টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে দেশের অর্থনীতিতে সম্প্রসারণের গতিও কমেছে। পাশাপাশি দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে ঘিরে রয়েছে অস্থিরতা। এসব চিত্র সহ সামগ্রিক বিবেচনায় দেশের অর্থনীতির শ্লথগতি উঠে এসেছে বিভিন্ন জরিপে। এছাড়া আসন্ন নির্বাচন ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় উদ্বেগ হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), আইএমএফের প্রকাশিত প্রতিবেদন, বাংলাদেশের সামগ্রিক পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই)-এর সর্বশেষ জরিপ এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) বিশ্লেষণে সামস্টিক অর্থনীতির শ্লথগতি উঠে এসেছে।
গত জানুয়ারি মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। গত ডিসেম্বর ও নভেম্বরেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল। রোববারের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানুয়ারি মাসের মূল্যস্ফীতির চিত্র প্রকাশ করেছে। ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর আগে নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।
বিশ্লেষণে দেখা যায়- গত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বেড়েছে শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে- টানা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রভাব মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়ল।
বিবিএসের হিসাব অনুসারে, গত জানুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয় ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। টানা চার মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। তিন বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
আগামী পাঁচ বছরেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারছে না। ৬ শতাংশের নিচেই থাকছে প্রবৃদ্ধির হার। ২০২৯-২০৩০ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের বৃত্ত স্পর্শ করতে পারছে না। এ সময়ের মধ্যে দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়লেও হার ৬ শতাংশের নিচে থাকছে। বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি আইএমএফের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে দেশের অর্থনীতিতে সম্প্রসারণের গতি কমেছে। জানুয়ারিতে বাংলাদেশের সামগ্রিক পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) সূচক ডিসেম্বরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৩ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫৩ দশমিক ৯-এ। এর আগের মাস ডিসেম্বরে এই সূচকের মান ছিল ৫৪ দশমিক ২। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষি ও উৎপাদন খাতে সম্প্রসারণের গতি ডিসেম্বরের তুলনায় কমেছে।
পিএমআই দেশের অর্থনীতির প্রধান চারটি খাত— কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা নিয়ে প্রতি মাসে এই পিএমআই সূচক প্রকাশ করে। এর প্রভাবে কার্যাদেশ স্থগিত, নতুন বিনিয়োগে অনীহা এবং ক্রেতাদের সতর্ক আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মৌসুমি প্রভাব ও আমদানির কারণে কিছু খাতে চাহিদা আরও কমেছে বলেও জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের গতি শ্লথ হয়ে এসেছে। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের গতি কমে যাওয়া এবং নতুন কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের সতর্ক অবস্থান রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেশকিছু বিষয়ের ইতিবাচক পরিবেশ ফিরলেও অর্থনীতিতেও গতিশীলতা ফিরে আসেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক রূপান্তর হলেও অর্থনীতির গতি তৎপরতা বাড়ানোর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। শনিবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘ইন্টেরিম ব্যালেন্স-শিট’ শীর্ষক এ ভার্চুয়াল সেমিনারে এমন মন্তব্য করেন বিশ্লেষকরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
এ অনুষ্ঠানে অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুনুর রশীদ বলেছেন, ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিক এবং দ্বিতীয় প্রান্তিক বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাই অর্থনীতি গতিশীলতায় ছিল না। তবে অন্তর্বর্তী সরকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যে শঙ্কা ছিল- তা কাটিয়ে উঠেছে।
একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেছেন, ব্যবসার পরিবেশ বর্তমানে খুব একটা স্বস্তিকর অবস্থানে নেই। ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাইভেট সেক্টরের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ২০ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১৭ দশমিক ২৮ শতাংশ।