মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে ভয়াবহ খাদ্য সংকটের হুমকির মুখে পড়তে পারে বিশ্ব

: বিশ্বপরিস্থিতি ডেস্ক
প্রকাশ: ২ ঘন্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা এবং ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এক ভয়াবহ সংকটের মধ্যে রয়েছে। এর প্রভাব শুধু এ অঞ্চলের মানুষের জীবন যাত্রায় পড়বে এমনটাই নয়, বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচব প্রভাব ফেলবে এবং বিশ্বের মানুষ ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে পড়বে। এটি ধীরে ধীরে বিশ্ব খাদ্যব্যবস্থার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। এই যুদ্ধ বিশ্বে ভয়াবহ খাদ্যসংকট ডেকে আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সার কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদনের ওপর গুরুতর চাপ তৈরি হচ্ছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই বাড়বে বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের আশঙ্কা। অনলাইন আরটি’তে প্রকাশিত এক খবরে একথা বলা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, বিশেষ করে উত্তর গোলার্ধের কৃষকদের জন্য সময়টা অত্যন্ত সংবেদনশীল। বসন্তকালীন চাষাবাদের মৌসুম শুরু হয়েছে। আর এই সময়ে সারের চাহিদা থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সাধারণ ভোক্তারা যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিকে সবচেয়ে বড় প্রভাব হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি সারের দামও দ্রুত বাড়ছে এবং সারের কাঁচামালের সরবরাহ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

চলমান সংঘাত সার উৎপাদনের পুরো শৃঙ্খলকে প্রভাবিত করছে। বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে আধুনিক সার কীভাবে তৈরি হয়। সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক গ্যাস নাইট্রোজেনের সঙ্গে হাইড্রোজেন মিশিয়ে অ্যামোনিয়া তৈরি করা হয়। পরে সেই অ্যামোনিয়া থেকে তৈরি হয় ইউরিয়া, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট এবং ইউরিয়া অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট (ইউএএন)। এগুলোকে একত্রে নাইট্রোজেনভিত্তিক সার বলা হয়। কৃষকরা ফসফরাস ও পটাশিয়ামভিত্তিক সারও ব্যবহার করেন। তবে নাইট্রোজেন সারই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত। বিশ্বব্যাপী মোট সারের ব্যবহারের প্রায় ৫৯ শতাংশই নাইট্রোজেন সার। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সার ছাড়া পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক খাদ্য উৎপাদনই সম্ভব হতো না।

প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল মজুতের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল অ্যামোনিয়া উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বৈশ্বিক সার উৎপাদনে প্রধান ভূমিকা পালন করে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং রাশিয়া। তবে ইরান, সৌদি আরব এবং কাতার যথাক্রমে বিশ্বের নবম, দশম ও একাদশ বৃহত্তম উৎপাদক। বিশ্বের নাইট্রোজেনভিত্তিক সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে মার্চের শুরু থেকেই এই প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৭ মার্চ সেখানে মাত্র চারটি জাহাজ চলাচল করেছে। অথচ ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন গড়ে চলাচল করত প্রায় ১২৯টি জাহাজ। ফলে বিপুল পরিমাণ সার বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে পারছে না। এর প্রভাব পড়েছে দামের ওপরও। যুদ্ধ শুরুর আগের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রতি টন ইউরিয়ার দাম ছিল ৪৬৪ ডলার। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯৪ ডলার।

শুধু ইউরিয়া নয়, কৃষিতে ব্যবহৃত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সালফার, যা জীবাশ্ম জ্বালানির উপজাত। এর দামও চীনের বাজারে একই সময়ে ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমুদ্রপথে জাহাজের জ্বালানি ব্যয় এবং বীমা খরচের দ্রুত বৃদ্ধি।

পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো শুধু সারই উৎপাদন করে না, তারা বিদেশি সার কারখানার জন্য গ্যাসও রপ্তানি করে। যুদ্ধের কারণে কাতার হঠাৎ করেই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্ববাজার থেকে এক ধাক্কায় প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ কমে যায়। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই পড়েছে ভারতের সার শিল্পে। ভারতীয় ইউরিয়া উৎপাদকরা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে এবং কিছু কারখানা বন্ধ করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।

কৃষি উৎপাদনের খরচ বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে ভোক্তাদের ওপর। অর্থাৎ খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির সময় সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সারের দাম বৃদ্ধির কারণে ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে খাদ্যের দাম ২০১৯ সালের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) রাশিয়ার গ্যাসের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের এলএনজির ওপর নির্ভর করছে।

কিন্তু এখন সেই সরবরাহও ব্যাহত হওয়ায় ইউরোপের অনেক সার কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। পোল্যান্ডের রাষ্ট্রায়ত্ত সার কোম্পানি গ্রুপা আজোটি এসএ (গ্রুপা আজোটি এসএ) মার্চের শুরুতে নতুন অর্ডার নেয়া সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। কারণ ইউরোপে গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়। পরে বাজারদর অনুযায়ী কয়েক দিন পর আবার অর্ডার নেয়া শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সবচেয়ে বড় বিপদের মুখে রয়েছে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো।

জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুদান, শ্রীলঙ্কা, তানজানিয়া, সোমালিয়া, কেনিয়া এবং মোজাম্বিক- এই ছয়টি দেশ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা সারের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সুদানে ব্যবহৃত সারের ৫৪ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ব্যবহৃত সারের ৩৬ শতাংশ আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। উন্নয়নশীল দেশের কৃষকরা সাধারণত উৎপাদন খরচ বাড়লে তা সামাল দিতে পারেন না। ফলে দ্রুত খাদ্য ঘাটতি তৈরি হয় এবং অনেক সময় তা দুর্ভিক্ষে রূপ নিতে পারে।

তেল-গ্যাসের বাজারের মতো সারের বাজারেও উচ্চ দাম কিছু দেশের জন্য লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। এর অন্যতম উদাহরণ রাশিয়া। বেলারুশ-সহ এই দুই দেশ বিশ্বের মোট সার রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। রাশিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির সার উৎপাদন ৩.৫ শতাংশ বেড়ে ৬৫.৪ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে- যা একটি নতুন রেকর্ড।

যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়া ও বেলারুশের সারের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে, তাদের লক্ষ্য ছিল ‘রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতিকে দুর্বল করা।’ কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে উল্টো ফল হয়েছে। রাশিয়া তার সার রপ্তানি ঘুরিয়ে দিয়েছে ব্রিকস দেশগুলোর দিকে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এসব দেশে রাশিয়ার সার রপ্তানি ৬০ শতাংশ বেড়েছে। দেশটির কৃষকেরাও এখন তুলনামূলক সস্তা সার পাচ্ছেন। ফলে রাশিয়ায় নতুন ধনী শ্রেণি তৈরি হচ্ছে।

ফোর্বস-এর ২০২৬ সালের বিলিয়নিয়ার তালিকা অনুযায়ী, গত বছর রাশিয়ায় নতুন যে ১৪ জন ডলার বিলিয়নিয়ার যুক্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে ৭ জনই কৃষি ও খাদ্য খাত থেকে সম্পদ অর্জন করেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন আলেকজান্দর তাকাচেভ, বৃহৎ কৃষি প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকমপ্লেক্স-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ভাদিম মশকোভিচ, বৃহৎ খাদ্য কোম্পানি রুসাগ্রোর নিয়ন্ত্রক। এছাড়া সার ব্যবসায়ী আন্দ্রেই মেলনিচেঙ্কো এবং দিমিত্রি মাজেপিন-এর সম্পদও ইউরোপের সারের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে আরও বেড়েছে।

  • খাদ্য সংকট
  • জীবনযাত্রা
  • বিশ্ব
  • মধ্যপ্রাচ্য
  • যুদ্ধ
  • #