* রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কারে চাপ * বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি প্রত্যাহারের চাপ * কিস্তির অর্থ ছাড় বিলম্বিত হতে পারে * আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্কটি চ্যারিটি নয়, বাণিজ্যিক সম্পর্ক : অর্থমন্ত্রী
রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কার বাস্তবায়নসহ নানা শর্তে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি ঝুলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তবে ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস উইং জানিয়েছে, উভয়পক্ষই একমত হয়েছে যে আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং সংলাপের মাধ্যমে অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধান করা সম্ভব হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় অংশগ্রহণ শেষে গত শনিবার দেশে ফিরেছেন জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল রোববার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি বলেছেন, আইএমএফের সব শর্ত মেনে বর্তমান নির্বাচিত সরকার ঋণ নেবে—এমনটি ভাবার কারণ নেই। কারণ আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্কটি কোনো চ্যারিটি নয়, বরং এটি একটি বাণিজ্যিক সম্পর্ক।
তিনি আরও বলেন, আইএমএফের সঙ্গে ঋণ নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে। আরো ১৫ থেকে ২০ দিন চলতে পারে, এমনকি একমাসও চলতে পারে। আইএমএফ-এর সঙ্গে আলোচনায় আমরা পুরোপুরি একমত হতে পারিনি। আইএমএফ কি চাচ্ছে সেটা আমরা পর্যালোচনা করছি।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বিশ্লেষণে জানা যায়- যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে এ অবস্থায় চলমান ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় চলতি অর্থবছরের জুনের মধ্যে ১.৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার যে আশা করছে বাংলাদেশ, তা জুনের মধ্যে ছাড় করা হবে না কি না- নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বর্তমান কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ এখনো মোট ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার পাবে, যার মেয়াদ আগামী জানুয়ারিতে শেষ হবে।
আইএমএফ আমাদের বলেছে, ঋণচুক্তির আওতায় রাজস্ব খাত ও ব্যাংক খাত সংস্কার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি প্রত্যাহার, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নিশ্চিত করাসহ যেসব শর্ত ছিল, বাংলাদেশ সেগুলো বাস্তবায়ন করেনি। এ অবস্থায়, চলমান ঋণচুক্তির বাস্তবায়ন পরিস্থিতি রিভিউ (পর্যালোচনা) না করে ঋণের কিস্তি ছাড় করার ব্যাপারে তারা আগ্রহী নয়। বাংলাদেশ যদি সব শর্ত পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বর্তমান কর্মসূচি চালিয়ে যেতে চায়, তবুও কোনো অর্থ ছাড় বিলম্বিত হতে পারে।
তবে গত মাসে বাংলাদেশ সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক করে আইএমএফ-এর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল জুনে কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি।
গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন বলেন, তিনি সাম্প্রতিক বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমীর খসরুর সঙ্গে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নতুন সরকার ক্ষমতায় থাকায় এখনই উচ্চাকাঙ্ক্ষী সংস্কারের পদক্ষেপ গ্রহণের উপযুক্ত সময়।
আইএমএফ-এর ঋণ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে গতকাল অর্থমন্ত্রী বলেন, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের অনেক বিষয় রয়েছে। সেসব নিয়ে আলোচনা হয়, এখানে অ্যামাউন্ট কোনো বিষয় নয়। অনেকে সেটি বুঝতে চায় না। আইএমএফ কী চাচ্ছে সেটা আমরা পর্যালোচনা করছি। আমাদেরও চাওয়া পাওয়া রয়েছে, আমরা একটি নির্বাচিত সরকার। কেউ কিছু চাইলেই আমরা সেটা মানব সেরকম না। বর্তমান সরকার জনগণের, ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এরকম কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আইএমএফের সঙ্গে বর্তমানে যে ঋণ কর্মসূচিটি রয়েছে, সেটি আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া এবং সেখানে অনেক শর্ত রয়েছে। আর এর মেয়াদ রয়েছে মাত্র সাত মাস। আওয়ামী লীগ সরকার যেসব শর্তে এই ঋণ নিয়েছিল, তার সবকিছু বর্তমান সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। জনগণের অসুবিধা হতে পারে এমন কোনো সিদ্ধান্ত বর্তমান নির্বাচিত সরকার নেবে না। আমরা সিদ্ধান্ত নেব পরবর্তী প্রোগ্রামে যাব কি না।
বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের স্প্রিং মিটিং-এর সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের ঋণের পরবর্তী কিস্তি স্থগিত করেছে। গত শুক্রবার গণমাধ্যমে আসা এ খবরকে নাকচ করে দিয়েছে সরকার। ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস উইং থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, শুক্রবার অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল আইএমএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুটি বৈঠক করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণ দেখিয়ে আইএমএফ ঋণের পরবর্তী কিস্তি স্থগিত করেছে বলে গণমাধ্যমে যে খবরটি প্রকাশিত হয়েছে, তা ‘সম্পূর্ণ অসত্য’। এতে বলা হয়, বৈঠকগুলোতেও এ ধরনের কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং আলোচনাগুলো অত্যন্ত ‘ইতিবাচক ও প্রাণবন্ত’ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন গণমাধ্যমকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। ব্যাংক খাতে কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। রাজস্ব খাতে কোনো সংস্কার হয়নি এবং পর্যায়ক্রমে ভর্তুকি কমানোরও কোনো প্রচেষ্টা ছিল না। এ কারণেই আইএমএফ বর্তমান ঋণ কর্মসূচিতে অসন্তুষ্ট এবং এখন এটি থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। আইএমএফ কর্মসূচির শেষ কিস্তিগুলো পর্যালোচনার আগে সরকারের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। হয় সরকার আইএমএফের সব শর্ত মেনে কর্মসূচি চালিয়ে যাবে, অথবা শর্ত প্রত্যাখ্যান করে চুক্তি থেকে সরে আসবে।