ভাঙনকবলিত সন্ধ্য নদীতে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার পাঁয়তারা জেলা প্রশাসনের

: যথাসময় ডেস্ক
প্রকাশ: ১ ঘন্টা আগে

সন্ধ্যা নদী থেকে বেপরোয়া বালু উত্তোলনের কারণে ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়েছে বরিশালের বানারীপাড়া ও উজিরপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। গত আওয়ামী সরকারের আমলে স্থানীয় জনসাধারণের বিক্ষোভ-প্রতিবাদ সত্ত্বেও সন্ধ্যা নদীতে ৬টি পয়েন্টের বালুমহাল ইজারা দেয় বরিশাল জেলা প্রশাসন। আইন ও নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে আবারও বরিশাল জেলা প্রশাসন এ ভাঙনকবলিত নদীতে বালুমহাল ইজারা দেওয়ায় পাঁয়তারা করছে। ভাঙনপ্রবণ এ সন্ধ্যা নদীর খেজুরবাড়ী ও মসজিদবাড়ীর পয়েন্টে যথাক্রমে দুই একর ও সাত একর নদীর জায়গা বালুমহাল ঘোষণা করে দরপত্র আহ্বান করছে জেলা প্রশাসক এবং বরিশাল জেলা বলুমহাল কমিটির সভাপতি সভাপতি মো. খায়রুল আলম সুমন।

মসজিদ বাড়ীর যে পয়েন্টে পাঁচ একর বালুমহাল ঘোষণা করে ইজারা দেওয়ার পাঁয়তারা করছে , সেই পয়েন্টে মসজিদবাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মসজিদ বাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ বাড়ী দারুসসুন্নাত আলিম মাদরাসা, মসজিদবাড়ী ইসলামিয়া কলেজ, মসজিদ বাড়ী বালিকা বিদ্যালয়সহ স্থানীয় সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি নদতে বিলিন হয়ে যাওয়ার হুমকিতে রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি- নদীতে ব্লক ফেলে নদীভাঙনের হাত থেকে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করা, কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন তা না করে আইনের লঙ্ঘন করে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার পাঁয়তারা করছে।

ভাঙনকবলিত সন্ধ্য নদীতে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার পাঁয়তারা জেলা প্রশাসনের

অভিযোগ রয়েছে- স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও স্থানীয় প্রশাসনের যোগসাজশে তড়িঘড়ি করে ইজারার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে যাচ্ছে জেলা প্রশাসন। এই ইজারার বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে এলাকার মানুষ। এর আগে এ নদীতে বালু উত্তোলনের প্রতিবাদে বানারীপাড়ায় বিক্ষোভ সমাবেশ মিছিল ও মানববন্ধন করে সর্বস্তরের মানুষ।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে- খেজুরবাড়ি, নবগ্রাম, মসজিদবাড়ি, গোহাইলবাড়ি, বাংলাবাজার, নাটুয়ার পাড়, শিয়ালকাঠী, দান্ডেয়াট, ডুমুরিয়া, বরানগাতি, পূর্ব জিরাকাঠী, ব্রাহ্মণকাঠী, বাগরা ও জম্বুদ্বীপ এলাকায় ভয়াবহভাবে ভাঙছে সন্ধ্যা নদী। নদী ভাঙনের কারণে ঝুঁকির মুখে বানারীপাড়ার শিয়ালকাঠী ফেরি ঘাট, মসজিদবাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কালির বাজার ও জম্বুদ্বীপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মিরেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আগের ভবনসহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা। এর মধ্যে মসজিদবাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দান্ডোয়াট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাটুয়ারপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তরকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নলশ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জাঙ্গালীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আরও বেশ কয়েকটি স্কুল ৪ থেকে ৫ বার স্থানান্তর করতে হয়েছে। এমন পরিবারও রয়েছে যারা নদী ভাঙনের কারণে ৪-৫ বার ঘর বদল করেও ফের নদী ভাঙনের মুখে পড়েছে। বানারীপাড়ার পাশাপাশি উজিরপুর উপজেলার বহু এলাকাও পড়েছে তীব্র ভাঙনের কবলে। উজিরপুরের শিকারপুর, দাসেরহাট, হক সাহেবের হাট, লস্করপুর, ডাবেরকুলসহ বহু এলাকায় নদী ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়েছে শত শত মানুষ।

ভাঙনকবলিত সন্ধ্য নদীতে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার পাঁয়তারা জেলা প্রশাসনের

এছাড়া মৎস্য সম্পদে সন্ধ্যা নদী ভরপুর। এ নদীর দু’পাড়ের অসংখ্য মানুষ এ নদীতে ইঁলিশসহ নানা মাছ ধরে জীবন চালায়। এ নদীতে বালু তোলার ফলে মৎস্য প্রজননের অভয়ারণ্য বিনষ্ট হচ্ছে। ফলে জেলেদের জীবন-জীবিকার ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে।

বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০- উল্লেখ রয়েছে- বালু বা মাটি উত্তোলন বা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ড্রেজিংয়ের ফলে কোনো নদীর তীর ভাঙনের শিকার হয় এমন নদী থেকে বালু উত্তোলন করা যাবে না। নদীর ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মৎস্য, জলজ ও স্থলজ প্রাণি, ফসলি জমি বা উদ্ভিদ বিনষ্ট হয় বা হবার আশঙ্কা থাকে এমন নদী থেকেও বালু উত্তোলন করা যাবে না।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়- নদী ভাঙনের কারণ হচ্ছে নদী দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন রোধ করতে হবে। জেলা প্রশাসন বালু উত্তোলনের জন্য বালুমহাল ইজারা দিয়ে থাকে। সে ব্যাপারে জেলা প্রশাসন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে বালুমহাল ঘোষণা করতে হবে। তবে অনেক সময় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইজারাদাররা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশে নদীর তীরসংলগ্ন এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করে। ফলে নদীর তীর সংরক্ষণ করা যায় না, আবার ভাঙন শুরু হয়। নদীশাসন ও নদী ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন রোধ না করা গেলে প্রকল্পগুলোর সুফল অনেকাংশে কমে যাবে। তাই যেকোনোভাবেই স্থানীয় প্রশাসনকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

খেজুরবাড়ি ও মসজিদবাড়িতে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে স্থানীয় সচেতনমহলের পক্ষ থেকে সোলাইমান শাহীন বলেছেন, স্থানীয় জনমতকে উপেক্ষা করে নদী ভাঙনকবলিত এলাকায় বালু উত্তোলন করা হলে মানুষের দুর্ভোগ ও বাস্তুহারা হওয়ার ঝুঁকি চরমভাবে বৃদ্ধি পাবে। এই হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে কোনো বিরুপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার স্থানীয় প্রশাসনকেই বহন করতে হবে।

নদীভাঙনকবলিত এলাকার বিশিষ্টজন, বাংলা একাডেমি পুরস্কাপ্রাপ্ত অনুবাদক ও সাবেক রাজস্ব বোর্ডের সদস্য আলী আহমদ বলেন, ভাঙনকবলিত নদীতে স্থানীয় প্রশাসন কীভাবে বালুমহাল ঘোষণা করে। এ বিষয়ে আমি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এ ভাঙনকবলিত নদীতে বালু তোলার কারণে আমার এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মসজিদ বাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজ একাধিকবার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আবার সবার সহযোগিতায় নতুন করে তৈরি করেছি। এখন আবার এ প্রতিষ্ঠানটি নদীর কিণারে এসেছে। আমরা নদীভাঙন রোধে যেখানে সরকারের সহযোগিতা চাচ্ছি, সেখানে স্থানীয় প্রশাসন বালুখেকোদের বালু তোলার সুব্যবস্থা করে দিয়ে আমাদের সাধারণ মানুষদেরকে নদীগর্ভে বিলীন করতে তোড়জোর করছে।

ভাঙনকবলিত সন্ধ্য নদীতে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার পাঁয়তারা জেলা প্রশাসনের

এ বিষয়ে বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ( ইউএনও) মো. বায়েজিদুর রহমানের সঙ্গে যাগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বালুমহালের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, স্থানীয়ভাবে বালুর চাহিদা মেটানোর জন্য বালুমহাল থাকতে হয়। ভাঙনকবলিত নদীতে বালুমহাল ঘোষণার নিয়ম আছে কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি সার্ভেয়ার, এসিল্যান্ড ও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে বলেন।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক এবং বরিশাল জেলা বলুমহাল কমিটির সভাপতি সভাপতি মো,. খায়রুল আলম সুমনের সঙ্গে তার অফিসিয়াল মোবাইল ফোনের হোয়াটসঅ্যাপে একধিকবার ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ক্ষুদেবার্তা দিয়ে জানার চেষ্টা করা হলেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

  • ইজারা
  • জেলা প্রশাসন
  • বালুমহাল
  • সন্ধ্য নদী
  • #