যেসব ঘটনা আমাদের ব্যথিত করে

: বীরেন মুখার্জী
প্রকাশ: ১০ ঘন্টা আগে

অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে কিছু ঘটনার কথা লিখতে চাই। গত কয়েকদিনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে গেছে কিছু লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড। নারী নির্যাতনের বীভৎসতা। রাজধানীতে দেখা গেল শীতের পোশাক পরা এক নারীকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে তার গায়ে বালতি ও মগ দিয়ে পানি ঢেলে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। হেসে হেসে কয়েকজন তার শরীরে পানি ঢালছে আর একজন মুঠোফোনে এ দৃশ্য ভিডিও করছে। নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে- তাকে চুরি করতে দেখা গেছে গুলশানের মারকাযুত তা’লীম আল- ইসলামী মাদরাসার চারতলায় উঠে। এমন নারকীয় নির্যাতন দেখা গেল রংপুরে। সেখানেও একজন নারীকে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা হলো। এ ঘটনার ভিডিও করলো কেউ কেউ। তারপর সহিংসতার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হলো ফেসবুকে। এর আগে ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস নামে এক শ্রমিককে মারধরের পর গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে পিটিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করার পর মরদেহ আগুনে দেওয়া হলো। পুড়িয়ে হত্যা করা হলো শরীয়তপুরের ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে। তারপর নরসিংদীতে মনি চক্রবর্তী নামে এক ব্যবসায়ীকে। এখানেই শেষ নয়, রাজধানীতে গুলি করে হত্যা করা হলো স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে। এসব হত্যা নির্যাতনের ঘটনাগুলো যেমন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, তেমনি গণমাধ্যমেও প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে।

দেখা যাচ্ছে, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে, এটি যেন রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, অভিযুক্তের দোষ দেখার আগেই নিজেরাই যে যার মতো শাস্তি দেওয়া শুরু করে। আইন নিজেদের হাতে তুলে নিলে বিচার বিভাগের কী দরকার? কী কারণে মানুষই শাস্তি নির্ধারণ করে দিচ্ছে? দেশে আইন কোথায়?

দেশে গত কয়েকদিনে পরপর যেসব দুর্বৃত্তপরায়ণতার ঘটনা ঘটে গেল তাতে দুঃখপ্রকাশের ভাষাও হারিয়ে ফেলেছি। তবে এখন আর হত্যার খবরে বিচলিত হই না। বিচলিত বোধ করি হত্যার নৃশংসতা দেখে। একজনকে কোপানোর পর আবার তাকে পুড়িয়ে মারা হলো? কেন এতো জিঘাংসা মনের ভেতরে?

কিছুদিন আগে আদালত ভবনের সামনে রাস্তার পাশে ড্রামে ফেলে রাখা হয়েছিল ২০ টুকরা করে মানুষের দেহ। খোদ রাজধানীর খুব সংরক্ষিত এলাকা বলে পরিচিত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ভেতরে ‘মব’ তৈরি করে পিটিয়ে হত্যা হলো তরুণ আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে। তিনি পাবনা জেলা জজ আদালতের আইনজীবী ছিলেন। ঢাকায় কাজে এসে অ্যাডভোকেট নাঈমকে কেন পিটুনিতে প্রাণ দিতে হলো? পুলিশ বলেছে, বসুন্ধরায় ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে হত্যাকারী শনাক্তে কাজ করছেন তারা। ডিডিও ফুটেজে দেখা গেল নাঈমকে মারার সময় আশেপাশে অনেক মানুষ হাঁটাচলা করছেন। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি ঠেকাতে। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নারকীয়ভাবে একেকজনকে হত্যা করা হচ্ছে। গাছে ঝুলিয়ে আগুন দেওয়া হচ্ছে, দাউ দাউ করে শরীর পুড়ছে। আর আশেপাশে সবাই দাঁড়িয়ে ওই মর্মান্তিক ঘটনার ভিডিও করছেন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ‘মব’ সহিংসতায় অন্তত ১৮৪ জন নিহত হন। এর মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ৭৮ ও চট্টগ্রামে নিহত হন ৩২ জন। এছাড়া ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মব সন্ত্রাসের কারণে নিহত হন ১৬, ফেব্রুয়ারিতে ১১ জন, মার্চে ২০, এপ্রিলে ১৮, মে মাসে ১৩, জুনে ১১, জুলাই মাসে মব সন্ত্রাসের কারণে নিহত হন ১৪, আগস্টে ২১, সেপ্টেম্বরে ২৮, অক্টোবরে ১৩ ও নভেম্বরে মব সন্ত্রাসের কারণে নিহত হন ১৯ জন। নিহতদের মধ্যে ঢাকার বেশি।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সার্ভের জরিপে দেখা যায়, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ মব সহিংসতা নিয়ে উৎকণ্ঠিত। নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠা জানিয়েছেন ৬১ শতাংশ মানুষ, যাদের মধ্যে পুরুষ ৫৬ আর ৬৬ শতাংশ নারী। পোশাকের জন্য রাস্তাঘাটে হয়রানি নিয়ে উৎকণ্ঠিত ৬৭ শতাংশ মানুষ। তাদের ৬৩ শতাংশ পুরুষ আর ৭১ শতাংশ নারী।

২০২৫ সালে তৌহিদি জনতার নামে বেআইনিভাবে মব তৈরি করে শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্র ভাঙচুর, বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এমনকি কবর থেকে তুলে লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। মুক্তিযোদ্ধাসহ বিরুদ্ধমতের মানুষকে নানাভাবে হেনস্তা করার ঘটনাও ঘটেছে। পত্রিকা অফিস, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে একই দিনে হামলা চালিয়ে আগুন দেওয়া হচ্ছে। হেনস্তার শিকার হচ্ছেন সাংবাদিক। এসব ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা ও অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে উদাসীনতা। সব মিলিয়ে একদিকে যেমন মানবাধিকার সংকট ঘণীভূত হচ্ছে। তেমনি মানুষের মন থেকে স্বস্তিও উবে গেছে।

অবশ্য আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গত বছরের আগস্টে স্বীকার করেছিলেন, সরকারের দুটি বড় ব্যর্থতা হচ্ছে ‘মব সন্ত্রাস’ ও ‘ঢালাও মামলা’। তিনি বলেছেন, ‘মব সন্ত্রাস দমন করার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, পুলিশ মোরাল ছিল না। যে পুলিশ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতিপক্ষ ছিল, সেই পুলিশ যখন দেখে গণঅভ্যুত্থানের দাবিদার বলে কিছু মহল মব করছে, তখন সেটা দমন করতে পারেনি।’

সরকারের কর্তাব্যক্তিরা যা-ই বলুন, দেশের সাধারণ মানুষ যে কিছুতেই স্বস্তিতে নেই তা বেশ জোর দিয়েই বলা যায়। অথচ সরকারের কর্তব্য হওয়া দরকার জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জনগণের মন থেকে ভয় দূর করা, যা সঠিক বিচারের মাধ্যমে হতে পারে। পাশাপাশি এটাও সন্ধান করা দরকার, কেন মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থা না রেখে নিজেরাই ‘বিচার’ নেমেছে।

গণপিটুনির ঘটনা বৃদ্ধি নিয়ে মনোবিজ্ঞানী এবং সামাজিক মনোবিজ্ঞানের গবেষকরা কয়েকটি মূলতত্ত্ব ও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অস্থিরতা, গুজব এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি এগুলোকে আরও তীব্র করেছে। ভিড়ের মধ্যে মানুষ নিজের ব্যক্তিগত পরিচয় এবং দায়বোধ হারিয়ে ফেলে। এতে স্বাভাবিক নৈতিকতা কমে যায় এবং দলের সাথে মিশে অনেক বেশি সহিংস আচরণ করে।

প্রখ্যাত ফরাসি বহুমুখী পণ্ডিত (পলিম্যাথ) চার্লস-মারি গুস্তাভ ল্য বোঁন বলেছেন, ভিড়ে ‘গ্রুপ মাইন্ড’ তৈরি হয়, যেখানে ব্যক্তি নিজের চিন্তা বাদ দিয়ে গ্রুপের বা দলের আবেগে ভেসে যায়। দল যা করে, ব্যক্তিও তাই করে। অন্যদিকে, মার্কিন মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ফিলিপ জিম্বার্ডো এর মতে, অ্যানোনিমিটি (নামহীনতা) এবং গ্রুপ প্রেশার মানুষকে নিয়ন্ত্রণহীন করে তোলে।

বাংলাদেশে দেখা যায় গুজবের (যেমন ছেলেধরা বা ধর্ম অবমাননা) কথা ছড়িয়ে দেওয়ার পর, ভিড় হয় এবং সবাই তখন একসাথে আক্রমণ করে। ভিড়ে ব্যক্তির যুক্তিবোধ গ্রুপের আবেগের কাছে হার মানে। ফলে অযৌক্তিক অভিযোগে (যেমন মানসিক রোগী বা নিরীহ ব্যক্তিকে চোর সন্দেহে পেটানো) সহিংসতা ঘটে। আর এ ধরনের ঘটনার বৃদ্ধিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্রেকডাউন বলছেন কেউ কেউ। সমাজে বিদ্যমান গভীর বিভাজন, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সামাজিক শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার ভেঙে পড়া, যেখানে জাতি, ধর্ম, অর্থ-সামাজিক অবস্থা, লিঙ্গ বা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে বিভাজন বাড়ে এবং সামাজিক সম্পর্ক ও প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকারিতা হারায়, যা সভ্যতার পতন বা বড় ধরনের সামাজিক পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এটি কোনো সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক আচরণ নয়। বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতি (ভিড়, গুজব,অস্থিরতা) এতে ভূমিকা রাখে। প্রতিরোধে দরকার আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, গুজব নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। এ ধরনের সহিংসতা সমাজে দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা সৃষ্টি করে এবং অসহিষ্ণুতা বাড়ায়।

দেশে চলমান এসব নেতিবাচক ঘটনাগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আমরা সবাই ভয়ের পরিবেশে বাস করছি। মানুষে মানুষে বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। দেশে ধারাবাহিক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও হত্যা-নির্যাতনের ঘটনাগুলো দেখে ‘দেশে আদৌ সরকার আছে কিনা’ এমন প্রশ্নও হয়তো অমূলক নয়। সাধারণ মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের কি কোনো দায়বদ্ধতা নেই? গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকারের কাছে জনপ্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। দেশের সাধারণ মানুষ সব সময় বিশ্বাস করে, সরকার একটু মনোযোগী হলেই এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। আমরা সাধারণ মানুষ কি সরকারের কাছে স্বস্তিতে, ভয়হীনভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশা করতে পারি না? আমরা কি চাইতে পারি না- নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক? বলতে পারি না, মব সন্ত্রাস কঠোরভাবে দমন হোক? (মতামত লেখকের নিজস্ব)

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও ভারপ্রাপ্ত বার্তা সম্পাদক, বাংলাদেশ বুলেটিন

 

  • দেশ
  • রাজধানী
  • লোমহর্ষক
  • হত্যাকাণ্ড
  • #