সামাজিক ব্যাধিগুলোর মধ্যে সুদ, ঘুষ, যৌতুক, শ্লীলতাহানি, ধর্ষণের সাথে পরিচয় থাকলেও বলাৎকার শব্দটির সাথে মানুষের পরিচয় বেশ কম। তবে শব্দটির পরিচিতি কম থাকলেও বলাৎকারের বলির সংখ্যা কিন্তু কম নয়। তার চেয়েও দুঃখজনক বিষয় বলাৎকারের শিকার সিংহভাগই শিশু, যারা পৃথিবীর আলো-আঁধার সম্পর্কে সুচারুরূপে ওয়াকিবহাল-ই না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলাৎকার একটি অন্ধকার অধ্যায়। তাই আর পাঁচটা অন্ধকার অধ্যায়ের মতো এই অধ্যায়টাকেও বেশ ঢেকেই রাখা হয় সমাজের তথাকথিত সফলতা, অগ্রগতি, উন্নয়ন প্রভৃতি দিয়ে। বলাৎকারের মতো জঘন্য কাজের সূতিকাগার যখন মাদ্রাসার মত পবিত্র আঙিনা, তখন এমন ঘৃণিত কাজের ইতিহাস সূর্যের আলোতে আসাটা বেশ কষ্টকর-ই বটে। আফসোসের জায়গাটা হল, শিক্ষা কিংবা শুদ্ধির উদ্দেশ্যে গমন করা স্থান থেকে শিকার হয়ে ফিরে আসা। এ যেন আলোর চাদরে মোড়ানো এক অন্ধকার অধ্যায়! তবে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ার মতোই সত্য তো প্রকাশিত হয়েই যায়। ঠিক সেভাবেই বলাৎকারের অধ্যায়টা মাঝেমধ্যে উঁকি দিয়ে চমকে দেয় মানুষকে।
বলাৎকার আসলে কি? শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ অবধি সবাই ধর্ষণ সম্পর্কে জানলেও বলাৎকার সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানেন। হয়ত অনেকে বিশ্বাসই করতে পারবেন না যে একটা ছেলেও ধর্ষণের শিকার হতে পারে। হ্যাঁ, বলাৎকার হচ্ছে একটা ছেলে কিংবা একজন পুরুষের সাথে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ। বলাৎকার কথাটির আভিধানিক অর্থ জোর করে কিংবা বল প্রয়োগ করে কারো কাছে থেকে কিছু কেড়ে নেওয়া, মূলত কারো শরীর ব্যবহার করা। বাংলাদেশে পুরুষ ধর্ষণের ব্যাপারেই এই শব্দটা ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
কিছুদিন পরপরই সংবাদপত্রের বাদামী খসখসে পাতা আমাদের এমন সংবাদ জানিয়ে যায়। কখনও টিভির স্ক্রিনে আমরা দেখতে পাই বলাৎকারের অভিযোগে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক বহিষ্কারের মতো ঘটনা। তবে ঠিক কয়টা খবর আমরা দেখতে পাই? যেখানে সরষের মধ্যেই ভূত, সেখানে ওঝার দৌড়াত্ম্য আর কতটুকুই বা হবে? আলিয়া মাদ্রাসা থেকে শুরু করে কওমি মাদ্রাসা পর্যন্ত বলাৎকারের ছোবল অব্যাহত থাকলেও কওমী মাদ্রাসাতে এই ছোবলের তীব্রতা বেশিই পাওয়া যায়। তবে সব কওমি মাদ্রাসার চিত্র এক নয়। জরিপে দেখা গেছে, যে মাদ্রাসায় আবাসিকতার ব্যয়ভার বেশি, তূলনামূলকভাবে সেখানে শিশু-কিশোররা নিরাপদ। বলাৎকারের হার সেখানে কম। সুতরাং একটা শিশুর স্বাভাবিক জীবন নির্ভর করছে তার পরিবারের আর্থিক সঙ্গতির উপর, যেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। একটা রাষ্ট্রে প্রতিটা শিশু সমান নিরাপত্তার দাবিদার।
২০২০ সালের এক প্রতিবেদনে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ নামের এক সংগঠনের জরিপ অনুযায়ী জানা যায়- এক মাসে কওমি মাদ্রাসায় ৪০ ছেলে শিশু বলাৎকারের শিকার হয়। এদের মধ্যে মৃত্যু হয় দুই জনের। বরিশালের এক দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষকের বিরুদ্ধে বলাৎকারের অভিযোগে সম্প্রতি মানববন্ধন হয়। যে দেশে প্রতিনিয়ত এমন ঘৃণ্য কাজ হচ্ছে, সেই দেশে বলাৎকার নিয়ে আওয়াজ এত কম কেন? কারণ জরিপমতে দেখা যায়- বলাৎকারের শিকার হওয়া শিশুদের বয়সসীমা ৮ থেকে ১১ কিংবা ১২। সুতরাং একটা বাচ্চা বুঝতেও পারে না সে কীসের শিকার হচ্ছে। পরবর্তীতে যখন সে উপলব্ধি করতে পারে, সেটা তার বাকি জীবনের জন্য মানসিক একটা পীড়ন ব্যতীত আর কিছুই না। শৈশবের অভিঘাত একজন মানুষের বিকাশ এবং বৃদ্ধিতে সুতীব্রভাবে প্রভাব ফেলে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে অবস্থান করা শিশু যখন যৌন-নিপীড়নের শিকার হয়, তখন একটা দেশের অবকাঠামোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। রক্ষক যেখানে ভক্ষক, সেখানে শিক্ষার দ্বারা আত্মশুদ্ধি কখনো সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রে যেখানে ধর্ষণের বিচারই শুভঙ্করের ফাঁকি, সেখানে বলাৎকারের শাস্তি হওয়াটা হয়ত একপ্রকার বিলাসিতা বলেই গণনা করা চলে। অপরাধ তখনই বাড়ে, যখন অপরাধী জানে তার পার পেয়ে যাওয়ার রাস্তাটা বেশ মসৃণ। তাই অনেক প্রখ্যাত মাদ্রাসায় শিক্ষকেরা বলাৎকার করতে দ্বিধাবোধ করেন না। নৈতিকতা কিংবা ধর্মীয় শিক্ষা দ্বারা মানুষকে সৎ পথে রাখা যাবে, সমাজে নৈরাজ্য কমবে, এটা এখন এক ধরনের উপকথা-ই বলা চলে। কারণ ধর্মীয় জ্ঞানই যদি মানুষের কুকর্ম আটকানোর জন্য যথেষ্ট হত, তাহলে মাদ্রাসার মতো স্থানে কেন বলাৎকারের মতো গর্হিত কাজ ঘটে চলেছে অবিরত? যেখানে আলোর পথ দেখানোর জন্য পাঠানো হয় অবুঝ বাচ্চাদের, তারা কেন সম্মুখীন হয় নোংরা আঁধারের?
কোমলমতি শিশুদের একটা সুস্থ জীবন দেওয়ার জন্য, সমাজকে কলুষতার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কঠোর থেকে কঠোরতর শাস্তির কোনো বিকল্প নেই। অবয়বগতভাবে মানুষ নামে পরিচিত এসব নরপশুদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া বলাৎকারের মতো কালো ছায়ার হাত থেকে সমাজকে বাঁচানোর উপায় নেই। শুধু মাত্র সমাজ বাঁচানো, কিংবা শিশুর জন্য সুরক্ষিত পরিবেশ, সুস্থ জীবন নিশ্চিতের জন্যই এই সংগ্রাম না, বরং বলাৎকারের সাথে যুক্ত থাকা অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে না পারাটা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি মূর্ত প্রতীক। তাই সমাজের সর্বস্তরের মানুষের উচিত প্রচলিত নিষেধাজ্ঞা ভেঙে এমন নারকীয় কাজের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা, আইনের কঠোরতর শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ফুলের মতো শিশুদের রক্ষা করা এবং একটি নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ে তোলা।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়