ছবি : রেজাউল করিম (লেখক)
আলবার্ট আইনস্টাইন শুধু মহাবিজ্ঞানীই ছিলেন না, ছিলেন বেহালা বা পিয়ানো বাদক, সঙ্গীতভক্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, বিজ্ঞান ও সঙ্গীত একে অপরের পরিপূরক—উভয়ই আসলে মহাবিশ্বের এক ধরনের সুর বা শৃঙ্খলা (harmony) খোঁজার চেষ্টা করে। আইনস্টাইনের কাছে বিজ্ঞান এবং সঙ্গীত কোনো আলাদা বিষয় ছিল না। তিনি মনে করতেন, পদার্থবিজ্ঞানের একটি সুন্দর সমীকরণ এবং একটি সুরের মূর্ছনা—উভয়ই মহাবিশ্বের গভীর কোনো সত্যকে প্রকাশ করে। তিনি সঙ্গীতের মাধ্যমে ধ্যান করতেন এবং বৈজ্ঞানিক জটিল সমস্যাদির সমাধান পেতেন। তিনি সঙ্গীতের সাথে তাঁর বৈজ্ঞানিক অন্তর্দৃষ্টি, স্বজ্ঞা (intuition) এবং সৃজনশীলতার যোগসূত্র স্থাপন করেছেন।
সঙ্গীত আইনস্টাইনের কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, ১৯২৯ সালে ‘স্যাটারডে ইভনিং পোস্ট’-এর জন্য জর্জ সিলভেস্টার ভিয়েরেককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘যদি আমি পদার্থবিজ্ঞানী না হতাম, তবে সম্ভবত আমি একজন সঙ্গীতজ্ঞ হতাম। আমি প্রায়ই সঙ্গীতে চিন্তা করি। আমি আমার দিবাস্বপ্নগুলো সঙ্গীতের মাধ্যমে দেখি। আমি আমার জীবনকে সঙ্গীতের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখি।’ (If I were not a physicist, I would probably be a musician. I often think in music. I live my daydreams in music. I see my life in terms of music). (George Sylvester Viereck, Glimpse of the Great, Duckworth, London, 1930, p. 363).
আইনস্টাইন বলেন, কল্পনা শক্তির গুরুত্ব জ্ঞান থেকে অনেক বেশি। সংগীত তাঁর ভেতরের সেই কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তুলত। তিনি যখন কোনো তত্ত্বে আটকে যেতেন, তখন ভায়োলিন হাতে নিতেন। তাঁর মতে, বাজানোর সময় তাঁর মস্তিষ্ক যুক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে এমন এক স্তরে পৌঁছাত যেখানে তিনি উত্তরগুলো দেখতে পেতেন।
বিজ্ঞান এবং সঙ্গীত—উভয় ক্ষেত্রেই এক ধরনের ‘ইনটুইশন’ (Intuition) বা স্বজ্ঞার প্রয়োজন হয়। আইনস্টাইন বিশ্বাস করতেন মহাবিশ্বের গঠন যেমন সুশৃঙ্খল এবং গাণিতিক, ভালো সংগীতের গঠনও ঠিক তেমনি। এই সামঞ্জস্যই তাকে অনুপ্রেরণা দিত।
আইনস্টাইনের পুত্র হ্যান্স আলবার্ট আইনস্টাইন তার বাবার কাজের প্রক্রিয়া বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, আইনস্টাইন কোনো বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে থমকে গেলে গভীর রাতে বেহালা বাজাতেন। সেই সুরের মধ্যেই তিনি মহাবিশ্বের গাণিতিক কাঠামোর একটি ‘স্বজ্ঞামূলক’ (Intuitive) যোগসূত্র খুঁজে পেতেন। বাজানো শেষ করে তিনি সরাসরি তাঁর গবেষণায় ফিরে যেতেন এবং সমীকরণগুলো লিখে ফেলতেন।
হ্যান্স আলবার্টের এই বর্ণনা থেকেই গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, আপেক্ষিকতার তত্ত্বের মতো জটিল আবিষ্কারের পেছনে সঙ্গীত কেবল বিনোদন নয়, বরং একটি মানসিক অনুঘটক (Catalyst) হিসেবে কাজ করেছে।
হ্যান্স আলবার্ট আইনস্টাইন তার পিতা সম্পর্কে বলেন, ‘যখনই তিনি (আইনস্টাইন) অনুভব করতেন যে তিনি তাঁর কাজের কোনো এক শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন অথবা কোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, তখনই তিনি সঙ্গীতের আশ্রয় নিতেন; আর সাধারণত সেটিই তাঁর সকল সমস্যার সমাধান করে দিত।’ (Whenever he felt that he had come to the end of the road or into a difficult situation in his work, he would take refuge in music, and that would usually resolve all his difficulties). (Gary S. Berger, MD, and Michael DiRuggiero, Einstein The Man and His Min, North Carolina, p. 80).
সঙ্গীত মানুষকে নিরহঙ্কার ও বিনয়ী করে। নিরহঙ্কার ও বিনয় শুধু লালন ফকিরকে নয়, আইনস্টাইনকে বশীভূত করেছিল। আইনস্টাইন বলেন, ‘আমি সুখী, কারণ কারো কাছে আমার কিছু চাওয়ার নেই। অর্থের প্রতি আমার কোনো মোহ নেই। পদক, খেতাব বা সম্মান আমার কাছে অর্থহীন। আমি প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করি না। নিজের কাজ, ভায়োলিন আর নৌকা চালানো বাদে যে জিনিসটি আমাকে আনন্দ দেয়, তা হলো আমার সহকর্মীদের ভালোবাসা ও মূল্যায়ন।’ (I am happy because I want nothing from anyone. I do not care for money. Decorations, titles or distinctions mean nothing to me. I do not crave praise. The only thing that gives me pleasure apart from my work, my violin and my boat, is the appreciation of my fellow workers). (George Sylvester Viereck, Glimpse of the Great, Duckworth, London, 1930, p. 376).
আইনস্টাইন নিজেকে একজন বেহেলাবাদক হিসেবে পরিচয় দিতেন। যেমন- তিনি একবার একটি কনসার্টে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে তার পাশে বসা এক ব্যক্তি তাকে চিনতে না পেরে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি কী করেন?’ আইনস্টাইন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি একজন শৌখিন বেহালাবাদক যে মাঝে মাঝে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করে।’
একবার তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল,‘ আপনি কি পদার্থবিজ্ঞানী না হয়ে সত্যিই অন্য কিছু হতে পারতেন?’ তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি যদি একজন ভালো ভায়োলিনবাদক হতাম, তবে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হতাম।’
লেখক : অধ্যাপক ও লালন গবেষক