ঋণখেলাপি হলেও আদালতের আদেশ বিবেচনায় নিয়ে ৩১ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ১৫ জনই বিএনপির প্রার্থী। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ১১ জন। বাকিরা অন্য দলের। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) প্রতিবেদনে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত এই ৩১ জন। দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে তারা খেলাপি হয়েছেন। কিন্তু উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ পেয়ে বাছাইয়ে টিকে গেছেন এসব প্রার্থী।
এবারের সংসদ নির্বাচনে সারাদেশের ৩০০ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন দুই হাজার ৫৬৫ জন। তাদের মধ্যে বাছাইয়ে শুধু ঋণখেলাপির কারণেই বাতিল হয়েছে ৮২ জনের প্রার্থিতা। তাদের মধ্যে ২৮ জন স্বতন্ত্র, তিনজন বিএনপি এবং দুজন জামায়াত মনোনীত। এর বাইরে জাতীয় পার্টি, সিপিবি, চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরাও রয়েছেন। সিআইবির তথ্যের আলোকে নির্বাচন কমিশন প্রার্থী বাছাইয়ে এসব ঋণখেলাপির প্রার্থিতা আটকে দিয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য কারণে সব মিলিয়ে বাতিল হয়েছে ৭২৩টি মনোনয়নপত্র।
গত ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশের ৬৯টি রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র বাছাই করা হয়। এতে সব মিলিয়ে ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও এক হাজার
৮৪২ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ বলে বিবেচিত হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে বৈধ এবং অবৈধ হওয়া সব মনোনয়নপত্রের বিরুদ্ধেই আগামী ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিলের সুযোগ রাখা হয়েছে।
আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) অনুযায়ী, কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও কোনো ব্যক্তির খেলাপির সত্যতা নিশ্চিত হলে তিনি পদ হারাতে পারেন। ইসি ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের কথা।
উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে বৈধতা পাওয়া ৩১ জনের মধ্যে বিএনপি মনোনীত ১৫ প্রার্থী– বগুড়া-১ কাজী রফিকুল ইসলাম, বগুড়া-৫ গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, টাঙ্গাইল-৪ মো. লুৎফর রহমান, ময়মনসিংহ-৫ মোহাম্মদ জাকির হোসেন, গাজীপুর-৪ শাহ রিয়াজুল হান্নান, মৌলভীবাজার-৪ মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী, কুমিল্লা-৪ মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, কুমিল্লা-৭ রেদোয়ান আহমেদ, কুমিল্লা-৯ মো. আবুল কালাম, চট্টগ্রাম-২ সরোয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম-৪ মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৬ গোলাম আকবর খোন্দকার ও গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৬ মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী ও সিলেট-১ থেকে খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। এ ছাড়া বগুড়া-২ ও ঢাকা-১৮ থেকে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না রয়েছেন এ তালিকায়।
স্বতন্ত্র ১১ প্রার্থীর মধ্যে রয়েছেন যশোর-৫ মো. কামরুজ্জামান, ময়মনসিংহ-১০ মো. মুশফিকুর রহমান, ময়মনসিংহ-১১ মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ এসএকে একরামুজ্জামান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ কাজী নাজমুল হোসেন, কুমিল্লা-৯ ইয়াসির মোহাম্মদ ফয়সাল আশিক, চাঁদপুর-২ তানভীর হুদা, চট্টগ্রাম-৫ এসএম ফজলুল হক, নোয়াখালী-২ কাজী মোহাম্মদ মফিজুর রহমান, সিলেট-৩ মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী ও সিলেট-৫ থেকে মামুনুর রশীদ। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির মানিকগঞ্জ-২ থেকে এসএম আব্দুল মান্নান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বাগেরহাট-১ থেকে মুজিবুর রহমান শামীম, নারায়ণগঞ্জ-৪ থেকে বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মোহাম্মদ আলী রয়েছেন তালিকায়।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাইয়ে ঋণখেলাপির কারণে প্রার্থিতা বাতিল হওয়াদের মধ্যে বিএনপি, জামায়াত ছাড়াও জাতীয় পার্টির ১০ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের (চরমোনাই পীরের দল) ৬ জন, গণঅধিকার পরিষদের ৬ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির ৩ জন, এলডিপির ৩ জন, কমিউনিস্ট পার্টির ২ জন এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টির ২ জন প্রার্থী রয়েছেন। এ ছাড়া একজন করে প্রার্থী আছেন আরও কয়েকটি দলের।
যে তিনটি আসনে বিএনপির প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, সেখানে অবশ্য দলটির বিকল্প প্রার্থী বাছাইয়ে টিকেছেন। বিএনপির মনোনীত যশোর-৪ আসনের টিএস আইয়ুবের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তাঁর মালিকানাধীন সাইমেন্স লেদার প্রডাক্টস ঢাকা ব্যাংকের খেলাপি। এ আসনে দলটির আরেক প্রার্থী মতিয়ার রহমান ফরাজীর মনোনয়নপত্র টিকেছে। কুমিল্লা-১০ থেকে মনোনয়ন পাওয়া মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার দুটি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক এশিয়ার ঋণখেলাপি। এ আসনে দলটির আরেক প্রার্থী মো. আবদুল গফুর ভুঁইয়ার মনোনয়নপত্র টিকেছে। চট্রগ্রাম-১১ থেকে একেএম আবু তাহেরের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এ আসনে দলটির মূল প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১৪ থেকে আলহাজ জসীম উদ্দীন আহমেদের ঋণ নির্ধারিত তারিখের পর ৩০ ডিসেম্বর খেলাপিমুক্ত হয়েছে। তবে তিনি বেশ আগে টাকা জমা দেওয়ায় তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
জামায়াতে ইসলামীর বাতিল হওয়া দুইজনের মধ্যে মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ যশোর-২ আসনের প্রার্থী ছিলেন। প্রাইম ব্যাংকে তাঁর ক্রেডিট কার্ড ঋণখেলাপি। নির্ধারিত তারিখের পর ১ জানুয়ারি ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করে তিনি খেলাপিমুক্ত হয়েছেন। দলটির আরেক প্রার্থী মো. আব্দুল হক ছিলেন ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী। জনতা ব্যাংকের খেলাপি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির পরিচালক হিসেবে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। এ দুই আসনে জামায়াতের বিকল্প প্রার্থী না থাকলেও তাদের জোটের বিকল্প প্রার্থী রয়েছে।
বাতিল হওয়া স্বতন্ত্র ২৮ প্রার্থীর মধ্যে রয়েছেন– রংপুর-৬ আসনের এসএম শাহ্জামান রওশন, নওগাঁ-৪ আসনের মো. আব্দুস সামাদ প্রামাণিক, রাজশাহী-৫ আসনের জুলকার নাঈম মোস্তফা, মাগুরা-১ আসনের কুতুবুল্লাহ হোসেন মিয়া, বাগেরহাট-১ আসনের এসএম মুশফিকুর রহমান, খুলনা-৩ আসনের এসএম আরিফুর রহমান মিঠু, বরগুনা-১ আসনের মশিউর রহমান, পটুয়াখালী-১ আসনের মো. জাকির হোসেন মঞ্জু, ঝালকাঠি-১ আসনের মো. মোস্তাফিজুর রহমান, পিরোজপুর-২ আসনে মাহমুদ হোসেন, টাঙ্গাইল–৩ আসনে মো. শাহজাহান মিয়া, টাঙ্গাইল-৬ মো. সাইফুর রহমান, টাঙ্গাইল-৮ হাবিবুর রহমান কামাল, ময়মনসিংহ-৯ অধ্যাপক এআর খান, ময়মনসিংহ-১০ আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান, কিশোরগঞ্জ-১ খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান, কিশোরগঞ্জ-৩ একেএম আলমগীর, মানিকগঞ্জ-২ এসএম আব্দুল মান্নান, ঢাকা-১ অন্তরা সেলিমা হুদা, ঢাকা-৩ রেজাউল কবির ও একই আসনের আরেকজন মোহাম্মদ মোজাদ্দেদ আলী। ঢাকা-৩ ও ৭ আসন থেকে রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা-১২ মোহাম্মদ শাহাব উদ্দিন, গোপালগঞ্জ-২ উৎপল বিশ্বাস, একই আসনের মশিউর রহমান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে নূরে আলম সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম-৩ থেকে মো. মোয়াহেদুল মাওলা।
জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া ১০ জন হলেন– নীলফামারী-৩ মো. রোহান চৌধুরী, খুলনা-৬ মো. মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর, ভোলা-১ মো. আকবর হোসাইন, ঝালকাঠি-২ এমএ কুদ্দুস খান, জামালপুর-২ মো. আনোয়ার হোসেন, শেরপুর-১ দলটির মনোনয়ন পাওয়া মাহমুদুল হক মনি ও মো. ইলিয়াছ উদ্দিন দুজনের খেলাপি ঋণের কারণে বাতিল হয়েছে। দলটির শেরপুর-২ থেকে মো. রফিকুল ইসলাম বেলাল, কিশোরগঞ্জ-৩ মো. মুজিবুল হক ও সুনামগঞ্জ-৫ থেকে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের প্রার্থিতাও বাতিল হয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ঝিনাইদহ-১ আসনের প্রার্থী মো. আলম বিশ্বাস, যশোর-৩ মুহাম্মদ শোয়াইব হোসেন, যশোর-৬ মো. শহিদুল ইসলাম, টাঙ্গাইল-৭ এটিএম রেজাউল করিম আল রাজী, ময়মনসিংহ-৬ মো. নূরে আলম সিদ্দিকী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ থেকে সাঈদ উদ্দিন খান।
গণঅধিকার পরিষদের গাইবান্ধা-৫ মো. সামিউল ইসলাম, গোপালগঞ্জ-১ মো. কবির মিয়া, গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) সাতক্ষীরা-৪ এইচএম গোলাম রেজা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ মো. জহিরুল হক খান, চট্টগ্রাম-১৩ থেকে মো. মুজিবুর রহমান ও খাগড়াছড়ির জেলার দীনময় রোয়াজা।
জেএসডির চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ থেকে মনোনয়ন পাওয়া মো. ফজলুল ইসলাম খান, নোয়াখালী-২ মো. মোশারফ হোসেন মন্টু ও নোয়াখালী-৫ মো. কামাল উদ্দিন পাটোয়ারী। এলডিপির রাজশাহী-২ মো. ওয়াহেদুজ্জামান, বাগেরহাট-২ মো. হাসান ইমাম ও চট্টগ্রাম-১২ এম এয়াকুব আলীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির দুই প্রার্থী পঞ্চগড়-২ মো. আশরাফুল আলম এবং রংপুর-৬ মো. কামরুজ্জামান। বাংলাদেশ লেবার পার্টির ময়মনসিংহ-১ মুহাম্মদ রাশেদুল হক ও চাঁদপুর-২ নাসিমা নাজনিন সরকার। রাজশাহী-৫ বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মো. আলতাফ হোসেন মোল্লা লালন কমিশন এজেন্ট অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি। অবশ্য নির্ধারিত তারিখের পর গত ৩০ ডিসেম্বর ঋণটি পুনঃতপশিল হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ময়মনসিংহ-৯ থেকে শামসুল ইসলাম, আমজনতার দলের দিনাজপুর-৫ মো. ইব্রাহিম আলী মণ্ডল, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মো. আব্দুল মালেক, জনতার দলের সিরাজগঞ্জ-২ মো. সোহেল রানা, এনপিপির বরগুনা-২ মো. সোলায়মান, নিউক্লিয়াস পার্টি বাংলাদেশের ঢাকা-৮ মোহাম্মদ সিদ্দিক হোসাইন, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির ঢাকা-১০ মো. আবু হানিফ হৃদয় এবং নাগরিক ঐক্যের চট্টগ্রাম-৯ এর প্রার্থী মো. নূরুল আবছার মজুমদার ঋণখেলাপির কারণে নির্বাচনে অযোগ্য হয়েছেন।
সূত্র : সমকাল