বিশ্ব এখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি বলে মন্তব্য করেছেন ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ)-এর প্রধান ফাতিহ বিরোল। এর প্রভাব পড়ছে বিশ্বেজুড়ে জনজীবনের জীবনযাত্রায়। ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনায় তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এর বহুমুখী প্রভাব কেবল জ্বালানি তেলের দামের ওপর সীমাবদ্ধ নেই। বরং পোশাক, খেলনা ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মতো হাজারো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর কাঁচামালের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যে অস্থিরতার শঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরে সিএনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আইইএ প্রধান ফাতিহ বিরোল বলেন, বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে আছে। বর্তমানে বিশ্ববাজার থেকে প্রতিদিন ১৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ হারিয়ে গেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে।
তিনি আরও বলেন, ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এ সংকটের ফলে পারমাণবিক জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি, সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়তে পারে। তবে কিছু দেশে কয়লার ব্যবহারও আবার বাড়তে পারে, বিশেষ করে এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলোতে।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের নিষেধাজ্ঞার কারণে জলপথটি কার্যত ‘দ্বৈত অবরোধে’ রয়েছে।
আইইএ সতর্ক করে বলেছে, এ পথ বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং জ্বালানি রেশনিংয়ের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ইউরোপে জেট ফুয়েলের ঘাটতি আসন্ন বলে সতর্ক করে বিরোল বলেন, ইউরোপের প্রায় ৭৫ শতাংশ জেট ফুয়েল মধ্যপ্রাচ্যের রিফাইনারি থেকে আসে, যা এখন প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
তিনি জানান, ইউরোপ এখন যুক্তরাষ্ট্র ও নাইজেরিয়া থেকে জেট ফুয়েল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। অতিরিক্ত আমদানি নিশ্চিত করা না গেলে ইউরোপ সমস্যায় পড়বে। পাশাপাশি, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং সেখান থেকে রফতানি আবার শুরু হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিরোল। তবে প্রয়োজনে ইউরোপে বিমান ভ্রমণও কমানোর মতো পদক্ষেপ নিতে হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
৩২ সদস্যের আইইএ মার্চ মাসে জরুরি মজুত থেকে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের প্রভাব কিছুটা কমানো যায়। তবে বিরোল বলেন, এটি কেবল কষ্ট কমাবে, সমস্যার সমাধান নয়। প্রকৃত সমাধান হলো হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া।
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনায় তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এর বহুমুখী প্রভাব কেবল জ্বালানি তেলের দামের ওপর সীমাবদ্ধ নেই। বরং পোশাক, খেলনা ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মতো হাজারো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর কাঁচামালের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
মার্কিন সংবাদ সংস্থা এপি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেলের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ায় কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ভোক্তা পর্যায়ে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রায় ৬ হাজারেরও বেশি পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত পেট্রোকেমিক্যাল মূলত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে সংগৃহীত হয়। কম্পিউটারের কিবোর্ড থেকে শুরু করে লিপস্টিক, চুইংগাম, জুতা এমনকি মানুষের দাঁতের নকল পাটিও তৈরিতে পেট্রোলিয়ামজাত উপাদানের বিশেষ প্রয়োজন পড়ে।
খেলনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যালেনি ব্র্যান্ডস-এর প্রধান রিকার্ডো ভেনেগাস জানান, মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তাদের পলিয়েস্টার ও এক্রাইলিকের মতো কাঁচামাল সংগ্রহের ব্যয় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, খেলনার দাম যে তেলের দামের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হতে পারে, তা আগে কে ভেবেছিল?
পরিস্থিতি এমন উদ্বেগজনক থাকলে ২০২৭ সালের শুরুতেই সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বাড়তি দামের বোঝা চাপতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু অর্থনীতিবিদ গার্নট ওয়াগনারের মতে, বিশ্বের মোট তেলের ব্যবহারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভোক্তা পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে ইথিলিন ও প্রোপিলিনের মতো উপাদানগুলো প্লাস্টিক ও সিন্থেটিক ফাইবার তৈরির মূল ভিত্তি।
পোশাক ও জুতা শিল্পেও এই সংকটের প্রভাব অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করেছে। মার্কিন অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুসারে, যুদ্ধের আগে পলিয়েস্টার টেক্সটাইল প্রতি কেজি ৯০ সেন্টে পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা ১ ডলার ৩৩ সেন্টে পৌঁছেছে। এর ফলে প্রতিটি পোশাক তৈরিতে অন্তত ১৫ সেন্ট পর্যন্ত অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ গুণতে হচ্ছে।
এফডিআরএ-এর বিশ্লেষণ মতে, তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে এক জোড়া জুতার দাম ৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। একইভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জেন্টেল-এর সিইও ডেভিড নাভাজিও জানান, আঠাজাতীয় পণ্যের কাঁচামালের দাম ২০ শতাংশ বাড়ায় তারা পণ্যের দাম ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, অতীতে আমি পরিবহন খরচ কমতে দেখেছি, কিন্তু কাঁচামালের দাম কমতে কখনও দেখিনি।
শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলারের ওপরে অবস্থান করলে সরবরাহ চেইনের এই চাপ আরও প্রকট হবে। ইতিমধ্যে রিনসেরু-এর মতো পরিচ্ছন্নতা সরঞ্জাম বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যয় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের প্রতিটি সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে ।