সাবেক উপদেষ্টা আদিলুরের ক্ষমতার প্রভাবে প্রতিবেশীকে উচ্ছেদ করে রাস্তা নির্মাণ

: যথাসময় ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ ঘন্টা আগে

সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক শিল্প, গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ক্ষমতার প্রভাবে প্রতিবেশীদের উচ্ছেদ করে নিজ বাড়ির সামনে নতুন রাস্তা নির্মাণ করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে কোনো রাস্তার প্রয়োজনই ছিল না। প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪০২ মিটার রাস্তা নির্মাণ করেছেন। রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মও মানা হয়নি। সরকারিভাবে নির্মিত এ সড়কটির ওয়ার্ক অর্ডারে ১২ ফিট নির্মাণের কথা থাকলেও পরবর্তীতে ‘আদিলুর রহমানের গাড়ি যাওয়ার সুবিধার্থে’ প্রশাসনের অনুরোধে সড়কটি ১৬-১৮ ফিট পর্যন্ত প্রশস্ত করা হয় বলে জানান ঠিকাদার সাইফুর রহমান।

অভিযোগ রয়েছে, সড়কটি প্রশস্ত করতে গিয়ে প্রতিবেশী একটি পরিবারের বসতভিটার দেয়াল ও ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। যদিও প্রশাসনের দাবি, ব্যক্তিগত জমি দখল করা হয়নি; সরকারি জমিতেই নিয়ম মেনে জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার জন্য সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপজেলা কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ষোলঘর ইউনিয়নের ভূইয়াপাড়া এলাকায় ভূইয়াবাড়ি থেকে পালবাড়ি পর্যন্ত সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে। সড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০২ মিটার এবং অনুমোদিত প্রস্থ ১২ ফিট। প্রায় ৯৩ লাখ ৪৯ হাজার ৫৮৯ টাকা ব্যয়ে ‘ওরিয়া কনস্ট্রাকশন’ নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি সম্পন্ন করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাজ শুরু হয়ে একই বছরের ডিসেম্বরে তা শেষ হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কটির সঙ্গে যুক্ত মূল রাস্তার প্রস্থ ১০ থেকে ১২ ফিট হলেও নতুন নির্মিত সড়কের প্রস্থ অনেক জায়গায় বেশি। কোথাও প্রায় ১৪ ফিট এবং পালবাড়ি অংশে প্রায় ২০ ফিট পর্যন্ত করা হয়েছে। সড়কের মাঝামাঝি অংশেই রয়েছে সাবেক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের পৈতৃক বাড়ি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমল থেকেই ওই এলাকায় একটি সরু পায়ে চলার পথ ছিল। সড়কের প্রবেশমুখে পালবাড়ি এলাকায় হরোমোহন ধুপিদের প্রায় ২৪ শতাংশ জমি ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তারা ভারতে চলে গেলে জমিটি পরে লুৎফে আলী ভূইয়া কিনে রাখেন বলে দাবি করেন তার উত্তরসূরি লুৎফে হাবীব, নাঈমা হাবিব, ইমরান হাবিব, নাসিমা হাবিব ও শারমিন রহমান। তবে স্থানীয় অনেকের দাবি, জমিটি কেনা হয়নি। ২০০৪ সালের দিকে ওই কাঁচা পথটি পাকা ও প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে লুৎফে হাবীবের পরিবার এতে আপত্তি জানায়। এরপর থেকেই তাদের সঙ্গে আদিলুর রহমান খানের পরিবারের বিরোধ শুরু হয়। পরে ২০০৭ সালে জেলা প্রশাসন সরকারের পক্ষে ওই জমি নেওয়ার জন্য মামলা করে। ২০১৮ সালে নিম্ন আদালত লুৎফে হাবীবদের পক্ষে রায় দেন। পরে সরকারপক্ষ সেই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আবেদন করে।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পরবর্তীতে উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে লুৎফে হাবীবদের দখলে থাকা ১২ শতাংশ জমিকে খাস খতিয়ানভুক্ত ঘোষণা করেন এবং বাকি অংশের কাগজপত্র যাচাইয়ের নির্দেশ দেন। এরপর ওই স্থানে খাস সম্পত্তির সাইনবোর্ড টানানো হয়।

তবে পরে জানা যায়, বিষয়টি নিয়ে আদালতে স্থিতাবস্থা রয়েছে। এ তথ্য জানার পর সাইনবোর্ড সরিয়ে নেওয়া হয়। লুৎফে হাবীবের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই তাদের জায়গা দখলের চেষ্টা চলছিল। তিনি জানান, তাদের জমিতে প্রায় ২০টি পরিবার বসবাস করত। আদালতের স্থিতাবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন জোর করে জায়গাটিকে খাস সম্পত্তি ঘোষণা করে এবং সেখানে সড়ক নির্মাণ করে। এ সময় তাদের কয়েকটি ঘরবাড়ি ও দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত ১২ ফিটের সড়ককে নিয়মের বাইরে গিয়ে কোথাও কোথাও ১৮ থেকে ২০ ফিট পর্যন্ত করা হয়েছে। একই জমির আরেক দাবিদার শারমিন রহমানের পক্ষে কাজী রুবেল বলেন, চলাচলের জন্য ৮ থেকে ১০ ফিটের একটি সড়কই যথেষ্ট ছিল। সেই পরিমাণ জায়গা রেখে তারা সীমানার ভেতরে ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছিলেন।

তার দাবি, বৈধভাবে কেনা সম্পত্তিকে খাস সম্পত্তি দেখিয়ে সেখানে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে তারা বর্তমান সরকারের কাছে ন্যায়বিচার চান। সড়ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার সাইফুর রহমান বলেন, শুরুতে ১২ ফিট প্রস্থের অনুমোদন ছিল। কিন্তু গাড়ি চলাচলে সমস্যা হওয়ায় প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের নির্দেশে কিছু জায়গায় সড়কটি আরও প্রশস্ত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে শ্রীনগর উপজেলা প্রকৌশলী মো. মহিফুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাস খতিয়ানভুক্ত হিসেবে একটি সাইনবোর্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে আদালতে স্থিতাবস্থার বিষয়টি জানার পর সেটি সরিয়ে নেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, সড়কের প্রস্থ ১২ ফিট হওয়ার কথা। এর বেশি করা হয়ে থাকলে বিষয়টি সরেজমিনে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

  • আদিলুর
  • উচ্ছেদ
  • ক্ষমতা
  • নির্মাণ
  • প্রতিবেশী
  • প্রভাব
  • রাস্তা
  • সাবেক উপদেষ্টা
  • #