চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬) দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ১ মাস থেকে ১৭ বছর বয়সী অন্তত ২৩১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তিন মাসে মোট সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রায় ১৬ শতাংশই শিশু। নারী ও শিশু অধিকারভিত্তিক সংগঠন ‘সেবা বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সংগঠনটি দেশের ১১টি জাতীয় দৈনিক, ১৩টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। এতে বলা হয়েছে, সড়কে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান ক্রমেই বাড়ছে এবং প্রতিদিনই তারা প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত শিশুদের মধ্যে ১১৩ জন (৪৮.৯১ শতাংশ) বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী, চালক বা হেলপার হিসেবে এবং ১১৮ জন (৫১.০৮ শতাংশ) পথচারী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে।
পথচারী শিশুদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়ী থ্রি-হুইলার ও নসিমন-ভটভটি, যেগুলোর ধাক্কায় নিহত হয়েছে ৪৯ শিশু (৪১.৫২ শতাংশ)। এছাড়া বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের চাপা বা ধাক্কায় মারা গেছে ৪৪ শিশু (৩৭.২৮ শতাংশ)। প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জীপের কারণে ১১ শিশু (৯.৩২ শতাংশ) এবং মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ১৪ শিশু (১১.৮৬ শতাংশ) নিহত হয়েছে।
সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, আঞ্চলিক সড়কগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এসব সড়কে নিহত হয়েছে ৮৫ শিশু (৩৬.৭৯ শতাংশ)। গ্রামীণ সড়কে ৫৬ শিশু (২৪.২৪ শতাংশ), মহাসড়কে ৫২ শিশু (২২.৫১ শতাংশ) এবং শহরের সড়কে ৩৮ শিশু (১৬.৪৫ শতাংশ) প্রাণ হারিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রাম ও আঞ্চলিক সড়কে নজরদারি ও আইন প্রয়োগ কম থাকায় সেখানে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি।
দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুপুর ও সকালে দুর্ঘটনার হার বেশি। দুপুরে ৬৮টি (২৯.৪৩ শতাংশ) এবং সকালে ৬১টি (২৬.৪০ শতাংশ) দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিকেলে ৫৭টি (২৪.৬৭ শতাংশ), সন্ধ্যায় ২২টি (৯.৫২ শতাংশ), রাতে ১৭টি (৭.৩৫ শতাংশ) এবং ভোরে ৬টি (২.৫৯ শতাংশ) দুর্ঘটনা ঘটেছে।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কিশোর বয়সী শিশুরা। ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১০৪ শিশু (৪৫.০২ শতাংশ) নিহত হয়েছে। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে নিহত হয়েছে ৮৬ জন (৩৭.২২ শতাংশ) এবং ১ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশু নিহত হয়েছে ৪১ জন (১৭.৭৪ শতাংশ)।
প্রতিবেদনে শিশু মৃত্যুর পেছনে বেশ কিছু কাঠামোগত ও সামাজিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—শিশুবান্ধব সড়ক অবকাঠামোর অভাব, সড়ক ব্যবহারে শিশুদের অজ্ঞতা, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ঘাটতি, অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো, দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা।
সেবা বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন জানায়, ঘটনাগুলোর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অধিকাংশ শিশু নিহত হয়েছে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে অথবা বাড়ির আশপাশের সড়কে খেলাধুলার সময়। বিশেষ করে গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কগুলো অনেক ক্ষেত্রে বসতবাড়ির একেবারে পাশ দিয়ে গেছে, যেখানে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা থাকে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিও সীমিত, ফলে চালকেরা প্রায়ই বেপরোয়া আচরণ করেন।
সেবা বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ইয়াসমিন আরা বলেন, ‘বর্তমানে হাম পরিস্থিতি যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু মৃত্যুও অত্যন্ত বেদনাদায়ক- যা অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য। এতে শিশুদের কোনো দোষ নেই, বরং দায় রাষ্ট্র ও সমাজের।’
তিনি বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ জরুরি। যেমন—ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি চালকদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা চাপমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এছাড়া স্কুলবাস চালু করা গেলে সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনা—দুই-ই কমবে।’
ইয়াসমিন আরা বলেন, একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজের সচেতনতার ওপরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। অভিভাবকদের উচিত শিশুদের নিয়ে রাস্তায় চলাচলের সময় ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করা। এছাড়া, স্কুল পর্যায়ে নিরাপদ সড়ক ব্যবহারের বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।