিল সীমাহীন। নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশের স্বাধীনতার জন্য যে নিজেকে উৎসর্গ করে ফেলেন, তাকে ভালো না বেসে কি থাকা যায়? গুয়েভারাকে দেওয়া হয় কিউবার নাগরিকত্ব। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব এগ্রেরিয়ান রিফর্মের ডিপার্টমেন্ট অব ইন্ডাস্ট্রি প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় চে গুয়েভারাকে। ১৯৫৯ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক অব কিউবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া পান গুয়েভারা। দায়িত্ব পাওয়ার পর কিউবার শিল্পকরখানাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যান তিনি।
১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মদদে কিউবান বংশোদ্ভূত ১৫শ বিদেশি বেতনভোগী দক্ষিণাঞ্চল সমুদ্র উপকূল দিয়ে কিউবায় আক্রমণ করে এবং একটা অস্থায়ী সরকার গঠন করে। মূলত তারা যুক্তরাষ্ট্রকে কিউবায় আক্রমণ করার সুযোগ করে দিতে চেয়েছিল। বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যেই তাদেরকে প্রতিহত করা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য পিনার দেল রিও প্রদেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয় চে গুয়েভারাকে। কিউবার স্বাধীনতায় , দেশগঠন এবং বহিরাগত শক্তিকে প্রতিহত করার মতো পরিকল্পনায় মার্ক্সবাদী নেতা চে গুয়েভারার অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
চে গুয়েভারা কিউবা থেকে জাতিসংঘের সভায় অংশগ্রহণের জন্য গিয়েছিলেন। জাতিসংঘের সভায় তার ভাষণের একটি বাক্য আজও বিপ্লবীদের চেতনাকে স্ফূরিত করে। চে বলেন, patria o muerte, অর্থাৎ ‘মাতৃভূমি অথবা মৃত্য’ কিউবার স্বাধীনতার পর ও তিনি থেমে থাকেননি। বলা হয়ে থাকে, বিপ্লব যেখানে গুয়েভারাও সেখানে। ১৯৬৪ সালে গুয়েভারার সাক্ষাৎ হয় তামার বাংকেরের সঙ্গে, বলিভিয়াতে গেরিলা তৎপরতার জন্য তিনি তার সাথে নতুন করে পরিকল্পনা করেন। ১৯৬৫ সালে ১৪ মার্চ হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যান চে গুয়েভারা। তার এই নিরুদ্দেশ হওয়ার কারণে সবাই শঙ্কিত ছিল। ফিদেল কাস্ত্রোর বই ‘Che A memoir’-এ তিনি বলেন, হঠাৎ চে গুয়েভারাকে না পাওয়ায়, দেশের সকল মানুষ আমাকে দোষারোপ করছিল। ভেবেছিল আমদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরেছে। গুয়েভারাকে না পাওয়ার পেছনে আমার হাত ছিল, অথচ চে গুয়েভারা যাওয়ার সময় আমাকে একটা চিঠি দিয়ে গিয়েছিল। আমি সেই চিঠি জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য সময় চেয়েছিলাম, কিন্তু জনগণ আমাকেই দোষারোপ করছিল। চে গুয়েভারা সেই চিঠিতে ফিদেলকে কেন্দ্র করে লিখেন, আমার অতীত জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করে আমি বিশ্বাস করি, বিপ্লবের বিজয়ের জন্য আমি যথেষ্ট পরিমাণ শ্রম এবং নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছি। আমার গুরুত্বপূর্ণ ব্যর্থতার একটি হচ্ছে, সিয়েরা মায়েস্ত্রায় আমাদের কর্মপরিকল্পনার একেবারে গোড়ার দিকে আমি আপনার উপর তেমন বিশ্বাস রাখতে পারিনি এবং একজন নেতা এবং বিপ্লবী হিসেবে আপনার অনন্যসাধারণ গুণাবলী দ্রুত ধরতে পারিনি।
এতো বড় বিপ্লবী হয়েও তার নেতার প্রতি শ্রদ্ধা চে গুয়েভারা দেখিয়েছিলেন তা বিপ্লবীদের জন্য একটি রেখা বলা যায়। যে রেখা দিয়েই তৈরি হবে নববিপ্লব। চিঠির এই অংশ দেখে ফিদেলের প্রতি মানুষের ক্ষোভ নিমিষেই ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। সে চিঠিতে চে আরো লিখেন, আমার নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে আমি নিয়ে যাচ্ছি সে-বিশ্বাস যা তুমি আমাকে শিখিয়েছ, আমার জনগণের বিপ্লবী চেতনা, আর যেকোনো অবস্থা-অবস্থানে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার মতো দায়িত্ব পালন করার মনোভাব নিয়ে। এ-মনোভাব আমাকে প্রশান্তি দেয়; একইসঙ্গে আমার আহত হৃদয় উপশমেও সহযোগিতা করে। আমি আরো একবার বলতে চাই, কিউবার আদর্শ থেকে উদ্ভূত বিষয়াশয় ছাড়া অন্যসব বিষয়ে আমার উপর কিউবার দায়ভার থেকে কিউবাকে মুক্তি দিলাম।
কিউবার পর চে চলে গেলেন বলিভিয়ায়। চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক, কিউবার ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট , এতো উজ্জ্বলতা বিশিষ্ট অবস্থান পেয়েও তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছেন বিপ্লবের জন্য। বিপ্লব যার রক্তে তাকে কি আর ধরে রাখা যায়। যেখানে বিপ্লব সেখানেই গুয়েভারার চেতনা। যেখানে অন্যায় সেখানেই গুয়েভারায় রক্তস্রোতের তেজ। সে জন্যই বোধহয় ফিদেল বলেছিলেন, যেখানেই বিপ্লবের প্রয়োজন সেখানেই চে থাকবেন। অবশেষে সেই বলিভিয়াতেই সি-আইয়ের হাতে মৃত্যু ঘটে এই বিপ্লবীর। মৃত্যুর সময় চে বলেন, আমি জানি তুমি আমাকে হত্যা করতে এসেছো, গুলি করো কাপুরুষ, তুমি শুধু একজন মানুষকেই হত্যা করবে (তার বিপ্লবী চেতনাকে নয়)। মাত্র ৩৯ বছর বয়সেই নিভে যায় একটি জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড। আজও তার চেতনা সারা পৃথিবীতে মানুষের মনে জাগ্রত। বিপ্লবের কথা আসলেই গুয়েভারা হয়ে যান সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়