ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ৪৮ উপাচার্য : কেউ ছাড়তে চান দায়িত্ব, কেউ থেকে যেতে চাচ্ছেন

: যথাসময় ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ ঘন্টা আগে

২০২৪ সালের আগস্টে অভ্যুত্থানের পর একে একে পদত্যাগ করেছিলেন ৪৮ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। এতে কিছু সময়ের জন্য এক রকম অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ে এই উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেয়। এছাড়া মেয়াদ শেষ হওয়ার মতো ঘটনা এবং কার্যক্রম শুরু হওয়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয়েও উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে উপাচার্য নিয়োগ করা হয়েছে ৫৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে নতুন দল সরকারে এই উপাচার্যদের অনেকেই তাদের মেয়াদের স্থায়িত্ব নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। আবার বেশির ভাগ উপাচার্য দায়িত্ব চালিয়ে যেতে আগ্রহী।

গত দেড় বছরে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যদের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সাময়িকভাবে। আর বাকি ৫২ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের মেয়াদ চার বছর। তবে সব উপাচার্যের নিয়োগপত্রেই উল্লেখ রয়েছে যে রাষ্ট্রপতি ও আচার্য প্রয়োজনে যেকোনো সময় এ নিয়োগ বাতিল করতে পারবেন।

সাময়িকভাবে নিয়োগ পাওয়া চার উপাচার্যের কেউ কেউ মনে করছেন, তাদের নিয়োগে নির্ধারিত সময় উল্লেখ না থাকায় গঠন হতে যাওয়া নির্বাচিত সরকার উপাচার্য হিসেবে নতুন কাউকে নিয়োগ দিতে পারে। তবে এ বিষয়ে কেউ নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করেননি। কর্মকালের মেয়াদ উল্লেখ থাকলেও একই ধরনের মত প্রকাশ করেছেন দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। কোনো কোনো উপাচার্য মনে করছেন, যদি নবনির্বাচিত সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের অন্য সিদ্ধান্তের বৈধতা দেয়, তাহলে হয়তো তারা উপাচার্যদের পদ থেকে সরাবেন না। উপাচার্যদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, তারা পরিস্থিতি বিবেচনা করে দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে অধিকাংশই জানিয়েছেন, তারা দায়িত্ব অব্যাহত রাখতে চান।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জুলাই-পরবর্তী সময়ে উপাচার্যের দায়িত্বে আসা কোনো অভিলাষ থেকে ছিল না, বরং এসেছিলাম দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কাজ করার জায়গা থেকে। দেশের একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণ হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষা খাত নিয়ে এখন আরো সুন্দরভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। দেশ ও জাতির জন্য কাজ করার এ জায়গাটি অব্যাহত রাখতে চাই।’

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান ১০ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন যে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সে সময় তিনি দাবি করেন, নতুন সরকার যেন নিজের মতো করে প্রশাসন সাজিয়ে নিতে পারে, এ কারণেই তিনি এ ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিশেষ ধরনের পরিস্থিতিতে এ দায়িত্ব পেয়েছিলাম, খুবই আপৎকালীন পরিস্থিতি ছিল। এখনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে বেশকিছু ক্ষেত্রে ভালো ফলাফলও দেখা যাচ্ছে। তবে আমি একটা সুযোগ দিচ্ছি আমাদের রাজনৈতিক সরকারকে। তাদের সহযোগিতায় যা প্রয়োজন আমরা সেটা করব। তারা যেন তাদের মতো করে সাজিয়ে নিতে পারে। এ কারণে আমি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে চাই। তবে ধারাবাহিকতা ও শূন্যতা কমাতে অংশীজনরা যদি আমাকে রাখতে চান, আমি বিবেচনা করব।’

দায়িত্বের মেয়াদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন অনেক উপাচার্য। তারা মনে করছেন, নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার নতুন উপাচার্য নিয়োগ দিতে পারেন। এমন এক উপাচার্য বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর বেশকিছু রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। যদি মনে হয় সামনের দিনে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে তবে নিয়োগের মেয়াদ থাকলেও আমি দায়িত্ব ছেড়ে দেব।

জানা গেছে, বিগত দেড় বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

গত ১৫ জানুয়ারি নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও দুই উপ-উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীরা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তোলাই আমাদের পরিকল্পনা। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক মান পুনরুদ্ধার করা, মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল শিক্ষক নিয়োগ দেয়া। শিক্ষাঙ্গনকে এমনভাবে গড়ে তোলা হোক যেখানে একটি গণতান্ত্রিক ও মুক্ত চিন্তার পরিবেশ বিদ্যমান থাকবে। এ লক্ষ্য পূরণেই আমাদের পরিকল্পনা সীমাবদ্ধ। কারা ক্ষমতায় আছে বা নেই, এসব রাজনৈতিক প্রশ্নে আমরা যেতে চাই না।’

নতুন সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালন বিষয়ে ভাবনা জানতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ্ হাসান নকীবের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের এখানে কেউই দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়ে কোনো চিন্তাভাবনাই করছেন না। যেহেতু আমরা কোনো দুর্নীতিতেও জড়িত নই, আমরা স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখব।

নির্বাচিত সরকার চাইলে দায়িত্ব পালনে আগ্রহের কথা জানিয়েছেন পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘এখানকার শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা খুবই সাপোর্টিভ। রাজনৈতিক কোনো প্রভাবই বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। নির্বাচিত সরকারের সহায়তা পেলে আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করব। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি ভালো অবস্থানে রেখে যেতে চাই।’

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী আমলের উপাচার্যদের পদত্যাগের পর নতুন উপাচার্য নিয়োগ হলেও যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা বিরাজ করছিল তার মধ্যে অন্যতম বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য দুজনকেই একসঙ্গে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এর পর থেকে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি না। সুতরাং এ বিষয়গুলো নিয়ে আপাতত ভাবছি না।

সূত্র : বণিক বার্তা

 

  • উপাচার্য
  • বিশ্ববিদ্যালয়
  • #