প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারি বাসভবন যমুনা এলাকায় দিনভর ছিল আতঙ্ক ও উদ্বেগ। পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে এ এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। জাতীয় বেতন কমিশনের আলোকে ৯ম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ ও দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে সরকারি কর্মচারীদের থালা-বাটি হাতে ভুখা মিছিলে জলকামান, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আন্দোলনকারীদের প্রায় ৩২ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে হাদি হত্যার বিচার দাবিতে শাহবাগ মোড়ের পাশে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরসহ ৩০ জনেরও বেশি আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, জাবের গুলিতে আহত হয়েছেন।
দিনভর এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী এ তথ্য নিশ্চিত করেন। যদিও ডিএমপির পক্ষ থেকে এসব এলাকায় আগে থেকেই সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে অনেকবার।
সরেজনিমে দেখা যায়- শুক্রবার সকালে ৯ম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ ও দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার থেকে থালা-বাটি হাতে ভুখা মিছিল নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে বসে অবস্থান নিয়েছিলেন সরকারি কর্মচারীরা। সেখানে অন্তত ১০ মিনিট অবস্থানের পর তাদের সরিয়ে দেয় পুলিশ। এ সময় সাউন্ড গ্রেনেড জলকামানের সামনে টিকতে না পেলে ১০ মিনিটের মাথায় ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে সরকারি কর্মচারীরা। তবে কিছু সময় পর আবারও আন্দোলনকারীরা জড়ো হয়ে যমুনা অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। সেখানে তিনি ১৪৪ ধারা জারির তথ্য দেন।
এদিকে যমুনার নিরাপত্তায় রাজধানীর কাকরাইল মসজিদ ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এলাকায় ৬ প্লাটুন বিজিবিও মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে সংঘর্ষের ঘটনার পর যমুনা ভবনসংলগ্ন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে আশপাশের সড়কে যান চলাচল সীমিত রাখা হয়। এছাড়া সার্বিক পরিস্থিতি বর্তমানে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এ ঘটনায় অন্তত ৩২ জন আহত হন। আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আহতদের কয়েকজন হলেন আব্দুল হান্নান (৪৫) জয় দাস (৩৫) আব্দুল আউয়াল (৪০) তন্ময় (৩২) জাকারিয়া (৬০) সিকান্দার (৪০) ওসমান গনি চল্লিশ (৪০) আব্দুল্লাহ (৩১) অভিজিৎ (৩৫) আজিম উদ্দিন (৫০) সাইম (২৮) রিপন (৩২) মনসুর শামীম (৪৮) ইয়াসমিন (৪০) আব্দুল কুদ্দুস (৬০) জুয়েল (৩৪) আমিরুল ইসলাম (৩৪)।
পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলনকারীরা যমুনার সামনে পৌঁছান এবং বেলা ১১টার পর সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করেন। দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনকারীদের সরাতে সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহারের নির্দেশ দেন। একপর্যায়ে দৌড়াদৌড়ি ও হুড়োহুড়িতে আন্দোলনকারীরা আহত হন।
এর আগে সকালে সাড়ে ১০টার দিকে আন্দোলনকারীরা রাজধানীর শাহবাগে জড়ো হন। পরে সেখান থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ দফায় দফায় বাধা দেয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. ফারুক জানান, যমুনার সমানে থেকে প্রায় ৩২ জন আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছে। জরুরি বিভাগে তাদের চিকিৎসা চলছে।
এদিকে, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত জাতিসংঘের অধীনে করার দাবিতে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা গতকাল বৃহস্পতিবার রাতভর অবস্থান বিক্ষোভ করছিলেন।
এসব নেতাকর্মীদের সঙ্গেও রাজধানীর শাহবাগ মোড়ের পাশে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে। এসময় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে পুলিশ। এতে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরসহ ৩০ জনেরও বেশি আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, জাবের গুলিতে আহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ডাকসু নেত্রী ফাতেমা তাসনিম জুমা ও রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারসহ অনেকে।
ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা পুলিশের হামলার প্রতিবাদে রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করেছেন। এসময় যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে শাহবাগে নেতাকর্মীদের সঙ্গে অবস্থান নেন ছাত্র-জনতা।
এ সময় ‘ব্লকেড, ব্লকেড, শাহবাগ ব্লকেড’; ‘হাদি তোমায় দেখা যায়, ইনকিলাবের পতাকায়’; ‘কে বলেরে হাদি নাই, হাদি সারা বাংলায়’; ‘এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ হাদি ঘরে ঘরে’; ‘তুমি কে আমি কে, হাদি হাদি’; ‘তুমি কে আমি কে, জাবির জাবির’; ‘বাংলাদেশের জনগণ, নেমে আসুন, নেমে পড়ুন’সহ নানা স্লোগান দিতে দেখা যায়।
পুলিশের হামলার প্রতিবাদে চলা কর্মসূচিতেও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে একসময় ছত্রভঙ্গ হয়ে যান আন্দোলনকারীরা। এরপর শাহবাগে অবস্থান নেয় পুলিশ। পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এ নিউজ লেখা পর্যন্ত শুক্রবার রাত ৮টার পরে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয় পুলিশ।
এর আগে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে শাহবাগ থেকে আন্দোলনকারীদের একাংশ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ বাধা দেয়। এরপর তাদের ওপর লাঠিচার্জ ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পুলিশ। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে রাজু ভাস্কর্য থেকে একটি মিছিল নিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। মিছিলটি শাহবাগে পৌঁছানোর পর তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন।
শুক্রবার বিকেলে ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় থেকে আন্দোলনকারীরা যমুনা অভিমুখে যাওয়ার সময় পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগোতে চাইলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এক পর্যায়ে গোটা এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত জাতিসংঘের অধীনে করার দাবিতে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা-কর্মীরা ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে বিক্ষোভ করছিলেন। তারা গতকাল বিকেল ৪টার দিকে সেখান থেকে যমুনার দিকে অগ্রসর হতে চাইলে পুলিশের ব্যারিকেডের মুখে পড়েন। এ সময় ব্যারিকেড ভেঙে তারা অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরসহ বেশ কিছু নেতা-কর্মী রক্তাক্ত আহত হন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল থেকে জানা যায়, সংঘর্ষে আহত হয়ে অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন, তারা হলেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের, ডাকসুর নেত্রী ফাতেমা তাসনিম ঝুমা, রাকসুর নেতা সালাউদ্দিন আম্মার, মনির, ফয়সাল, জয়, জুলকার, মোশাররফ, নিলয়, অনিক, উমর, রাহাত, রাসেল, আহাদ, মাহিন, আজাদ, শামিম, সোহেল, শাওন, জাবেদ ও শামিম।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে এক চিকিৎসক জানান, আহতদের আঘাতের ধরন থেকে প্রাথমিকভাবে বোঝা যাচ্ছে, তারা লাঠিপেটার আঘাতের পাশাপাশি দৌড়াতে গিয়ে পড়ে গিয়ে জখম হয়েছেন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত কোনো বুলেটবিদ্ধ আহত পাওয়া যায়নি। যদিও বিকেল সোয়া ৪টার দিকে ইনকিলাব মঞ্চের ফেসবুকে এক পোস্টে দাবি করা হয়, ‘জাবের গুলিবিদ্ধ। জুমা-শান্তাকে বুট দিয়ে পাড়ানো হয়েছে।’
হাসপাতালে আহত ইনকিলাব মঞ্চের একাধিক সদস্য বলেন, ‘পুলিশ আমাদের ওপরে বেপরোয়াভাবে লাঠিচার্জ করে, জলকামান, টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড নিক্ষেপ করেছে। এতে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব জাবেরসহ আন্দোলনকারীরা আহত হয়েছেন। পাশাপাশি জাবেরের পায়ে গুলি লাগে।’
ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (ইন্সপেক্টর) ফারুক বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের অনেক নেতা-কর্মী আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আহতের সংখ্যা আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ জন হতে পারে এই সংখ্যা আরও বাড়তেও পারে। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এদের মধ্যে কেউ গুরুতর আহত নন। কী ধরনের আহত সে বিষয়গুলো চিকিৎসকরা পরে জানাবেন।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ও এর আশপাশের এলাকায় বে-আইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র বা গুলি ব্যবহার করেনি বলে জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। শুক্রবার ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তার স্বার্থে যমুনা ও সংলগ্ন এলাকায় সভা-সমাবেশ, মিছিল, গণজমায়েত ও বিক্ষোভ প্রদর্শন নিষিদ্ধ। তবুও শুক্রবার বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে একাধিক গোষ্ঠী পুলিশের বাধা অতিক্রম করে যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ নিয়মতান্ত্রিকভাবে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। পুলিশ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এ সময় কোনো ধরনের প্রাণঘাতী অস্ত্র (লেথাল ওয়েপন) বা গুলি ব্যবহার করা হয়নি।
ডিএমপি আরও জানায়, ঘটনার ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশে কিছু ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন, সঙ্গে কয়েকজন বিক্ষোভকারীও সামান্য আহত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত গুজব ও অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সর্বসাধারণের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।