আট মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৭১,৪৭২ কোটি টাকা, পরবর্তী ৪ মাসের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লক্ষ কোটি টাকা

: যথাসময় ডেস্ক
প্রকাশ: ১ ঘন্টা আগে

চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে রাজস্ব আদায়ে যে ভাটা পড়েছিল, তা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সবচেয়ে কম ৩ দশমিক ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয় গত জানুয়ারিতে। পরের মাসে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।

গতকাল বুধবার প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য বলছে, আট মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা।

ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে, ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অক্টোবর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি ছাড়া বাকি মাসগুলোতে রাজস্ব আদায়ে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি দেখেছে এনবিআর।

এতে করে চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে রাজস্ব আদায়ে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
একক মাস হিসেবে জুলাইয়ে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয় ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ; অগাস্টে ১৮ দশমিক ০৩ শতাংশ আর সেপ্টেম্বরে তা দাঁড়ায় ২০ দশমিক ১৫ শতাংশে। সব মিলিয়ে আগের অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আদায় বাড়ে ২০ দশমিক ৮০ শতাংশ।

এরপরেই ধাক্কা আসে, অক্টোবর মাসে প্রবৃদ্ধি হয় কেবল ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ। তারপর নভেম্বর ও ডিসেম্বরে স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও শেষ ধাক্কা এসে লাগে জানুয়ারি মাসে। তা থেকে ফেব্রুয়ারিতে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও মাসটিতে এক অঙ্কের ঘরেই ছিল প্রবৃদ্ধি।

একক মাস হিসেবে নভেম্বরে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ দশমিক ৪১ শতাংশ আর ডিসেম্বরে ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরে সরকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এনবিআরের মাধ্যমে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা আহরণ করতে চায়। বাজেটে যা ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা।

বাজেটে অর্থ উপদেষ্টা এনবিআর ও সব উৎস থেকে মোট ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলেন, যা জিডিপির ৯ শতাংশ। এর মধ্যে অন্যান্য উৎস থেকে ৬৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় নির্বাচন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটসহ নানা কারণে এ বছর ব্যবসা-বাণিজ্যে শ্লথগতি ছিল। ভবিষ্যতেও এই সংকট চলমান থাকার শঙ্কা আছে। করের আওতা বৃদ্ধি, কর পরিপালন নিশ্চিতকরণ, কর ফাঁকি প্রতিরোধ ও ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধার করার কাজ করছে এনবিআর।

রাজস্ব বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত আছে। সংস্থাটি ৪৭০ কোটি টাকার ঋণের শর্ত হিসেবে প্রতিবছর জিডিপির আধা শতাংশের বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের শর্ত দিয়েছে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও আয়কর—এই তিন খাতের মধ্যে কোনো খাতেই লক্ষ্য অর্জন হয়নি।

মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত অর্থবছরের শেষ চার মাসে বিপুল পরিমাণ শুল্ক–কর আদায় করতে হবে। নতুন সরকারকে মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যে প্রায় তিন লাখ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। প্রতি মাসে গড়ে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আদায় করতে হবে।

এত বিপুল অর্থ আদায় করা সহজ নয়। কারণ, চলতি অর্থবছরের কোনো মাসেই এত রাজস্ব আদায় হয়নি। গত জানুয়ারিতে সর্বোচ্চ ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা আদায় করেছে এনবিআর। আর এ বছরের সর্বনিম্ন রাজস্ব আদায় হয়েছে গত আগস্টে ২৭ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজস্ব খাতে সংস্কারের অংশ হিসেবে এনবিআরকে বিলুপ্ত করে রাজস্ব আদায় ও নীতি নিয়ে দুটি আলাদা বিভাগ করার অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশ অনুসারে এখনো দুটি বিভাগ হয়নি। এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে এক ধরনের বাধা আছে। এ নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। নতুন সরকারকে এখন সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, করজালের বাইরে থাকা করযোগ্য মানুষকে করের আওতায় আনা, রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো, ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া—এসব পুরোনো সমস্যার সমাধানে মনোযোগী হতে হবে।

 

  • ঘাটতি
  • রাজস্ব
  • #