আপাতত বন্দর ইজারা থেকে সরে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকার

: যথাসময় ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ ঘন্টা আগে
ফাইল ছবি

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) ইজারা নিয়ে শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে স্থবির হয়ে পড়েছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। ফের রোববার বন্দর চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি, ১৬ কর্মচারীর বদলিসহ শাস্তি প্রত্যাহার, বন্দরের স্বার্থ-বিরোধী কোনো চুক্তি না করা এবং ডিপি ওয়ার্ল্ড নামের প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে আনা যাবে না- এমন দাবি জানিয়ে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। এ সময় বন্দরের বিভিন্ন জেটিতে সব ধরনের পণ্য ও কনটেইনার ওঠানামা বন্ধ রয়েছে, থেমে আছে পণ্য ডেলিভারি কার্যক্রমও। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি কোম্পানিকে চট্টগ্রামের নিউমোরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা থেকে আপাতত সরে আসছে বলে জানিয়েছেন নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। তবে চুক্তির আলোচনা চলমান থাকবে। অন্যদিকে এম সাখাওয়াত হোসেন রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, লাগাতার কর্মবিরতি দমনে সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা চুক্তি হচ্ছে না জানিয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন রোববার বলেন, এই সরকারের আমলে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা চুক্তি হচ্ছে না। তারা আমাদের কাছে একটু সময় চেয়েছেন। কিন্তু আমাদের হাতে মাত্র ২টি কার্যদিবস বাকি আছে। তাই এ সময়ের মধ্যে হচ্ছে না।

আশিক চৌধুরী বলেন, ‘প্রজেক্টটা ২০১৯ সালে শুরু হয়েছিল। গত এক মাসে ফাইনাল বোঝাপড়ার ধাপটা শুরু হয়েছিল। যা এখনো চলমান। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন তাদের সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে। যা চলমান থাকবে। এটা সম্পন্ন করতে আরও কিছু সময় লাগবে।’

আশিক চৌধুরী জানান, এনসিটি ইজারা প্রসঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তারা একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। এতে তারা আলোচনা বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে চুক্তির শর্ত পর্যালোচনা করতে তাদের আরো কিছু সময় লাগবে। সেক্ষেত্রে আলোচনা চলমান থাকলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া এখনো সময় সাপেক্ষ।

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, যেহেতু আমাদের হাতে আর দুই কার্যদিবস সময় আছে। তাই আশা করছি এ আলোচনা এ সরকার পার হয়ে, নির্বাচন পার হয়ে আগামী দিনেও চলমান থাকবে এবং পর্যায়ক্রমে এটি ফলপ্রসূ হবে।

এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘট চলতে দেওয়া যায় না উল্লেখ করে নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, এ বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে। কতিপয় লোক পুরো বন্দরকে জিম্মি করার চেষ্টা করছে। আর কয়েকদিন পরে রোজা। আমরা প্রতিনিয়ত নদীতে অভিযান চালাচ্ছি। বহির্নোঙরে পড়ে আছে ছোলা, ডাল ও তেল। ১৮ কোটি মানুষকে তারা (ধর্মঘটকারীরা) জিম্মি করেছে। এটা চলতে দেওয়া যায় না। সরকার কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকজনকে ধরা হয়েছে, বাকিদেরও ধরা হবে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মনিরুজ্জামান গতকাল রোববার দাবি করেন, সেখানকার অবস্থা স্বাভাবিক। শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজে যোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইনি ব্যবস্থা নেবে।

তবে সরেজমিনে দেখা যায়- রোববার সকাল ৮টা থেকে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মবিরতি শুরু করেছেন। বিভিন্ন জেটিতে সব ধরনের পণ্য ও কনটেইনার ওঠানামা বন্ধ রয়েছে, থেমে আছে পণ্য ডেলিভারি কার্যক্রমও। সকাল থেকে বন্দরের ভেতরে কোনো ধরনের ট্রেলার বা পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহন প্রবেশ করেনি। আন্দোলনকারী শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম একপ্রকার বন্ধ হয়ে গেছে।

আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেছেন, প্রশাসন আন্দোলন দমাতে ভিন্ন পথ অবলম্বন করছে। বন্দর ও আশেপাশের এলাকায় বিপুল পরিমাণ পুলিশ, সেনাবাহিনীর সদস্য মোতয়েন রয়েছে। সংগ্রাম পরিষদের দুজনকে তুলে নেওয়া হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সমন্বয়ক মো. ইব্রাহীম খোকন বলেন, সকাল থেকেই আমাদের ধর্মঘট চলছে, কোথাও কোনো কাজ হচ্ছে না। শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলনে শতভাগ সমর্থন দিয়ে কাজে যোগ দেননি।

আন্দোলন দমাতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, শামসু মিয়া ও আবুল কালাম আজাদ নামে আমাদের দুজনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়েছে বলে খবর পেয়েছি।

এনসিটি পরিচালনার ভার ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ৩১ জানুয়ারি থেকে কর্মবিরতির ডাক দেয় বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। পরে তারা বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে আন্দোলন চালিয়ে যান। গত মঙ্গলবার থেকে সংগ্রাম পরিষদ লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করেন।

এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরে এসে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের তোপের মুখে পড়েন নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। তার সঙ্গে বৈঠকের পর সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ দুইদিনের জন্য তাদের কর্মবিরতি স্থগিত ঘোষণা করেন।

চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান অচলাবস্থা নিয়ে আবারও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স (ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ)। ইউরোচ্যাম জানিয়েছে, বর্তমানে ১৩ হাজার কনটেইনারে আনুমানিক ৬৬০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় আট হাজার কোটি টাকা) মূল্যের পণ্য আটকে আছে। ফলে রপ্তানিসূচি ভেঙে পড়ছে, পণ্য সময়মতো সরবরাহ করা যাচ্ছে না এবং লজিস্টিক খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোচ্যাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত পুনরায় চালু করার আহবান জানিয়েছে।

এর আগে শনিবার ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহারে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা। প্রধান উপদেষ্টাকে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ), বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর নেতারা এ উদ্বেগের কথা জানান।

  • অন্তর্বর্তী সরকার
  • ইজারা
  • বন্দর
  • #