জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে খেলাপি গ্রাহকদের মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীরা ঋণ পুনঃতপশিলের সুবিধা গ্রহণ করে। শর্ত আরও শিথিল করে মাত্র ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুবিধা নিতে প্রায় ১,৫০০ প্রতিষ্ঠান এ সুবিধার জন্য আবেদন করে। এর মধ্যে প্রায় ১,৩০০ প্রতিষ্ঠান নীতির আওতায় এসে ঋণ নিয়মিত করেছে। ব্যাপক হারে ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেয়ায় কাগজে-কলমে এই খেলাপি ঋণ কমেছে।
এর ফলে, বড় অঙ্কের খেলাপি নবায়ন হওয়ায় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। বিদায়ী বছরের শেষ তিন মাসে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমেছে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। সোমবার (২ মার্চ) খেলাপি ঋণের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির আওতায় ব্যাংকগুলো বড় পরিসরে ঋণ পুনঃতফসিল করায় খেলাপি ঋণ কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫.৫৭ লাখ কোটি টাকা—যা মোট ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ। তিন মাস আগে, অর্থাৎ সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ ছিল ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। এ অবস্থায় বছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে ৫.১৩ শতাংশ বা বা ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া সবশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গতবছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ৬১টি ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। যা মোট প্রদানকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে দাড়ায়। তবে বছরের শেষ প্রান্তিকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা প্রদানকৃত ঋণের মধ্যে খেলাপি কমে দাঁড়িয়েছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৩.৪৫ লাখ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ২০ শতাংশ। ২০২৫ সালের মার্চে তা বেড়ে হয় ৪.২০ লাখ কোটি টাকা বা ২৪ শতাংশ। জুনে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬.০৮ লাখ কোটি টাকা বা ৩৪.৪০ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তা হয় ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা বা ৩৪.৭৩ শতাংশ। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তিন মাস পর খেলাপি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। ২০১৯ সালের আগে এ সময়সীমা ছিল ছয় মাস। বিশেষ সুবিধায় অনেক ক্ষেত্রে এক বছর সময়ও দেওয়া হতো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ১.৫৮ লাখ কোটি টাকা—যা তাদের মোট ঋণের প্রায় ৫০ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে তা কমে দাঁড়ায় ১.৪৬ লাখ কোটি টাকা বা ৪৪.৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ তিন মাসে কমেছে ১২ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ৪.৬৩ লাখ কোটি টাকা বা ৩৩.৭৫ শতাংশ। তিন মাসে কমেছে ৭৩ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৩.৮৯ লাখ কোটি টাকা বা ২৮.২৫ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতেও তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে ৭৫১ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে ছিল ১৯ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা বা ৪২ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে তা কমে হয়েছে ১৮ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রায় ১,৫০০ প্রতিষ্ঠান এ সুবিধার জন্য আবেদন করে। এর মধ্যে প্রায় ১,৩০০ প্রতিষ্ঠান নীতির আওতায় এসে ঋণ নিয়মিত করেছে। ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাপক হারে ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেয়ায় কাগজে-কলমে এই খেলাপি ঋণ কমেছে। বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ কমানোর পেছনে কাজ করেছে গত সেপ্টেম্বরে ঘোষিত একটি বিশেষ নীতিমালা। এই সুবিধার আওতায় মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়া হয়, যেখানে দুই বছর পর্যন্ত কোনো কিস্তি দিতে হবে না (গ্রেস পিরিয়ড)। পরবর্তীতে এই শর্ত আরও শিথিল করে মাত্র ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।