কাঠগড়ায় জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আবুল বারকাত 

: ড. মতিউর রহমান
প্রকাশ: ৭ ঘন্টা আগে
ছবি : অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বারান্দায় তখন গুমোট গরম আর বিচারপ্রার্থীদের ভিড়। ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ১২টা ২২ মিনিট। এজলাসের ভেতরে গিজগিজ করছে মানুষ। কিন্তু এই চিরচেনা কোলাহলের মাঝেও এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল একটি বিশেষ কাঠগড়াকে কেন্দ্র করে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন একজন প্রবীণ মানুষ, যার পরিচিতি এ দেশের উচ্চশিক্ষা আর অর্থনীতি চর্চার জগতে কয়েক দশক ধরে উজ্জ্বল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবুল বারকাত।

কিন্তু সেই পরিচিতি আজ যেন ধুলোয় মিশেছে। পরনে নেই কোনো শিক্ষকসুলভ গাম্ভীর্যপূর্ণ পোশাক, বরং তার শরীরের ওপর চেপে বসেছে ভারী বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, মাথায় হেলমেট আর দুই হাতে লোহার হাতকড়া। রাষ্ট্রের যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তিনি আজ কেবলই একজন ‘আসামি’। কিন্তু এই যান্ত্রিকতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক মর্মস্পর্শী মানবিক অধ্যায়, যা আদালত কক্ষের রুক্ষ পরিবেশকে মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দেয়।

কাঠগড়ার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন অধ্যাপক বারকাতের মেয়ে অরণি বারকাত। বাবার এই হীনদশা দেখে তার দুচোখ বারবার প্লাবিত হচ্ছিল। একজন কন্যার কাছে তাঁর বাবা সবসময়ই আদর্শ এবং শক্তির প্রতীক। সেই বাবাকে যখন জনসম্মুখে হাতকড়া পরা অবস্থায় এবং মাথায় হেলমেট দিয়ে অপরাধীর মতো উপস্থাপন করা হয়, তখন সেই দৃশ্য সহ্য করা কোনো সন্তানের পক্ষেই সহজ নয়। অরণি বারবার বাবার দিকে তাকাচ্ছিলেন, আর প্রতিবারই তাঁর চোখ ভিজে উঠছিল। তিনি চেষ্টা করছিলেন মুখ ঘুরিয়ে নিজের অশ্রু লুকানোর, পাছে বাবা তাঁর দুর্বলতা দেখে আরও বেশি ভেঙে পড়েন।

কিন্তু একজন শিক্ষকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর একজন বাবার সংবেদনশীল মনকে ফাঁকি দেওয়া সহজ নয়। আইনজীবীদের সঙ্গে আইনি খুঁটিনাটি নিয়ে কথা বলার ফাঁকে অধ্যাপক বারকাত যখন আড়চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন, দেখলেন অরণি ডুকরে কাঁদছেন। মেয়ের সেই গোপন কান্না দেখে শক্ত সমর্থ এই অর্থনীতিবিদও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তাঁর দুচোখ বেয়েও গড়িয়ে পড়ল নোনা জল। তিনি কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। বাবা-মেয়ের এই নিঃশব্দ কান্নার দৃশ্য দেখে উপস্থিত অনেকের বুকেই যেন হাহাকার জেগে উঠল। বাবার অশ্রুসিক্ত চোখ সইতে না পেরে অরণি আদালতের এক কোণে নিজেকে আড়াল করে নিলেন। এই দৃশ্য যেন কোনো আইনি লড়াইয়ের নয়, বরং এক চরম মানবিক ট্র্যাজেডির মূর্ত প্রতীক হয়ে রইল। এটি কেবল একটি আইনি শুনানি ছিল না, এটি ছিল এক কন্যার হৃদয়বিদারক আর্তি এবং এক বাবার অসহায়ত্বের মহাকাব্য।

অধ্যাপক আবুল বারকাতের মতো একজন বরেণ্য মানুষ কেন আজ সাত মাস ধরে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠ—এই প্রশ্ন এখন সুধীসমাজের মুখে মুখে। তার আত্মীয়স্বজনের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে এক করুণ সত্য। অধ্যাপক বারকাত আজীবন কেবল জ্ঞানচর্চা আর গবেষণায় মগ্ন ছিলেন। বিত্তবৈভব বা সম্পদ অর্জনের পেছনে তিনি ছোটেননি। তার এক আত্মীয় অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানান যে, এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অন্য অনেক আসামি এরই মধ্যে জামিন পেয়েছেন। অনেকেই পলাতক রয়েছেন। কিন্তু অধ্যাপক বারকাত পাননি। কেন পাননি? উত্তরটি অত্যন্ত রূঢ়— রাষ্ট্রযন্ত্রের সদিচ্ছার অভাব ও আর্থিক সংকট। এই ডিজিটাল যুগেও বিচার পেতে গেলে যে বিশাল অর্থের প্রয়োজন হয়, একজন সৎ শিক্ষকের পক্ষে তা জোগাড় করা কতটা কঠিন, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করেন। বড় কোনো হাই-প্রোফাইল আইনজীবী নিয়োগ করার মতো অর্থবল তাঁর নেই। সাত মাস ধরে তিনি কারাবন্দী থাকলেও তাঁর জামিনের জন্য যে পরিমাণ আইনি তদবির বা অর্থের প্রয়োজন, তা তাঁর পরিবার জোগাড় করতে পারেনি। কার কাছে গেলে বা কীভাবে আবেদন করলে জামিন সহজ হবে, সেই জটিল আইনি মারপ্যাঁচ সম্পর্কেও তিনি বা তাঁর পরিবার ওয়াকিবহাল নন। একজন অধ্যাপক যিনি দেশের অর্থনীতি নিয়ে হাজার হাজার পাতা লিখেছেন, তিনি আজ নিজের মুক্তির জন্য সামান্য আইনি খরচের হিসাব মেলাতে পারছেন না। এই অসহায়ত্ব কেবল একজন ব্যক্তির নয়, বরং আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় সৎ ও সাধারণ মানুষের টিকে থাকার কঠিন লড়াইকেই সামনে নিয়ে আসে।

আদালতে অধ্যাপক বারকাতকে নিয়ে আসার দৃশ্যটি ছিল রীতিমতো অবাক করার মতো। সকাল ১০টার দিকে তাঁকে হাজতখানায় আনা হয়। এরপর যখন তাঁকে এজলাসে তোলার সময় হলো, তখন দেখা গেল তাঁর শরীরে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, মাথায় হেলমেট এবং হাতে হাতকড়া। যে মানুষটি সারা জীবন কলম আর বই নিয়ে কাটিয়েছেন, যাঁর অস্ত্রের তালিকায় ছিল কেবল জ্ঞান এবং যুক্তি, তাঁকে কেন দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো সন্ত্রাসীর মতো উপস্থাপন করা হলো? উপস্থিত এক আইনজীবী ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন তুললেন, ‘তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। তাঁকে কেন এভাবে জঙ্গিদের মতো নেওয়া হচ্ছে?’

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি হতে পারে এটি তার নিরাপত্তার স্বার্থে, কিন্তু জনমনে প্রশ্ন জাগে— একজন প্রবীণ শিক্ষককে এভাবে জনসমক্ষে অপদস্থ করার কি কোনো বিশেষ প্রয়োজনীয়তা ছিল? আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত যে কেউ নির্দোষ। অথচ অধ্যাপক বারকাতের ক্ষেত্রে যেন বিচারের আগেই দণ্ড কার্যকর করার মানসিকতা ফুটে উঠেছে। তার শিক্ষার্থীরা, যারা আদালতে তাকে সালাম দিতে এসেছিলেন, তাদের চোখেও ছিল বিষণ্নতা। একজন শিক্ষকের এই দৃশ্য দেখে তারা যেন নিজেদেরই লাঞ্ছিত মনে করছিলেন।

দুদকের মামলার বিবরণ অনুযায়ী, অধ্যাপক বারকাতসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় ২৯৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাতে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। সুদে-আসলে সেই অংকের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩১ কোটি টাকায়। দুদকের আইনজীবী জানান যে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। ওই দিন ছিল মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানির দিন। আদালত অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন এবং পরবর্তী শুনানির জন্য ৪ মার্চ তারিখ ধার্য করেন।

আইনি প্রক্রিয়া তার আপন গতিতে চলবে, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন যখন ওঠে নিরপেক্ষতা এবং মানবিকতা নিয়ে, তখন অনেক হিসাব পাল্টে যায়। একই মামলায় অভিযুক্ত অন্যরা যখন জামিন পেয়ে মুক্ত বাতাসে ঘুরছেন, তখন কেবল অর্থের অভাবে বা লবিংয়ের অভাবে একজন প্রবীণ শিক্ষককে কারাগারে ধুঁকতে হওয়া কি ন্যায়বিচার? আইন তো সবার জন্য সমান হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে যেন ‘ভিন্ন কিছু’র বাস্তবায়ন ঘটছে।

দেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ, অকুতোভয় গবেষক এবং রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আবুল বারকাত আজ কারান্তরালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে দীর্ঘ ৪০টি বছর যিনি জ্ঞানের আলো বিলিয়েছেন, সেই গুণী শিক্ষকের ৭২ বছর বয়সের বার্ধক্য আজ কারাগারের নির্জন কক্ষে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।

দুর্নীতির যে অভিযোগে তাকে বন্দি করা হয়েছে, তার বিচারিক প্রক্রিয়ার চেয়েও বড় সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে তার দ্রুত অবনতিশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা। তিনি কেবল একজন প্রবীণ নাগরিক নন, তিনি হৃদরোগ, স্ট্রোক-পরবর্তী জটিলতা, ফুসফুসের সংক্রমণ এবং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের মতো মরণব্যাধির সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন। প্রতিটি মুহূর্ত যেখানে তাঁর নিবিড় চিকিৎসাধীন থাকা প্রয়োজন, সেখানে কারাজীবনের প্রতিকূলতা তাঁর জীবনপ্রদীপকে নিভিয়ে দেওয়ার উপক্রম করছে।

একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা এবং আজীবন শিক্ষক যখন জীবনের সায়াহ্নে এসে ন্যূনতম চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরেন, তখন তা কেবল একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং গোটা জাতির জন্য লজ্জার। দেশের বিশিষ্টজন এবং তার স্বজনরা আজ গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কার প্রহর গুনছেন।

তাই তিল তিল করে দেশ গড়ার কারিগর এই গুণী মানুষের বয়স, অবদান এবং মুমূর্ষু শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে মানবিক কারণে তাঁকে অবিলম্বে জামিনে মুক্তি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। এটি কেবল আইনি বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য নৈতিক দায়িত্ব।

অধ্যাপক আবুল বারকাতের অশ্রু আজ কেবল তাঁর ব্যক্তিগত শোক নয়। এটি আমাদের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। একজন মানুষের মেধা ও শ্রম যখন রাষ্ট্রের কাজে লাগে, তখন তাঁকে মহিমান্বিত করা হয়। কিন্তু সেই মানুষটি যখন বিপদে পড়েন, তখন রাষ্ট্র বা সমাজ কি তাঁর পাশে দাঁড়ায়? বিশেষ করে যখন সেই মানুষটি হন একজন শিক্ষক, যিনি তার সারাজীবনের উপার্জনকে কেবল জ্ঞানের প্রসারে ব্যয় করেছেন।

আদালতের সেই দুপুরটি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়ার সাক্ষী ছিল না, তা ছিল এক বাবার প্রতি মেয়ের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর এক জ্ঞানতাপসের চরম অপমানের দলিল। দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে যখন শুনানি শেষ হলো, তখন আবারও অধ্যাপক বারকাতকে সেই হেলমেট আর হাতকড়া পরিয়ে হাজতখানার দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। অরণি বারকাত হয়তো তখনো দূর থেকে আড়াল হয়ে বাবার প্রস্থান দেখছিলেন। সাত মাসের বন্দিজীবন কি আরও দীর্ঘ হবে? যে মানুষটি কয়েক প্রজন্মকে অর্থনীতির পাঠ দিয়েছেন, দেশের দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে গবেষণা করেছেন, আজ তিনি নিজেই আইনি খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন—এটি আমাদের জন্য চরম লজ্জার বিষয়।

আদালত কক্ষ থেকে বের করে আনার সময় অধ্যাপক আবুল বারকাতের সেই করুণ চাউনি হয়তো উপস্থিত অনেকের হৃদয়েই দীর্ঘকাল গেঁথে থাকবে। সেই দৃষ্টিতে ছিল এক গভীর শূন্যতা; তিনি যেন ভিড়ের মাঝে পরিচিত কোনো শিক্ষার্থী বা শুভাকাঙ্ক্ষীকে খুঁজছিলেন। তিনি অপরাধী কি না, তা হয়তো সময়ের বিচারে নির্ধারিত হবে, কিন্তু তাঁর প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে—তা দেশের শিক্ষক সমাজ এবং সচেতন নাগরিকদের মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।

আমরা কি সত্যিই এমন এক সমাজ চেয়েছিলাম, যেখানে একজন প্রথিতযশা শিক্ষককে এমন মর্যাদাহীনভাবে এবং বিনাবিচারে কারান্তরালে থাকতে হবে? যেখানে বাবার অসহায় অশ্রু দেখে কন্যাকে আড়ালে মুখ লুকাতে হয়, তার চেয়ে বড় সামাজিক গ্লানি আর কী হতে পারে?

অধ্যাপক বারকাতের মুক্তির অপেক্ষা আজ কেবল অরণি বারকাতের নয়, এটি বিবেকবান প্রত্যেকটি মানুষের। আইনের শাসন যেন সবার জন্য সমান হয়, সাধারণ মানুষের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়, সেই প্রত্যাশা সবার। ৪ মার্চের শুনানিতে হয়তো নতুন কোনো মোড় আসবে, হয়তো বিচারক মানবিক দিকগুলো বিবেচনা করবেন। কিন্তু আদালতের বারান্দায় সেই দুপুর ১২টা ২২ মিনিটের কান্না যেন চিরকাল আমাদের মনে করিয়ে দেবে যে, এই সমাজ ও রাষ্ট্র মাঝে মাঝে তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মূল্যায়ন করতে কতটা ব্যর্থ হয়।

লেখক : গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

  • আদালত
  • জজ
  • ঢাকা
  • দায়রা
  • মহানগর
  • #