শবে বরাতের মূল শিক্ষা আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা

: বিল্লাল বিন কাশেম
প্রকাশ: ২ সপ্তাহ আগে

ইসলামি বর্ষপঞ্জির এক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময় রাত শবে বরাত বা লাইলাতুল বরাত। ক্ষমা, রহমত ও আত্মশুদ্ধির এই রাত মুসলমানদের জীবনে নতুন করে ফিরে তাকানোর সুযোগ এনে দেয়। বহু বছর ধরেই আমাদের সমাজে এই রাত নানা আমল, দোয়া ও ইবাদতের মাধ্যমে পালিত হয়ে আসছে। তবে সময়ের সঙ্গে সমাজ বদলেছে, বদলেছে জীবনযাপন, মূল্যবোধ ও চিন্তাধারা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জীবনচর্চায় ধর্মীয় চেতনার প্রতিফলন কতটা রয়েছে- এই প্রশ্ন আজ নতুন করে সামনে এসেছে।

শবে বরাতের মূল শিক্ষা আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা। এই রাত মানুষকে তার ভুলগুলো উপলব্ধি করে ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে সংশোধনের শপথ নিতে শেখায়। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই এই রাত কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। মসজিদে যাওয়া, নফল নামাজ আদায়, কিছু দোয়া- সবকিছু শেষ হলে পরদিন জীবন আবার আগের গতিতেই ফিরে যায়। চরিত্রে, আচরণে বা সামাজিক দায়িত্ববোধে খুব বড় কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ে না।

আজকের তরুণ সমাজ প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুতগতির ও প্রতিযোগিতামুখী এক বাস্তবতায় বড় হচ্ছে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভার্চুয়াল দুনিয়া তাদের চিন্তার জগৎকে প্রভাবিত করছে গভীরভাবে। ধর্মীয় শিক্ষা ও চেতনা অনেক সময়ই তাদের কাছে বইয়ের পাতায় থাকা বিষয় কিংবা বিশেষ কোনো রাত বা দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। শবে বরাতের মতো পবিত্র রাতেও অনেক তরুণকে দেখা যায় ইবাদতের চেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, অনলাইন বিনোদন কিংবা সময় কাটানোর নানা পথে ব্যস্ত থাকতে।

অবশ্য এ কথাও সত্য যে, সব তরুণ একই রকম নয়। একটি বড় অংশ এখনো ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি সচেতন, নিয়মিত নামাজ পড়ে, কোরআন তিলাওয়াত করে এবং শবে বরাতকে আত্মশুদ্ধির উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিচার করলে ধর্মীয় চেতনার গভীরতা ও তার বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি স্পষ্ট। আমরা হয়তো অনুভূতির জায়গা থেকে ধর্মীয় রাতগুলো পালন করি, কিন্তু সেখান থেকে অর্জিত শিক্ষাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার ব্যাপারে উদাসীন থাকি।

শবে বরাত আমাদের শেখায় হিসাবের অনুভূতি—এই জীবনের প্রতিটি কাজের জন্য একদিন জবাবদিহি করতে হবে। এই শিক্ষা যদি তরুণ সমাজ সত্যিকার অর্থে হৃদয়ে ধারণ করত, তাহলে সমাজে দুর্নীতি, অন্যায়, সহিংসতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র এত প্রকট হতো না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা ইবাদত করি ঠিকই, কিন্তু অন্যায় দেখেও চুপ থাকি, সুযোগ পেলে অন্যের অধিকার হরণ করি, নৈতিকতার প্রশ্নে আপস করি।

তরুণ প্রজন্ম আজ দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের হাতেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। কিন্তু যদি এই প্রজন্ম ধর্মীয় চেতনার গভীরতা হারিয়ে ফেলে, তাহলে সমাজের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। শবে বরাতের মতো রাতগুলো কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এগুলোকে হতে হবে চরিত্র গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম।

আজ অনেক তরুণ ধর্মকে দেখে কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের বিষয় হিসেবে। কিন্তু ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা- যেখানে সততা, ন্যায়বিচার, দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শবে বরাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমা চাইবার পাশাপাশি অন্যকে ক্ষমা করতে শিখতে হবে, অন্যায় থেকে বিরত থাকতে হবে, সমাজে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। এই মূল্যবোধ যদি তরুণদের জীবনে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে শবে বরাতের প্রকৃত শিক্ষা অপূর্ণই থেকে যাবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। আজ অনেক পরিবারই ব্যস্ততার কারণে সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক গঠনে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছে না। স্কুল-কলেজেও পাঠ্যবইয়ের নম্বরের প্রতিযোগিতায় চরিত্র শিক্ষা অনেকটাই উপেক্ষিত। ফলে তরুণরা ধর্মীয় রাতগুলোকে দেখে ছুটির দিন বা আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় কর্মসূচি হিসেবে, জীবনের দিকনির্দেশনা হিসেবে নয়।

শবে বরাতের শিক্ষা তরুণদের বোঝাতে হলে কেবল ভয় দেখানো বা কড়াকড়ি নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার পথে না গিয়ে বাস্তব জীবনের সঙ্গে ধর্মীয় চেতনার সংযোগ ঘটাতে হবে। কেন আত্মশুদ্ধি জরুরি, কেন নৈতিকতা গুরুত্বপূর্ণ, কেন আল্লাহভীতি মানুষকে দায়িত্বশীল করে তোলে এই প্রশ্নগুলোর বাস্তব উদাহরণসহ উত্তর দিতে হবে।

আজ সমাজে যে হতাশা, সহিংসতা ও নৈতিক সংকট দেখা যাচ্ছে, তার বড় কারণ হলো আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব। শবে বরাত মানুষকে এই আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখায়। নিজের ভুল স্বীকার করা, নিজেকে শুধরে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা- এই চর্চা যদি তরুণ সমাজে বিস্তৃত হতো, তাহলে অনেক সামাজিক সমস্যার সমাধান সহজ হতো।

তরুণদের অনেকেই বলে, ধর্মীয় শিক্ষা বাস্তব জীবনে খুব কাজে আসে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যেসব সমাজে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শক্তিশালী, সেসব সমাজেই উন্নয়ন টেকসই হয়। দুর্নীতি কমে, পারস্পরিক আস্থা বাড়ে, সামাজিক স্থিতিশীলতা তৈরি হয়। শবে বরাতের মতো রাতগুলো সেই নৈতিক শক্তিকে জাগিয়ে তোলার বড় সুযোগ।

আমাদের দরকার শবে বরাতকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা- শুধু ইবাদতের রাত নয়, বরং আত্মসমালোচনা ও সামাজিক দায়িত্বের উপলক্ষ হিসেবে। তরুণদের বোঝাতে হবে, এই রাতের দোয়া তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা জীবনের আচরণে প্রতিফলিত হবে। মিথ্যা পরিহার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান, পরিশ্রমে সততা- এই সবই শবে বরাতের শিক্ষার বাস্তব রূপ।

মিডিয়ারও এখানে বড় ভূমিকা রয়েছে। অনেক সময় শবে বরাত মানেই আতশবাজি, আলোঝলমল আয়োজন বা বাহ্যিক উৎসবের চিত্র তুলে ধরা হয়। অথচ এর আধ্যাত্মিক গভীরতা, আত্মশুদ্ধির দর্শন খুব কম আলোচিত হয়। তরুণ প্রজন্মের কাছে এই রাতের প্রকৃত অর্থ পৌঁছে দিতে গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের দায়িত্বও কম নয়। খুতবা ও ওয়াজে যদি শুধু আচারগত দিক নয়, বরং জীবনে পরিবর্তনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়, তাহলে তরুণরা বিষয়টি ভিন্নভাবে ভাবতে শুরু করবে। শবে বরাতকে একটি “রিচার্জ নাইট” হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে- যেখানে মানুষ নিজেকে নতুন করে গড়ার শক্তি সঞ্চয় করে।

সবশেষে বলা যায়, শবে বরাত আমাদের জন্য এক অনন্য সুযোগ- নিজেকে শুধরে নেওয়ার, ভবিষ্যতের জন্য নতুন করে পথচলার শপথ নেওয়ার। তরুণ প্রজন্ম যদি এই সুযোগকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করে, তাহলে শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, গোটা সমাজই উপকৃত হবে।

কিন্তু যদি এই রাত কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ধর্মীয় চেতনার গভীরতা হারিয়ে যাবে, আর সমাজ আরও নৈতিক সংকটে পড়বে। আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনার- আমরা কি সত্যিই শবে বরাতের শিক্ষা জীবনে প্রয়োগ করছি, নাকি কেবল এক রাতের ইবাদত দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করছি?

তরুণ প্রজন্মের হাতেই আগামী দিনের বাংলাদেশ। শবে বরাতের শিক্ষা যদি তাদের চিন্তা, চরিত্র ও আচরণে প্রতিফলিত হয়, তবে আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও নৈতিক সমাজের আশা করতে পারি। আর যদি তা না হয়, তবে ধর্মীয় উৎসব বাড়লেও নৈতিক অবক্ষয় থামবে না। শবে বরাত তাই শুধু একটি রাত নয়- এটি আত্মজাগরণের ডাক। প্রশ্ন হলো, তরুণ সমাজ সেই ডাক কতটা শুনছে, আর কতটা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করছে?

লেখক : উপপরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

  • শবে বরাত
  • #