ফাইল ছবি
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) ইজারা নিয়ে শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে স্থবির হয়ে পড়েছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। এতে গভীর সংকটে পড়েছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য। রপ্তানি আয় আরও নেতিবাচক হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন্দরের প্রভাব পড়তে পারে পোশাকশিল্পে ও রোজার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে। বন্দরের এ চলমান সমস্যা নিরসনে গিয়েছেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। তার প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) ইজারা নিয়ে কর্মচারী-শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি দুই দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরীর বোট ক্লাবে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সঙ্গে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তবে দু’দিনের কর্মবিরতি স্থগিতের এ সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ অচলাবস্থার নিরসন হয়নি।
নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে শ্রমিকদের পক্ষে বেশকিছু দাবি তুলে ধরা হয়। এসময় তারা বন্দর চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি, ১৬ কর্মচারীর বদলিসহ শাস্তি প্রত্যাহার, বন্দরের স্বার্থ-বিরোধী কোনো চুক্তি না করা এবং ডিপি ওয়ার্ল্ড নামের প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে আনা যাবে না দাবি জানান তারা।
শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নৌপরিবহন উপদেষ্টা বলেন, এখানে আমি সিদ্ধান্ত দিতে পারবো না। সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার সরকারের। সরকার বিষয়টি দেখছে। তবে দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। আলাপ করে বিষয়টি শ্রমিকদের জানানো হবে। তবে এসময় উপদেষ্টা এ-ও হুঁশিয়ারি দেন যে, শুক্রবার থেকে যে কোনো কর্মসূচি সরকার কঠোরভাবে দমন করবে।
শ্রমিকরা উপদেষ্টার কথার পরিপেক্ষিতে দুদিন কর্মসূচি স্থগিত করেন। এর মধ্যে সরকারের সিদ্ধান্তের পরিবর্তন না হলে, কর্মচারীদের শাস্তিমূলক বদলি প্রত্যাহার না হলে রোববার থেকে আবার কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর জানান, নৌ পরিবহন উপদেষ্টা আমাদের দাবি সরকারকে জানাবেন বলেছেন। তিনি আমাদের আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের শাস্তিমূলক বদলি আদেশ স্থগিত করবেন বলেছেন। তার আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে দুদিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিত করেছি আমরা।
বন্দরের এ অচলাবস্থায় রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ বাতিলের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ক্রয়াদেশ অন্য দেশে স্থানান্তরের শঙ্কাও দেখছেন উদ্যোক্তারা। প্রতিদিন অন্তত ৯০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। বন্দরে অচলাবস্থা দেখা দেওয়ায় পোশাক খাতে সমপরিমাণ ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে। মূলত এ বন্দর দিয়ে আমাদের দেশের প্রয় নব্বই শতাংশ আমদানি-রপ্তানি সম্পন্ন হয়।
উদ্যোক্তারা বলছেন, সামনে রমজান। এ সংকট সমাধান না হলে সব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। ছোলা-বুটের মতো পণ্য বেশি দামে কেনা লাগতে পারে। পণ্যের ভেসেল বন্দরে আটকে আছে, এতে পণ্য নষ্ট হচ্ছে। সেই ড্যামেজের প্রভাব পড়বে ডাল, পেঁয়াজসহ সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর। ফলে বন্দরের বিষয়টি দ্রুত সমাধান করতে সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ তাদের। আর এনসিটি ইজারা দেওয়া না দেওয়ার বিষয়টি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে বলেও মত দেন কোনো কোনো উদ্যোক্তা।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় নয় হাজার টিইউএস পণ্য খালাস হয়, তা সম্পূর্ণ বন্ধ। ফলে সৃষ্ট অচলাবস্থায় দেশের রপ্তানি খাতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এখন পর্যন্ত ৫৪ হাজার কনটেইনার পণ্য বন্দরে আটকা পড়েছে।
নিটওয়্যার পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমাদের যে পণ্যগুলো বন্দরে আটকে আছে, শিপমেন্ট যাচ্ছে না, এটা একটা ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। বায়ার হয়তো এই পণ্য- এখান থেকে ফেরত নিয়ে এয়ার শিপমেন্ট দিতে বলতে পারে। অথবা ডিসকাউন্ট চাইতে পারে। এটি একটি বড় সংকট। দ্বিতীয়ত হলো- সবচেয়ে বড় সংকট যেটা হবে—এরকম একটা আনসার্টেন পরিস্থিতিতে আমাদের অর্ডারগুলো অন্য দেশে শিফট হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ও বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, বন্দরে ইতোমধ্যে পণ্যজট শুরু হয়ে গেছে। অনেক দেশ জাহাজ চলাচল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের উচিত ছিল সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এবং সবচেয়ে জরুরি একটি স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে বিষয়টা এগিয়ে নেওয়া।
বিদেশি কোম্পানি ডিপিওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দীর্ঘমেয়াদি কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী গণ্য করেন। শ্রমিকদের কর্মবিরতির সংহতি গত মঙ্গলবার অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ গত মঙ্গলবার বলেন, এ অপতৎপরতার দায়ে অভিযুক্তরা যেন দেশ থেকে বের হতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এ চুক্তিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ ৩০, ৪০, ৫০ বা ৬০ বছরের জন্য বাঁধা পড়ে যাবে, সে ধরনের চুক্তি করার কোনো অধিকার বা এখতিয়ার একটা অন্তর্বর্তী সরকারের না থাকলেও বর্তমান সরকার জোরজবরদস্তি ও তড়িঘড়ি করে তা করতে যাচ্ছে।
এদিকে, বন্দরে চলমান সমস্যা নিরসনে গিয়ে আন্দোলনরত এসে শ্রমিক-কর্মচারীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বন্দরের ৪ নম্বরে ফটকের বাইরে আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের তোপের মুখে পড়েন তিনি। এসময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টদের বন্দর ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বন্দরের চলমান সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন নৌ উপদেষ্টা।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা চট্টগ্রাম বন্দরে আসার খবর পেয়ে সকাল থেকেই আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শত, শত শ্রমিক-কর্মচারী চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের অদূরে ৪ নম্বর জেটি গেট থেকে কাস্টমস মোড়সহ আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেয়। পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও বন্দরের নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষীরা সকাল থেকেই অন্যান্যদিনের চেয়ে বাড়তি কঠোর অবস্থানে আছেন।
প্রসঙ্গত, লাগাতার কর্মবিরতির কারণে বৃহস্পতিবারও চট্টগ্রাম বন্দরে পুরোপুরি অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। সকাল থেকে বন্দর দিয়ে কোনো কনটেইনার বন্দরে প্রবেশ করেনি, জাহাজীকরণও হয়নি, পণ্য ডেলিভারিও বরাবরের মতো বন্ধ আছে।