ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) শুরু হচ্ছে ভোটের প্রচার। এবারই প্রথমবারের মতো পোস্টারবিহীন প্রচারে নামবেন প্রার্থীরা। ইসির জনসংযোগ পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানিয়েছেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার শেষে ২৯৮ আসনে প্রার্থী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৯৭২ জনে।
প্রার্থী সংখ্যার দিক থেকে ঢাকা-১২ সংসদীয় আসনে সর্বোচ্চ ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
অন্যদিকে পিরোজপুর-১ আসনে সর্বনিম্ন দুজন প্রার্থী-বিএনপির আলমগীর হোসেন এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মাসুদ সাঈদী, নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।
অন্তত ৩১টি সংসদীয় আসনে ১০ জন বা তার বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ১৩ জন এবং খুলনা-১, ঢাকা-৯ ও ১৪ এবং গাজীপুর-২ আসনে ১২ জন করে প্রার্থী রয়েছেন।
এছাড়া ১৪টি আসনে তিনজন করে প্রার্থী রয়েছেন। এসব আসনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-ঠাকুরগাঁও-১, জয়পুরহাট-২, নওগাঁ-২, মেহেরপুর-২, চুয়াডাঙ্গা-১ ও ২, খুলনা-২, টাঙ্গাইল-৭, নেত্রকোনা-৫, মানিকগঞ্জ-২, ঢাকা-২, সুনামগঞ্জ-১ ও ২, চট্টগ্রাম-১৫ এবং কক্সবাজার-১।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, গত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনে মোট ২,৫৮০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। যাচাই-বাছাই শেষে ১,৮৫৫টি মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয় এবং ৭২৫টি বাতিল হয়। আপিল ও আদালতের আদেশে পরে ৪৩৬ জন প্রার্থী প্রার্থিতা ফিরে পান।
সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী, দেশে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের মতো। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ের সংসদ নির্বাচনগুলোর চেয়ে এবার অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি। এবার ৫৯টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫১টি দল প্রার্থী দিয়েছে।
দলগুলো ২,০৯১টি মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে এবং স্বতন্ত্র থেকে ৪৭৮টি মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়। যে সব দল প্রার্থী দেয়নি এগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (এমএল), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) চূড়ান্ত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। এবার প্রচারের জন্য ২০ দিন পাচ্ছেন প্রার্থীরা।
এরই মধ্যে প্রতীক পেয়েই প্রার্থীরা পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুরু করেছেন। আগারগাঁওস্থ নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে মত বিনিময় সভায় অংশ নিয়ে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেছেন, আচরণবিধি মেনেই এখানে এসেছি। দুঃখজনক হলো একটি বিশেষ দল আচরণবিধি মানেনি। আমরা পাঁচজন এসেছি, তারা (জামায়াতের প্রতিনিধি) ১০ জনের বেশি লোক এখানে নিয়ে এসেছে।
রিটার্নিং অফিসারের সামনে ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াত আমিরের পক্ষে কথা বলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো. মোবারক হোসাইন।
তিনি বলেন, যদি কোনো প্রার্থীর লোক আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তা দেখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিদের। সেখানে আরেকটি রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের চড়াও হওয়া, মারধর করা-এরই মধ্যে প্রার্থীর ১৬ জন লোক হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
তবে রিটার্নিং কর্মকর্তা বলছেন, কর্মীও যদি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে তার দায় বর্তাবে প্রার্থীর ওপর। এ সময় তিনি সবাইকে আইন মেনে প্রচার চালানোর বিষয়ে সতর্ক করেন।
এদিকে বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা ইউসুফ আশরাফ সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই।
প্রচার শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঠে নামছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। এছাড়া এরই মধ্যে সংক্ষিপ্ত বিচারের ক্ষমতা নিয়ে মাঠে আছে নির্বাচনী তদন্ত কমিটি। তাৎপরতা বাড়বে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও।
ভোটের প্রচারে ড্রোন, পোস্টার ব্যবহার, বিদেশে প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ২০টির বেশি বিলবোর্ডে মানা, একমঞ্চে ইশতেহার ঘোষণা ও আচরণবিধি মানতে প্রার্থী ও দলের অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভোটের প্রচারে কড়াকড়ি আরোপ, অসৎ উদ্দেশে এআই ব্যবহারে মানা, পোস্টার ও ড্রোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞাসহ কি করা যাবে, কি করা যাবে না, তা তুলে ধরা হয়েছে এ বিধিমালায়।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে তদন্ত সাপেক্ষে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে ইসির।
কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা পরিচালনা করতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বা দল বা প্রার্থী সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইল আইডিসহ অন্যান্য সনাক্তকরণ তথ্যাদি উক্তরূপে প্রচার-প্রচারণা শুরুর পূর্বে রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করতে হবে; প্রচার-প্রচারণাসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে অসৎ উদ্দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করা যাবে না; ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ভুল তথ্য, কারো চেহারা বিকৃত করা ও নির্বাচন সংক্রান্ত বানোয়াট তথ্যসহ সব ধরনের ক্ষতিকর কনটেন্ট বানানো ও প্রচার করা যাবে না; প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না; নির্বাচনী স্বার্থ হাসিল করার জন্য ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচন সংক্রান্ত সব কনটেন্ট শেয়ার ও প্রকাশ করার পূর্বে সত্যতা যাচাই করতে হবে; রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি, ভোটারদের বিভ্রান্ত করার জন্য কিংবা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্রহনন কিংবা সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে, সাধারণভাবে বা সম্পাদন (Edit) করে কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা Artificial Intelligence (AI) দিয়ে কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ এবং মানহানিকর কোনো আধেয় (content) তৈরি, প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করতে পারবেন না।
আচরণবিধিতে আরও রয়েছে- কোনো দল বা প্রার্থী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশে জনসভা, পথসভা, সভা-সমাবেশ বা কোনো প্রচারণা করতে পারবে না। ভোটের প্রচারে থাকছে না পোস্টারের ব্যবহার। একজন প্রার্থী তার সংসদীয় আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবে না; যার দৈর্ঘ্য হবে সর্বোচ্চ ১৬ ফুট আর প্রস্থ ৯ ফুট। নির্বাচনের দিন ও প্রচারের সময় কোনো ধরনের ড্রোন, কোয়াডকপ্টার বা এ জাতীয় যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো প্রার্থী ও প্রতিষ্ঠান ভোটার স্লিপ বিতরণ করতে পারবে। তবে ভোটার স্লিপে প্রার্থীর নাম, ছবি, পদের নাম ও প্রতীক উল্লেখ করতে পারবে না। বিলবোর্ডে শুধু যেগুলো ডিজিটাল বিলবোর্ড, সেগুলোতে আলোর ব্যবহার করা যাবে। বিদ্যুতের ব্যবহার করা যাবে। তাছাড়া আলোকসজ্জার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেটে পলিথিনের আবরণ নয়, প্লাস্টিক (পিভিসি) ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না। সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্বর্তী/তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদেরও যোগ করা হয়েছে। ফলে তারা প্রার্থীর হয়ে প্রচারে নামতে পারবেন না। প্রচারে পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে; প্রচার সামগ্রীতে পলিথিন, রেকসিনের ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। প্রচারের সময় শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলে রাখতে হবে। আচরণবিধি মেনে চলার ব্যাপারে প্রার্থী ও দলের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামাও দিতে হবে। আচরণবিধির ‘গুরুতর’ অপরাধের ক্ষেত্রে আরপিওতে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রয়েছে।