বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা এবং সংস্কার সূচি এগিয়ে নেওয়ার জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার । এ সময় কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখা গেলেও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের সামনে কাঠামোগত ও নীতিগত বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
আইএমএফের ২০২৫ সালের আর্টিকেল-ফোর (সদস্য দেশ পর্যালোচনা) কান্ট্রি স্টাফ রিপোর্টে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, ঝুঁকির উৎস ও দুর্বল খাতগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, সংস্কার ত্বরান্বিত না হলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হবে, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক খাতের চাপ দীর্ঘায়িত হতে পারে। নতুন সরকারের প্রথম ১২–১৮ মাসকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থা। এই সময় রাজস্ব, ব্যাংকিং, বিনিময় হার, মুদ্রানীতি এবং শাসনব্যবস্থায় ধারাবাহিক ও দৃঢ় সংস্কার না হলে স্থায়ী পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আইএমএফের মতে, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সম্ভাবনা যেমন আছে, ঝুঁকিও তেমনি বড়। ২০২৪ সালের বিস্ফোরণের মতো বৈষম্য ও বঞ্চনার ক্ষত সারাতে এবং অর্থনীতিকে টেকসই পথে ফিরিয়ে আনতে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিগত শৃঙ্খলা অপরিহার্য। আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪.৭ শতাংশ; ধীরে ধীরে তা ৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে—কিন্তু এটি সংস্কার বাস্তবায়নের গতি ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভর করবে।
আইএমএফ রিপোর্টে বৈষম্য ও অন্তর্ভুক্তির সংকটকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বাধা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের বৈষম্য দ্রুত বাড়ছিল। দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবার ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতি ও বাজার অস্থিরতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে। সংস্থার পরামর্শ, সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় পুনর্গঠন করে সত্যিকারের দরিদ্রদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং ভর্তুকি খাতে অপচয় ও অকার্যকারিতা কমিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা সম্প্রসারণ করা। নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ বাড়ানোও জরুরি।
সরকারের ব্যয় মেটাতে এবং উন্নয়নমূলক কাজের জন্য রাজস্ব আহরণ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। আইএমএফের পরামর্শ, ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার নির্ধারণ, কর ব্যবস্থা সহজীকরণ, তামাক ও আমদানিকৃত জ্বালানিতে আবগারি শুল্ক বাড়ানো। রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ এবং সামষ্টিক-আর্থিক স্থিতিশীলতায় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কর কাঠামো সরলীকরণ, ভ্যাট ও আয়কর আধুনিকায়ন, রাজস্ব বোর্ডের প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভর্তুকি যুক্তিকরণ এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কৌশল গ্রহণ প্রয়োজন। রাষ্ট্রায়ত্ত ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণমান পর্যালোচনা করা, দুর্বল ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ করা, পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি। ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন, দুর্নীতিবিরোধী ফ্রেমওয়ার্ক শক্তিশালী করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করারও পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।
মূল্যস্ফীতি জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় করছে। এ কারণে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখা, বাজারভিত্তিক সুদের হার কার্যকর করা, পণ্যবাজারে প্রতিযোগিতা ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে স্বচ্ছতা আনা জরুরি।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সরকারকে ব্যয় সংকোচনের পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবসম্পদে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট পরিচালনা, সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শাসনব্যবস্থা ও স্বচ্ছতার ঘাটতি বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ প্রোগ্রামের পরবর্তী, ষষ্ঠ কিস্তি নির্বাচনের পর পাওয়া যাবে। এ কিস্তিতে প্রায় ৮০ কোটি ডলার বরাদ্দ থাকবে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদনের পর পরবর্তী কিস্তি যোগ করে মূল ঋণ ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। এ পর্যন্ত মোট ৩৬০ কোটি ডলার বাংলাদেশ পেয়েছে।
আইএমএফের প্রতিনিধিদল গত নভেম্বরে ঢাকায় বাংলাদেশি দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে সংস্কার এজেন্ডা ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সম্পর্কে আলোচনা করেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা আছে, তবে ধারাবাহিক সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া তা বাস্তবায়ন কঠিন।