মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে বাংলাদেশের জিডিপি ১.২% কমতে পারে, মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে ৪% : সানেম

: যথাসময় ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ ঘন্টা আগে

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের ফলে সৃষ্ট জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি এবং প্রকৃত মজুরি হ্রাস পেতে পারে। একই সাথে বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতির চাপ। দক্ষিণ এশীয় নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।

সানেম জানায়, আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের অতি-নির্ভরশীলতা আমদানি ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি বড় হওয়ার পাশাপাশি তেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হবে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার যুদ্ধ জ্বালানি উৎপাদন, ট্যাঙ্কার চলাচল এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে আরও বলা হয়, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে একটি বড় ধরনের জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সাপ্লাই চেইনের ওপর দেশের সংবেদনশীলতাকে প্রকাশ করেছে।

এনার্জি কনসাল্টিং ফার্ম ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, এই রুটের মাধ্যমে সরবরাহ করা বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের অন্তত ২০ শতাংশ এখন ঝুঁকির মুখে। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক হামলার কারণে কাতার তাদের উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।

সানেমের মতে, বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। কারণ দেশটির এলএনজি আমদানির ৭২ শতাংশ আসে কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে, যা এখন কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন। এই সরবরাহ সংকট এমন এক সময়ে এসেছে যখন দেশীয় উৎপাদন হ্রাসের কারণে বাংলাদেশ এমনিতেই একটি কাঠামোগত গ্যাস ঘাটতির মোকাবিলা করছে। সানেম তিনটি চ্যানেলের কথা উল্লেখ করেছে যার মাধ্যমে এই সংঘাত দেশীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে—জ্বালানি, রেমিট্যান্স এবং বাণিজ্য ও লজিস্টিকস।

সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়নের জন্য সানেম ‘গ্লোবাল ট্রেড অ্যানালাইসিস প্রজেক্ট’ (জিটিএপি) মডেল ব্যবহার করে বেশ কিছু পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেছে। এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যদি বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১.২ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি ২ শতাংশ এবং আমদানি ১.৫ শতাংশ কমতে পারে।

এর ফলে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়বে। ভোক্তা পর্যায়ে দাম প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং মানুষের প্রকৃত মজুরি প্রায় ১ শতাংশ কমতে পারে, যার অর্থ হলো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে।

সেক্টরভিত্তিক প্রভাবে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন ১.৫ শতাংশ, পরিবহন খাত প্রায় ৩ শতাংশ এবং কৃষি উৎপাদন প্রায় ১ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। এ ছাড়া অধিক জ্বালানি-নির্ভর উৎপাদনশীল খাতে প্রায় ২.৫ শতাংশ উৎপাদন কমতে পারে।

সানেম জানিয়েছে, এ পরিস্থিতিতে সরকারি পদক্ষেপগুলো নিয়ে জনমনে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয় ও রেশনিং ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জ্বালানি প্রাপ্যতার বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে অমিল পরিলক্ষিত হচ্ছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সানেম নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্রুত গ্রহণের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ছাদের ওপর সৌরবিদ্যুৎ (রুটটপ সোলার) ব্যবস্থা জনপ্রিয় করা এবং নেট-মিটারিংয়ের দ্রুত অনুমোদন ও এ ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগকে সহায়তা করা।

সংস্থাটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো, শুল্কমুক্ত যন্ত্রপাতির মতো আর্থিক সুবিধা দেওয়া এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি কমিয়ে তা নবায়নযোগ্য খাতে স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে।

স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবে সানেম বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্যকরণ এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি কৌশলগত জাতীয় জ্বালানি রিজার্ভ গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছে। অতিরিক্ত পদক্ষেপ হিসেবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে জ্বালানি রেশনিং, শিল্পকারখানা অফ-পিক আওয়ারে চালানো, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সময় কমানো এবং কৃষি ও রপ্তানিমুখী শিল্পে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মধ্যমেয়াদি সহনশীলতা অর্জনের জন্য সানেম অস্থির আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশের অভ্যন্তরে (স্থল ও সমুদ্রভাগ) গ্যাস অনুসন্ধান দ্রুত করার সুপারিশ করেছে।

সূত্র : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড

  • জিডিপি
  • বাংলাদেশ
  • মধ্যপ্রাচ্য
  • মূল্যস্ফীতি
  • যুদ্ধ
  • সানেম
  • #