পললের ঘ্রাণ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের নৈসর্গিক মোহ ও মায়ার শৈল্পিক বুনন এবং জীবন-জলের বহমানতা কবিতার খোলসে, ছন্দের ছলছল নৃত্যে ধরা পড়লে কিংবা কবিমানসে প্রকৃতির প্রত্যয়বোধের সহজাত আসক্তি নড়েচড়ে বসলে, সে কবিতা স্থান-কাল-পাত্র অতিক্রম করে অনড় গাঁথুনিতে টেকসই হয়ে যায়। কবিচোখ যখন প্রকৃতির সৌন্দর্যে আটকে যায় কিংবা প্রকৃতির মোহে মোহাচ্ছন্ন হয়, তখন কবি ও প্রকৃতি একাকার হয়ে যায়, অভিন্ন সত্তায় যাপনকাল গণনা করে, নিজেই মহাপ্রকৃতির অংশ হয়ে ওঠে, বিলীনও হয়ে এ মহাসত্তায়। ‘কে তুমি’ জানতে হলে ‘কোথায় তুমি’ জানাটা অনেক জরুরি। তাই বলা হয়ে থাকে- Who you are is not possible to understand without knowing where you are.
অধ্যাপক বরেন্দু মণ্ডল পশ্চিমবঙ্গের, তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘কবিতায় সুন্দরবন, নোনা মাটির কবিতা’। ভৌগোলিক ভালোবাসায় সুন্দরবন বিভাজিত হলেও নান্দনিক সৃজনশীলতা, কাব্যিক উপমা এবং জীববৈচিত্র্যের অকৃপণ উদারতায় সুন্দরবন এক অভিন্নসত্তায় উঠে এসেছে দুই বাংলার কবিমানসে। এখানে সুন্দরবন ও কবিমানস অসাধারণ নান্দনিক ভুবন সৃষ্টি করেছে।
‘কবিতায় সুন্দরবন, নোনা মাটির কবিতা’- কেনইবা নোনাজল উপেক্ষিত, মাটির লবণাক্ততা কবিচোখে ধরা দিলো কিন্তু চোখের নোনাজল কোথায়? নোনাপললে সুন্দরবন, প্রকৃতির এ কালযাপনে টিকে থাকার লড়াই আছে, যেমন কবি ও কবিতারও টিকে থাকতে হয় সময়, কাল ও সত্তার সঙ্গে লড়াই করে।
জীবনানন্দের ‘সুন্দরবনের গল্পে’ বাঘিনী-চিতাবাঘিনীরা ‘রক্তিম কামনার’ নেশায় হরিণের ‘ছায়ার’ পেছনে ছুটছে- মোহ ও মায়ার এক মেলবন্ধন জীবনানন্দমানসে ধরা দিলো সুন্দরবনের শৈল্পিক ছোঁয়ায়। জসীমউদদীন ‘দেবতাবিহীন নির্জন মন্দির’ সুন্দরবনে ‘ফিসফিস’ পরকীয়া আলাপন শুনে ছন্দে মজেছেন নেশা নেশায়! ‘সোঁদরবন’ সুন্দরতম বহমান সত্তায় রূপ নিল নোনা জল-পললের মাখামাখিতে, কবি ও কবিতার মম- মানসের কলকাকলিতে।
শামসুর রাহমানরাও ‘সুন্দরবনের খুব কাছে’ গিয়ে হরিণীনয়নাদের খুঁজেছেন, তার ছাপ এখনও অমলিন জলকাব্যে কিংবা পললকণায়। প্রকৃতির নৈসর্গিক প্রেমে সুন্দরবন ‘হেঁতালের বাগান’ হয়ে যায়, কবিকামে কিংবা মানসকামে সত্তারা বাগানবাড়িতে নির্জনতা খুঁজে নেন। কবিকামে মগ্ন থেকেই সত্তারা কালযাপন করেন না, জীবনচাকার যাঁতাকল চালানো ঘর্মাক্ত সত্তাদের খুঁজে পান বাদাবনের ‘আঁশটে গন্ধে’, ‘দাদনের টাকায়’ বন্দি সত্তারা চক্রাকারে ঘোরে এক অনিশ্চয়তায়। ‘শতরূপে শতরূপা’- আসলেই জীববৈচিত্র্যের জলছাপে এক অনন্য চিত্রকর্মের নাম সুন্দরবন।
বীরেন মুখার্জীর ‘আশ্বিনের বাদাবন’ তার বক্ষভূমে অবারিত করে দিয়ে ‘জীবনের রক্ষাকবচ’ হয়ে দাঁড়ায় যেকোনো প্রলয়ে-দুর্যোগে, তা কি আমরা অস্বীকার করতে পারি? সিডর ’আইলা, বুলবুল, আমফান, ফণি’- ‘কত দাপটের পরীক্ষা’ দিয়ে টিকে থাকার নাম-ই সুন্দরবন। কবিদেরও টিকে থাকতে হয় সময়-কাল-স্থানের বৃত্ত ভেঙে ভেঙে।
‘কবিতায় সুন্দরবন’- কাব্যগ্রন্থে প্রকৃতির সবচেয়ে মায়াবী ও নিরীহ প্রাণীটির নাম অবলীলায় উঠে এসেছে। কবিমানস যে হরিণসত্তা কিংবা হরিণী-নয়না খুঁজে বেড়ায়- তারই বহিঃপ্রকাশ আছে অনেকের ছন্দে ও কল্পে; নারী ও হরিণীর সমার্থক ভাবনা কবিমানসে যুগ যুগ ধরে চেপে-বসা এক অনন্য উপমা। বাঘের বীরত্বও তুলে ধরেছেন অনেকে। যদিও কবিতায় বীরত্ব দেখানোর চেয়ে হরিণসৌন্দর্য দেখানোর প্রবণতাই কবিমানসে প্রবল।
নোনাজল, নোনামাটির সঙ্গে পালতোলা নৌকা ও পাখির পালকের পরিপাটি উপস্থাপন রয়েছে কোথাও কোথাও। চর-নদীর মাখামাখি মেলবন্ধন নিয়ে চলে জীবনজাহাজের চলমানতায়, তাই তো পিপাসু সত্তারা জীবনের ছন্দময়তা খুঁজতে ছুটে চলে, হোক তা কবিতার নেশায় কিংবা অকবিতায়। ‘রাসের মিলন হয় দুবলার চরে’- তাহলে মিলন-অমিলনের সুরসংগীত নোনাজলের কলকল স্রোতে বয়ে চলে জীবনের যাপনকালে। মৌয়ালের মাধুকরি নেশায় পুরুষের পৌরুষ পাওয়া যায়, সুন্দরবনের খাঁটি মধুর চাহিদা বাজারব্যবস্থায় যৌবনের ডঙ্কা তোলে, মনে হয়, মধু হচ্ছে যৌবনের জলকামান।
প্রকৃতির নৈসর্গিকতা জীবনকে নিখুঁত করে, সাবলিল করে, সৌন্দর্যবোধের ভাবনা প্রগাঢ় করে। তাই তো বলা হয়ে থাকে- Back to the Nature. মানুষ প্রকৃতির কাছে ফিরে যায়- জীবনকালে কিংবা মহাকালে। সুন্দরবনর এমন একটি মহাসত্তা, যেখানে কবি-অকবির মেলবন্ধন ঘটে, কেন ঘটে এ মেলবন্ধন? পূর্বেই বলেছি- মানুষ প্রকৃতির সন্নিকটে যেতে চায়, অবলীলায়, কামনায়, ধ্যানে ও ভাবনায়, এমনই এক মহামায়ার নাম সুন্দরবন। আর একটু বেশি করেই কবিমানসগুলো এ মহামায়ায় মোহাচ্ছন্ন হন সরলতার খোঁজে, সৌন্দর্যের খোঁজে, প্রকৃতি ও জীবনের মেলবন্ধনের খোঁজে। তাই সুন্দরবনের সতীত্ব রক্ষায় সর্বদা সোচ্চার থাকতে হবে কবিকামে, কবিপ্রেমে ও কবিধ্যানে। সত্তার সতীত্ব ও সুন্দরবনের সতীত্ব একাকার জীবনকালে ও কালযাপনে।
স্বল্পধ্যানে এবং পরিপূর্ণ মনোযোগের অভাবে কাব্যগ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ অবয়বে গভীর ডুব দিতে পারিনি, শুধু ডুবসাঁতারে রূপ ও রস আস্বাদন করেছি মাত্র। কবি বীরেন মুখার্জীর মন রক্ষা করার বিকল্প কোনো পথ জানা ছিল না। তাই এ কঠিন কাজে অবগাহন। তবে সুন্দবনের পলল, প্রকৃতি, জল ও জন স্থানিক হলেও কবিমানসগুলোর নান্দনিক ছোঁয়ায় বরেন্দু মণ্ডলের সম্পাদনাকৃত কাব্যগ্রন্থটি হয়ে উঠেছে অনন্য, বৈচিত্র্যমণ্ডিত ও সুধাময়। এখানে কাব্যিক ভাষার বিশ্লেষণ করা হয়নি। তবে সুন্দরবন ও কবিমানসগুলো এক ও অভিন্ন সত্তায় মিশেছে কোনো এক মোহনায় এসে- তা বুঝতে কোনো মেধাশ্রম ব্যয়ের দরকার নেই; আবার প্রত্যেক কবিমানস ভিন্ন ভিন্ন শৈল্পিক বুনন দিয়ে সুন্দরবনকে ভিন্ন ভিন্ন সত্তায় দাঁড় করিয়েছেন। এ সত্তাগুলো টেকসই, অহর্নিশ ও অমর।
অধ্যাপক বরেন্দু মণ্ডল সম্পাদিত ‘কবিতায় সুন্দরবন, নোনা মাটির কবিতা’ গ্রন্থে বাংলা ভাষার ১৩০ কবির কবিতা সংকলিত হয়েছে। সুন্দরবনের কবিতা নিয়ে বাংলা কবিতার এক স্বতন্ত্র পরিসর সৃষ্টির জন্য সম্পাদককে সাধুবাদ।
কবিতায় সুন্দরবন, নোনা মাটির কবিতা, সম্পাদনা : বরেন্দু মণ্ডল, প্রচ্ছদের ছবি : অলোক সরকার, প্রকাশনা : মাটির পুতুল, নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ, মূল্য : ৫০০ টাকা