বাংলাদেশের বাজেটের ইতিবৃত্ত : জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ পর্যালোচনা

লেখক: জিয়াউর রহমান
প্রকাশ: ৪ সপ্তাহ আগে

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় বাজেট প্রণয়ন করা হয়। বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়ন করা হয় জুন মাসে এক বছরের জন্য, যা বছরের পহেলা জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ কার্যকর থাকে। মূলত সরকারের নির্দিষ্ট সময়ের (জুলাই ১ থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন ) দেশের আর্থিক পরিকল্পনার সুষ্ঠু চিত্র প্রতিফিলত হয় বাজেটের মাধ্যমে । বাজেট হচ্ছে একটি দেশের সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের হিসাব। সরকারকে দেশ চালাতে হয়, সরকারের হয়ে যাঁরা কাজ করেন তাদের বেতন দিতে হয়, আবার নাগরিকদের উন্নয়নের জন্য রাস্তাঘাট বানানোসহ নানা ধরনের উদ্যোগ নিতে হয়। সুতরাং একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরে কোথায় কত ব্যয় হবে, সেই পরিকল্পনার নামই বাজেট।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৮৭ (১) অনুচ্ছেদে বাজেট শব্দটি ব্যবহারের পরিবর্তে সমরূপ শব্দ ‘বার্ষিক আর্থিক বিবরণী /Annual Financial Statement (AFS)’ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতি বছর জুন মাসে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সরকারের পক্ষে অর্থমন্ত্রী বাজেট বিল আকারে পেশ করেন। জুন ১১, ২০২৬ তারিখে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন, যা জিডিপির ১৩.৭ শতাংশ এবং দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট। এটি দেশের ৫৫তম এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। একইসাথে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট।

স্বাধীনতা পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতির স্বাধীন বাংলাদেশে মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার দেশের প্রথম বাজেট সংসদে উপস্থান করেন জাতীয় নেতা ও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭২ সালের ৩০ জুন। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ একই সঙ্গে ১৯৭১-৭২ ও ১৯৭২-৭৩ অর্থবছর অর্থাৎ দুই অর্থবছরের বাজেট ১৯৭২ সালের ৩০ জুন ঘোষণা করেছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভঙ্গুর অর্থনীতির ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রথম বাজেট যা ছিল বিদেশি অনুদান ও ঋণ নির্ভর যেটাকে তিনি আখ্যা দিয়েছিলেন ‘উন্নয়ন এবং পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন বাজেট’। এবার ঘোষিত বাজেট হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের প্রায় ১২০০ গুণ যার শিরোনাম হচ্ছে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমুলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ ।

একটি দেশের বাজেট ঘোষণার পর সেটি নিয়ে যেভাবে আলোচনা হয়, বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া ততটা সহজ নয়। কেননা প্রতিটি দেশের জন্য প্রণিত বাজেটের কাঠামো ও আইনি ভিত্তিও বহুমাত্রিক। প্রতি বছর সংসদে অর্থমন্ত্রী যে বাজেট উপস্থাপন করেন সেই ‘বাজেট’ শব্দের উৎপত্তি নিয়েই রয়েছে বিস্তর বিতর্ক। কেননা ‘বাজেট’ ইংরেজি শব্দ। সাবেক অর্থ সচিব ও অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলি খান তাঁর রচিত ‘বাংলাদেশে বাজেট : অর্থনীতি ও রাজনীতি’ বইয়ে লিখেছেন- মধ্যযুগের ইংরেজি ‘বুজেট’ (Bougette) থেকে বাজেট শব্দের উৎপত্তি। বুজেট শব্দের অর্থ মানিব্যাগ বা টাকার থলি। বাংলায় থলির সমার্থক বোচকা-পোটলা। বাংলা একাডেমির বিবর্তনমূলক অভিধানে উল্লেখ রয়েছে বাংলায় বাজেট শব্দটি ১৯০২ সালে প্রথম ব্যবহার করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাজেটের উৎপত্তি হয়েছে আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৩’শ বছর আগে। ১৭২৫ থেকে ১৭৪২ সাল পর্যন্ত রবার্ট ওয়ালপুল যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী এবং কার্যত প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি সারাবছরই কর কমানো বা কর বাতিলের দাবি পেতেন। এসব তিনি একটি ‘বুজেটে’ বা মানিব্যাগে ভরে রাখতেন। অর্থবছরের শেষদিকে যখন বাজেট তৈরির কাজ শুরু হতো, তখন তিনি কাগজগুলোর ভিত্তিতে আয়-ব্যয়ের হিসাব দাঁড় করাতেন । মানে বাজেট প্রণয়ন করতেন। সেই থেকে ‘টাকার থলি বা বাজেট’ হয়ে গেছে সরকারের বার্ষিক হিসাব-নিকাশের প্রতিশব্দ। সুতারং ইতিহাস বলে, বাজেট-ব্যবস্থার উৎপত্তি মানিব্যাগ থেকে। শিল্পবিপ্লবের পর ইংল্যান্ডের অর্থনীতি অনেক বড় হয়। ফলে বাজেট-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো বাড়তে থাকে। এত বেশি দাবি আসে যে, এসব প্রস্তাব শুধু একটি মানিব্যাগে সংকুলান সম্ভব হয় না। ফলে মানিব্যাগের জায়গায় আসে ব্রিফকেস। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী সংসদের বাজেট অধিবেশনে ব্রিফকেস নিয়ে যান এবং ব্রিফকেসের ভেতর থাকে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার কপি।
মহান জাতীয় সংসদে প্রতিবছর জুন মাসে অর্থমন্ত্রী বিল আকারে যে বাজেট উপস্থাপন করেন তার আইনি ভিত্তি হচ্ছে মূলত বাংলাদেশের সংবিধান। সংবিধানের ৮৭(১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে- ‘প্রত্যেক অর্থ-বৎসর সম্পর্কে উক্ত বৎসরের জন্য সরকারের অনুমিত আয় ও ব্যয়-সংবলিত একটি বিবৃতি যা ‘বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’ বা AFS নামে অভিহিত। অর্থ্যাৎ সংবিধানে স্পষ্টভাবে বাজেট শব্দটি উল্লেখ নেই আছে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’ । মূলত এই বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’ই ‘বাজেট’ নামে অভিহিত। সংবিধানের পঞ্চম ভাগের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের আওতায় ৮১ থেকে ৯৩ নম্বর অনুচ্ছেদে সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনার ভিত্তি বর্ণিত আছে। তাছাড়া সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘অর্থ-বৎসর’ অর্থ জুলাই মাসের প্রথম দিবসে যে বৎসরের আরম্ভ।

বাংলাদেশের সংসদে অর্থমন্ত্রী যে বাজেট উপস্থাপন করেন তার রীতি বর্ণিত আছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি’তে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ষোড়শ অধ্যায়ে ‘আর্থিক বিষয়াবলী সংক্রান্ত কার্যপদ্ধতি’ শিরোনামে বাজেট, মঞ্জুরি-দাবি, নির্দিষ্টকরণ বিল, সম্পূরক ও অতিরিক্ত মঞ্জুরি এবং ঋণের ওপর ভোট, ছাঁটাই প্রস্তাব, প্রস্তাবের ওপর আলোচনা, আলোচনার জন্য স্পিকার বরাদ্দকৃত সময় ইত্যাদির বিশদ বর্ণনা রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১১১(১) বিধিতে বার্ষিক আর্থিক বিবৃতিকে ‘বাজেট’ নামে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি’র ১১১(২) বিধিতে বলা হয়েছে, ‘এই ব্যাপারে সংবিধানের বিধান সাপেক্ষে অর্থমন্ত্রী যেরূপ উপযোগী মনে করেন, সেই আকারে বাজেট সংসদে পেশ করিবেন।’

১৯৭২ সাল থেকে সংসদে বাজেট উপস্থাপন করা হলেও ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট কোনো আইন ছিলনা। যারফলে, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রিত হতো মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রণীত বিধির মাধ্যমে। ২০০৯ সালে সংবিধানের ৮৫ অনুচ্ছেদের বিধান সাপেক্ষে বাংলাদেশে প্রণীত হয় ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন-২০০৯’। বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা পরিচালিত ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন-২০০৯’; সচিবালয় নির্দেশমালা-২০২৪; রুলস অব বিজনেস-১৯৯৬; জেনারেল ফিন্যান্সিয়াল রুলস ইত্যাদির বিধি-বিধান মোতাবেক। সংবিধানের ৮২ অনুচ্ছেদ মোতাবেক ‘রাষ্ট্রপতির সুপারিশ’ নিয়ে ‘সংসদে উত্থাপন করা’ হয় অর্থ বিভাগ হতে প্রণীত প্রস্তাবিত বাজেট। অর্থমন্ত্রী সংসদে বাজেট বিল আকারে উপস্থাপনের পর উত্থাপিত বাজেট নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়, সংসদে তর্ক হয় ও বিতর্ক হয়। সংসদে উত্থাপিত অর্থবিল সংসদ সদস্যদের অনুমোদনের পর এটি আইনে পরিণত হয় এবং তা পরবর্তী অর্থবছরের জন্য কার্যকর হয়। বাংলাদেশে প্রণীত বাজেটের অংশ মূলত তিনটিঃ প্রথম ভাগে থাকে আয়ের হিসাব। অর্থ্যাৎ প্রস্তাবিত বাজেটের সরকারের সম্ভাব্য আয়ের হিসাব থাকে। সরকারের সম্ভাব্য আয়ের উৎস আবার তিনটি যথা: ১। জনগণ কর্তৃক প্রদেয় কর (এনবিআর ও অন্যান্য সংস্থা কর্তৃক আদায়কৃত কর); ২। কর বহির্ভূত আয় (ফি, লভ্যাংশ, অর্থদণ্ড, জরিমানা ইত্যাদি) এবং ৩। বৈদেশিক অনুদান।

বাজেটের দ্বিতীয় ভাগে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব। বাজেটের সম্ভাব্য ব্যয় চারটি ভিন্ন খাতে বিভক্ত করা হয়-  পরিচালন ব্যয়; খাদ্য হিসাবে ক্রয়; ঋণ ও অগ্রিম বাবদ পরিশোধ এবং উন্নয়ন ব্যয়। বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য দরকার আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব। ড. আকবর আলি খান তার ‘বাংলাদেশে বাজেট: অর্থনীতি ও রাজনীতি’ উল্লেখ করেছেন ‘আমরা যেমন দেখি, ‘যদি সঠিক আয়ের হিসাবে বাজেটের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়, তাহলে অনেক অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস করা সম্ভব হবে’।

বাজেটের তৃতীয় ভাগে ‘অর্থ সংস্থান’ অংশে থাকে সম্ভাব্য ঋণের হিসাব। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে বাজেটকে বলা হয় ‘ঘাটতি বাজেট’। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সব বাজেটই ছিল ‘ঘাটতি বাজেট’। এবারও ব্যতিক্রম নয়। এ বছরের বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লক্ষ ৪৩ হাজার কোটি টাকা যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) এর ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে কিছুটা ঘাটতি থাকা ভালো কেননা এতে অব্যবহৃত সম্পদের ব্যবহার বাড়ে, ঘাটতি পূরণের চাপ থাকে এবং অর্থনীতিতে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, সাধারণত জিডিপি’র ৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি বাজেট মেনে নেওয়া হয়। বাজেট ঘাটতি দুভাবে পূরণ করা হয়। যেমন, বৈদেশিক উৎস এটি মূলত বৈদেশিক ঋণ। সরকার বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও দেশ থেকে সহজ শর্তে ঋণ নেয়। এই উৎস থেকে বেশি ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে পারলে তা অর্থনীতির জন্য বেশি সহনীয়। কারণ, এতে সুদ হার কম এবং পরিশোধ করতে অনেক সময় পাওয়া যায়। তবে শর্ত থাকে বেশি। অভ্যন্তরীণ উৎস সরকার দুভাবে দেশের ভেতর থেকে ঋণ নেয়। যেমন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও ব্যাংকবহির্ভূত ব্যবস্থা। ব্যাংকবহির্ভূত ব্যবস্থা হচ্ছে সঞ্চয়পত্র। ‘ঘাটতি বাজেট’ নেতিবাচক শুনালেও এটা বরং উন্নয়ন সহায়ক। আইএমএফের তথ্যমতে, কাতার, লুক্সেমবার্গ, উজবেকিস্তান ইত্যাদি পেট্রো-ডলারে সমৃদ্ধ হাতেগোনা কয়েকটি দেশ বাদে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ‘ঘাটতি বাজেট’ দেওয়া হয়।

দেশে দেশে বাজেট উপস্থাপনের নানা ঐতিহ্য রয়েছে। সব দেশেই অর্থমন্ত্রীদের ব্রিফকেস সঙ্গে নিয়ে সংসদে বাজেট ঘোষণার রেওয়াজ দেখা যায়। তবে ভারতের বর্তমান অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন তার প্রথম বাজেটটি ঘোষণার সময় ব্রিফকেসের পরিবর্তে লালসালুতে মোড়া বাজেট ডকুমেন্ট সঙ্গে নিয়ে সংসদে ঢুকেছিলেন। দক্ষিণ ভারতীয় ঐতিহ্যের লাল শাড়ির সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে ওই বছরের বাজেট ডকুমেন্ট সাজিয়েছিলেন তিনি। কানাডায় ১৯৫০ সাল থেকে সে দেশের অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশের আগের দিন নতুন জুতা কেনেন। সেই নতুন জুতা পায়ে দিয়ে অর্থমন্ত্রী সংসদে যান, বাজেট পেশ করেন।
বাংলাদেশের বাজেটের প্রতীক হলো ‘ব্রিফকেস’। আর এই ব্রিফকেসটি কেনা হয় অর্থ বিভাগে সেবা শাখার মাধ্যমে। জুন ১১, ২০২৬ তারিখে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষনা করেছেন যা জিডিপি ১৩.৭ শতাংশ এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চেয়ে ১ লক্ষ ৪৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। । প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে মোট আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লক্ষ ৯৫ হাজার কোটি টাকা যা, জিডিপি ১০.২ শতাংশ । এর মধ্যে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৬ লক্ষ ৪ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত কর ধরা হয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা। আর কর ছাড়া প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা।

এডিপিতে ৩ লক্ষ কোটি টাকাসহ মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লক্ষ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লক্ষ ২১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। ঘাটতির অর্থ জোগাতে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হবে ১ লক্ষ ১৬ হাজার কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১ লক্ষ ২৭ হাজার কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আগামি অর্থবছরের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমুলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ শিরোনামের এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে মূলত ১০টি সেক্টর যথাঃ সবার জন্য উন্নয়ন; সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা; সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা; বিনিয়োগ-নির্ভর, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমূখী অর্থনীতি; বিনিয়ন্ত্রকরণ এবং সাশ্রয়ী ও সহজীকৃত ব্যবসার পরিবেশ; আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা; জ্বালানি নিরাপত্তা; তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ; প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা। অর্থমন্ত্রী এবার বাজেটে এসব অগ্রাধিকারের পাশাপাশি মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি; ক্রীড়া অর্থনীতি; সবুজ অর্থনীতি ; সুনীল অর্থনীতির ওপর জোড় দিয়েছেন এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের লক্ষ্যে বাজেটে ঘোষিত পরিকল্পনা সরকার মূলতঃ ৩টি ধাপে বাস্তবায়ন করবে, যাকে 3R Strategy হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে: Recovery & Stabilization: অর্থনীতির পুনরুদ্ধার কার্যক্রম, যা ১ বছর মেয়াদি; Restoration: অর্থনীতির উত্তরণ, যা বর্তমান সরকারের ১-৩ বছর মেয়াদের মধ্যে সম্পন্ন হবে; Reconstruction for Acceleration: সমৃদ্ধ অর্থনীতি বিনির্মাণ, যা আগামী ৫ বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে সরকার ৩টি লভ্যাংশ (Dividend) অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে: ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড লংজিভিটি ডিভিডেন্ড; ডেমোক্রেটিক ডিভিডেন্ড যার মাধ্যমে জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে সরকার নীতিগতভাবে ৪টি বিষয়কে প্রধান বিবেচনায় রেখেছে: Value for Money (VFM), অর্থাৎ সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার; Return on Investment (ROI), অর্থাৎ জনগণের সম্পদ যেসকল প্রকল্পে বিনিয়োজিত হচ্ছে তার কার্যকর অর্থনৈতিক সুফল মূল্যায়ন; Job Creation, অর্থাৎ সরকারের বিনিয়োগের সুনির্দিষ্টভাবে কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা; Environmental Consideration, অর্থাৎ প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষার দিকে সজাগ দৃষ্টি।

পরিশেষে বলা যায় যে, স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫ তম বাজেটের শিরোনাম দেয়া হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমুলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ । আমরা আশাবাদী সরকারের নানাবিধ পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রস্তাবিত বাজেট সফল বাস্তবায়ন হবে।

লেখক : সরকারি কর্মকর্তা

  • বাজেট
  • বাংলাদেশ