কেন আপনি দয়ালু হবেন?

: রফিক সুলায়মান
প্রকাশ: ৩ ঘন্টা আগে
ছবি : লেখক রফিক সুলায়মান

একটি অনুপম গ্রন্থের সাথে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। অধ্যাপক ড. রুবাইয়ুল মুর্শেদ প্রায় এক যুগের সাধনায় রচনা করেছেন- Why Kindness Matters. বইটি পড়তে পড়তে পৃথিবীর সদয় মানুষদের সাথে পরিচিত হচ্ছি যারা সাধারণত নিঃস্বার্থ, সহানুভূতিশীল এবং বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করেন না।

যারা অন্যের দুঃখ বোঝেন, সম্মান দিয়ে কথা বলেন, কোনো প্রতিদানের আশা না করেই সাহায্য করেন এবং ভুল করলে তা স্বীকার করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। যারা অন্যের অনুভূতি ও কষ্ট নিজের মনে অনুভব করেন। কোনো সুবিধা পাওয়ার আশা ছাড়াই সাহায্য করার প্রবণতা দেখান। ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাইকে সম্মান করেন। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং বুঝতে চেষ্টা করেন। নিজের ভুল বুঝতে পারলে তা স্বীকার করেন এবং ক্ষমা চাইতে দ্বিধা করেন না। অন্যের ভুল বা অপরাধ সহজে মাফ করে দেন। অন্যের দোষ চর্চা না করে ভালো দিকগুলো তুলে ধরেন। এই ধরনের মানুষ সবসময় ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে জীবনযাপন করেন।

লেখক ড. মুর্শেদ এই বইয়ে দেখিয়েছেন, দয়াবান বা দয়ালু ব্যক্তিদের সান্নিধ্য আত্মিক প্রশান্তি ও নৈতিক উন্নতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দয়ালু মানুষের সাহচর্যে অহংকার ও অলসতা দূর হয় এবং হৃদয়ে দয়া ও সহানুভূতির উদয় হয়। এমন সঙ্গ সৎ গুণাবলী অর্জনে সহায়তা করে এবং সঠিক পথে চলার অনুপ্রেরণা যোগায়।

ড. রুবাইয়ুল মোর্শেদ-এর  why kindness matters গ্রন্থের ৫১-৫২ পৃষ্ঠায় বর্ণিত বিজ্ঞানী জোনাস সল্কের ঘটনাটি দিয়েই আমার লেখা শুরু করছি।

কেন আপনি দয়ালু হবেন?

যে মানুষ তার সাত বছরের গবেষণা এবং কঠোর পরিশ্রম মানবজাতির কল্যাণের জন্য ত্যাগ করেছে, তাকে আপনি কী বলবেন? একজন মানুষ যিনি তার গবেষণা চালিয়ে গেছেন এমনকি যখন বিজ্ঞানীরা তার গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে সন্দিহান ছিলেন এবং বন্ধুদেরই একজন তাকে ‘একজন সাধারণ রান্নাঘরের রসায়নবিদ’ বলে উপহাস করেছিলেন।

আসুন বিজ্ঞানী জোনাস সাল্ক-এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। পোলিও টিকার আবিষ্কারক। আমরা জানি, পোলিও ছিল বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রোগ। সাত বছরের নিরলস গবেষণার পর তিনি এবং তার দল পোলিও টিকা তৈরি করতে সক্ষম হন।

হাজার হাজার বানরের উপর সফল পরীক্ষার পর জানেন কি তিনি কার উপর প্রথম মানব পরীক্ষা করেছিলেন? সাল্ক নিজের, তার স্ত্রী এবং তাদের তিন সন্তানের উপর ভ্যাকসিনটি পরীক্ষা করেছিলেন এবং এটি একটি বিশাল সাফল্যে পরিণত হয়েছিল। তাদের প্রথম মাঠ পরীক্ষণে ২০ হাজার চিকিৎসক এবং জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ২২ হাজার স্বেচ্ছাসেবক এবং ৬৪ হাজার স্কুল কর্মী এবং ১৮ লাখের বেশি স্কুল শিশু অংশগ্রহণ করেছিল। বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রোগের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী লড়াই শুরু হয়ে গেল ড. জোনাস সাল্কের হাত ধরে।

যদি সাল্ক তার ভ্যাকসিনের পেটেন্ট করে থাকতেন, তাহলে তিনি সাত বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থের মালিক হতেন। এর পেটেন্ট কার কাছে জানতে চেয়েছিলেন সাংবাদিক মুরো, জবাবে ড. সাল্ক নির্লিপ্তভাবে জানালেন, ‘আচ্ছা, আমি বলবো মানুষ। কোন পেটেন্ট নেই। তুমি কি সূর্যের পেটেন্ট করতে পারবে?’

১৪৫-৪৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত ফিরোজ শাহের জাফরান চায়ের গল্পটিরও উল্লেখ করতে চাই। তিনজন মানুষ এক দোকান থেকে চা পান করলো। বিনিময়ে তিনজন তিন রকম আচরণ করলো। ফিরোজ শাহের সহকারী, যার বয়স মাত্র ১২, তার প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন পৃথিবীর সবচে গুরুত্বপূর্ণ কথা। বললেন, পৃথিবীতে তিন রকম মানুষ আছে। কেউ সব খেয়ে ফেলতে চায়, কেউ সবকিছুকে বাণিজ্য হিসেবে দেখে আর সবচে উত্তম যারা সূর্যের মতো। তাদের কৃতজ্ঞতাবোধ অসাধারণ, লেখকের ভাষায় : They share from a place deeper than pockets.

আলোচনার শেষে এই গ্রন্থ থেকে আমি আরো একটি গল্প পাঠকদের সাথে শেয়ার করতে চাই। জানুস কোরজাক [১৮৭৮-১৯৪২] ছিলেন একজন শিশু বিশেষজ্ঞ, শিশু লেখক, শিক্ষক এবং শিশু অধিকার রক্ষার একজন প্রবক্তা। তিনি শিশুদের জন্য একটি এতিমখানাও চালাতেন এবং তাদের কাছে তিনি একজন পিতার মতো মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি জন্মগতভাবে ইহুদি ছিলেন (যদিও পরে অজ্ঞেয়বাদী হয়ে ওঠেন), এবং পোল্যান্ডের ওয়ারশ-এ থাকতেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে, তিনি দেশ রক্ষার জন্য স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছিলেন, কিন্তু তাকে খুব বেশি বয়স্ক বলে মনে করা হয়েছিল। ১৯৪০ সালে তার এতিমখানাটি একটি বিপদজনক এলাকায় স্থানান্তরিত করা হয়। সেটি যে দুর্ভোগ এবং হতাশা বয়ে আনলেও কোরজাকের দেবদূতের মতো শিশুরা রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর নাটক পরিবেশন করেছিল এবং হলোকাস্টের মধ্যেও স্বাভাবিক কার্যকলাপ চালিয়ে গিয়েছিল।

১৯৪২ সালের আগস্টে, কোরজাক দেখিয়েছিলেন যে কেন তাকে একজন দয়ালু ব্যক্তি হিসেবে ইতিহাসে উপস্থাপন করা হয়েছে। একদিন যুদ্ধবাজ সৈন্যরা এতিমখানার দুইশ শিশু এবং কর্মীদের ধরে নিয়ে যায়। সবার কাছে স্পষ্ট ছিল যে তারা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছে।

কোরজাককে ওয়ারশ-এর একটি নিরাপদ এলাকায় আশ্রয় দেওয়া হলেও, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বাচ্চাদের সাথে যান, নিশ্চিত করেন যে তাদের প্রত্যেকের উজ্জ্বল নীল ব্যাকপ্যাকে একটি প্রিয় খেলনা বা বই আছে। তারা তাদের সেরা পোশাক পরিহিত ছিল সেদিন। এরই মাঝে একজন অফিসার লেখক জানুস কোরজাককে চিনতে পেরেছিলেন এবং তাকে থেরেসিয়েনস্টাড্ট কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আবারও তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি শিশুদের বললেন যে তারা এই আঁধার ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাবে, যেখানে বাতাস থাকবে তাজা, যেখানে তারা পরিষ্কার নদীতে ভেসে বেড়াতে পারবে এবং যেখানে তারা ফুল ও ঘাসের গন্ধ পাবে। কোরজাক, দুইশ শিশু এবং কর্মীদের সবাইকে ট্রেবলিংকায় পাঠানো হয় এবং গ্যাস দিয়ে হত্যা করা হয়।

এই গ্রন্থের লেখক ড. রুবাইয়ুল মুর্শেদ মনে করেন, জানুস কোরজাক ইতিহাসের সবচেয়ে দয়ালু মানুষদের একজন। তিনিই দয়ালু ব্যক্তি, কারণ তিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত না হয়েও আরও দুইশ জনের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে ইচ্ছুক ছিলেন। তিনি জানতেন যে তিনি কাউকে বাঁচাতে পারবেন না, কিন্তু শিশুদের প্রতি তার নিষ্ঠা এবং তাদের শেষ মুহূর্তগুলোকে আনন্দময় করে তোলা তার জীবনের চেয়েও মূল্যবান ছিল।

এই গ্রন্থটি রচনা করতে লেখকের ১২ বছর সময় লেগেছে। এই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার দয়ালু মানুষের জীবন ও কর্ম নিয়ে তিনি স্টাডি করেছেন। বিপুল পাঠ ও অভিনিবেশের পর তিনি ১৬২টি দয়ালু মানুষের গল্প আমাদের জন্য উপস্থাপন করেছেন প্রাঞ্জল ভাষায়। গল্পগুলো ইতিহাসের সেরা সন্দেহ নেই। এই গল্পের চরিত্রগুলো ইতিহাসের মহানায়ক। আছে বাংলাদেশের একজনের গল্প, আছে উরুগুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসে মুহিকার গল্প। এই বইয়ের ভেতর একবার ডুব দিলে হরফগুলো ছেড়ে আসা প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ বইটি আপনাকে শেষ করেই উঠতে হবে। বইটি শেষ করার পর যে কোনো পাঠক অনুভব করবেন এক ঘোর লাগা বিস্ময়। প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার এই বইটি প্রকাশ করেছে পাঠক সমাবেশ। দাম এক হাজার টাকা।

ড. রুবাইয়ুল মুর্শেদ ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের কলামিস্ট। ডেইলি স্টার থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার কলাম সংকলন ঐধাব অ ঘরপব উধু. তিনি ছিলেন স্কয়ার এবং ইউনাইটেড হাসপাতালের প্রথম সিইও। তার পিতা দেশের নামকরা চিকিৎসক প্রয়াত ডা. নওয়াব আলী আহমেদ। ড. মুর্শেদ বর্তমানে সম্মান নামক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশান নির্বাহী।

 

  • অধ্যাপক ড. রুবাইয়ুল মুর্শেদ
  • #