দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ব্যারাকে কর্মরত এক নারী পুলিশ সদস্যকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে একই থানার পুলিশ সদস্য সাফিউর রহমানের বিরুদ্ধে। ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে গত ছয়-সাত মাস ধরে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ওই নারী।
এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) ওই নারী পুলিশ সদস্য, অভিযুক্ত এবং অভিযুক্ত পুলিশের স্ত্রীকে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করেছে কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার বিষয়ে ভুক্তভোগী নারী পুলিশ সদস্য পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিচার চেয়েছেন। তিনি গত ৫-৬ দিন ধরে থানায় অভিযোগ দায়েরের চেষ্টা করেও অভিযোগ করতে পারেনি। হতাশা ও মানসিক চাপের কারণে তিনি একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। অভিযোগ উঠেছে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন পুলিশের অনেকেই। নিরাপত্তাহীনতায় ও চাকরি হারানোর ভয়ে নীরব থাকলেও ওই ভিডিওর ভয় দেখিয়ে সাফিউর দিনের পর দিন থানা ব্যারাকেই তাকে ধর্ষণ করে যান বলে অভিযোগ করেন ওই নারী সদস্য।
সর্বশেষ ১৫ আগস্ট রাত ২টায় আবারও তিনি ধর্ষণের শিকার হন। এ সময় বিয়ের আশ্বাস দিয়ে সম্পর্ক চালিয়ে যেতে থাকেন তিনি। তবে বিয়ে করেননি।
ভুক্তভোগী ওই নারী পুলিশ সদস্য জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আশুলিয়া থানা থেকে বদলি হয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় যোগদান করেন।
এরপর পরিচিত হওয়ার কথা বলে সাফিউর তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। গত রমজানের ঈদের পর এক রাতে ব্যারাকে একা থাকাকালীন সময় সাফিউর হঠাৎ রুমে ঢুকে তাকে জাপটে ধরেন এবং ধর্ষণ করেন। এ সময় তিনি মুখ চেপে ধরে পুরো ঘটনার ভিডিও মোবাইল ফোনে ধারণ করেন। কান্নায় ভেঙে পড়লে তিনি মাফ চেয়ে বলেন, ‘মাথা ঠিক ছিল না, যা হয়েছে ভুলে যাও। কাউকে বললে ভিডিও ছড়িয়ে দেব, তুমিও বাঁচতে পারবে না।’
নারী পুলিশ সদস্য জানান, যখনই তিনি বিয়ের বিষয়ে চাপ দেন বা শারীরিক সম্পর্কের বিরোধিতা করেন, তখনই সাফিউর তাকে মারধর করেন। তার কাছে সেই নির্যাতনের একাধিক ছবিও রয়েছে। একপর্যায়ে তিনি ১৬ আগস্ট থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই ইবনে ফরহাদকে বিষয়টি গোপনে জানান। কিন্তু তিনি বিষয়টি পরিদর্শক (তদন্ত) আল-আমিন হোসেনকে জানিয়ে দেন। পরিদর্শক ও অভিযুক্ত সাফিউরের বাড়ি একই এলাকায় হওয়ায় শুরু থেকেই তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন তিনি।
তিনি বলেন, সেকেন্ড অফিসার ইবনে ফরহাদ ও পরিদর্শক আল-আমিন হোসেন মিলে তখন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আক্তার হোসেনকে আমার নামে বিভিন্ন বাজে কথা বলেন। ওসি তখন সার্কেল স্যারকে বিষয়টি জানান। পরে ১৭ আগস্ট এ বিষয়ে থানায় একটি ধর্ষণ মামলা করতে গেলেও ওসি মামলা নেননি বলে অভিযোগ করেন এই নারী পুলিশ সদস্য।
তিনি আরো জানান, বিষয়টি মীমাংসা করতে টাকার প্রলোভন দেখানো হয়। সোমবার তাকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। একই দিন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সাফিউরকেও পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। পরে এডিশনাল এসপিকে বিষয়টি জানালে তাকে এসপি অফিসে ডেকে পাঠানো হয়। তবে সেখানেও বিষয়টির সমাধান হয়নি।
অভিযুক্ত কনস্টেবল সাফিউরের নম্বরে ফোন দিলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
পরিদর্শক আল-আমিন হোসেন বলেন, ‘ওই নারী কনস্টেবল ১৮ আগস্ট আমাদের কাছে মৌখিক অভিযোগ করার পরই আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করি। প্রাথমিকভাবে তাকে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে।’
এ বিষয়ে ওসি সৈয়দ মোহাম্মদ আক্তার হোসেন বলেন, ‘ওই নারী পুলিশ সদস্য লিখিত অভিযোগ করেননি। মৌখিকভাবে তিনি জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং অভিযুক্ত তাকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল; কিন্তু সাফিউর রহমান বিবাহিত থাকায় বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এরই মধ্যে উভয়কে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চলছে। যে-ই দোষী প্রমাণিত হবে, তার বিরুদ্ধে আইনিব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঢাকার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সূত্রমতে, প্রাথমিক তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে জেলা পুলিশ এরই মধ্যে অভ্যন্তরীণভাবে একটি বিশেষ টিম গঠন করেছে।