ঢাকা শহরে মশার তীব্র উপদ্রব জনজীবন বিপর্যস্ত করছে। শহরের ঘরবাড়ি, রোড ও আবাসিক এলাকার প্রতিটি জায়গায় মশার ঘনত্ব বেড়ে গেছে। গত জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে মশার পরিমাণ ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে। পদক্ষেপ না নিলে মার্চে আরও তীব্র হওয়ার শঙ্কা রয়েছে বরে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসনিক কাঠামো নড়বড়ে থাকায় মশক নিধন কর্মসূচি ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান স্থবির হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার এসব কর্মসূচি গতিশীল করতে পারেনি বলে অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে মশার পরিমাণ ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে আসে। গবেষণায় আরও জানা যায়, এক ঘণ্টায় কামড়াতে আসা মশার সংখ্যা এক মাসে বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ঘণ্টায় মাত্র পাঁচটি মশা কামড়াতে এলেই সেটি বিশ্বমান অনুযায়ী, বেশ ক্ষতিকর হিসেবে ধরা হয়। সেখানে বাংলাদেশে এই সংখ্যা ৮৫০।
গবেষকদের মতে, এ বছর মশার প্রকোপ বাড়ার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, শীতের তীব্রতা কম ছিল এবং স্বাভাবিক সময়ের আগেই শীত বিদায় নেওয়ায় মশার বংশবিস্তার দ্রুত শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়ত, নর্দমা ও জলাশয়ের দূষণ যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। তৃতীয়ত, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তদারকি ও সমন্বয় দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে- শুধু ওষুধ ছিটিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কার্যকর ড্রেনেজ ও সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। বিভিন্ন খাল-নালায় জমে থাকা নোংরা পানি মশার প্রজনন বাড়াচ্ছে। একটি খাল পরিষ্কার করলে অন্যটি আবার নোংরা হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফগিং বা ধোঁয়া ছিটানো পূর্ণবয়স্ক মশা কমাতে কিছুটা কার্যকর হলেও লার্ভা ধ্বংস হচ্ছে না।
করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগ পর্যন্ত মশক নিধন কার্যক্রম ঠিকমতোই চলছিল। তবে তার পর থেকে মেয়র বা কাউন্সিলর না থাকায় এই কার্যক্রম স্থবির পড়ে। এখন যারা মশার ওষুধ ছিটান, তাদের তেমন কোনো জবাবদিহি নেই। ফলে মশাও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা শিল্পী আক্তার বলেন, ‘আগে মাঠপর্যায়ে মশক নিধন কার্যক্রম তদারকি করতেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। তবে গত ৫ আগস্টের পর সিটি করপোরেশনের সব ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ায় এখন মশার উপদ্রব নিয়ে কারও কোনো জবাবদিহি নেই।’
বাড্ডায় বসবাসকারী জুনায়েদ বলেন, ‘আগে মশারি ছাড়া ঘুমাতে পারতাম। কিন্তু এখন স্প্রে করেও মশার দূর করা যাচ্ছে না। মশা নিধনে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখছি না। মশানিধনে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম সবসময়ই প্রশ্নবিদ্ধ।’
শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা পারভিন তালুকদার বলেন, ‘আগে সন্ধ্যার পর মশার যন্ত্রণা বেশি থাকত। এখন দিনভরই মশার উপদ্রব। বাসার দরজা-জানালা খোলা রাখার সুযোগ নেই।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ফগিং নয়, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, নির্মীয়মাণ ভবন ও ছাদে জমে থাকা পানির নজরদারি এবং সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া রাজধানীতে মশার ভয়াবহ বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিনই থেকে যাবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, নর্দমা ও জলাশয়ের দূষণ, দুর্বল তদারকি এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি অব্যাহত থাকলে মার্চে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে।