উর্দু ভাষায় আলাপচারিতার ভাইরাল ভিডিও নিয়ে যা বলছেন বিএনপি ও হেফাজত নেতা

: যথাসময় ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ সপ্তাহ আগে

ধর্মীয় বক্তা, হেফাজত ও বিএনপি নেতার উর্দু ভাষায় কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।

বুধবার (১২ মার্চ) হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর শাখার ইফতার মাহফিলের পর এক ঘরোয়া আলোচনার সময় ধারণ করা হয় বলে জানিয়েছেন সেখানে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি।

ভিডিওতে ধর্মীয় বক্তা কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের কর্মসূচি নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। এসময় বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদও উর্দু ভাষায় জবাব দেন। এ সময় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকসহ আরও কয়েকজন সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

তারা বলছেন, হালকা মেজাজের ঘরোয়া আলোচনার একটি ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া এবং সেটাকে গুরুত্ব দিয়ে আলাপ-আলোচনার কিছু নেই।

তবে তাদের মতে গুরুত্ব দেওয়ার কিছু না থাকলেও সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে এ নিয়ে দেখা গেছে নানা প্রতিক্রিয়া। উর্দুর ভাষার সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকেই এমন প্রতিক্রিয়ার কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

সামাজিক মাধ্যম প্রতিক্রিয়া

ভিডিওতে উপস্থিত ব্যক্তিরা এক ঘরোয়া আড্ডায় হালকা মেজাজের আলাপ বলে দাবি করলেও এনিয়ে সামাজিকমাধ্যমে দেখা গেছে তীব্র প্রতিক্রিয়া।

ভিডিওটি শেয়ার করে লোপা হোসেইন নামে একজন লিখেছেন, ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’- মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ক্যাপশনে হাততালি দেওয়ার তিনটি ইমোজিও দিয়েছেন তিনি।

পারভেজ মোশাররফ নামের আরেকজন সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘এই মজলিশে প্রচুর উর্দু শুনলাম! তারা একদিকে উর্দু বলবে, অপরদিকে শহিদ মিনার ভাঙবে!’

মীর হুযাইফা আল-মামদূহ নামের একজন লিখেছেন, ‘কাজী ইব্রাহিম কেন মজলিসে উর্দু বলছেন জানি না। কিন্তু ওনার উর্দু উচ্চারণ এত জঘন্য, এত জঘন্য উচ্চারণ আমার হইলে আমি মুখই খুলতাম না কখনো। অবশ্য এই জন্যই আমার বাংলা বাদে অন্য ভাষায় দক্ষতা ওইভাবে আসে নাই।

ফাতিন হাসনাত রহমান লিখেছেন, ‘না পারে বাংলা শুদ্ধভাবে বলতে, না পারে উর্দু শুদ্ধভাবে বলতে!’ ভিডিও শেয়ার করে মঞ্জুরুল আহসান লিখেছেন, ‘এরা কোন ভাষায় কথা বলছে? উর্দু, হিন্দি না ফার্সি?’ প্রেম ম্যাথিউস ম্রং লিখেছেন, ‘কবে যে আবার উর্দু ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষা হয়ে যায় মাবুদই জানে।’ মজা করে রুমান শরীফ লিখেছেন, ‘আয়মান সাদিকের উচিত ১০ মিনিট স্কুলে উর্দু ভাষা কোর্স চালু করা। মুনজেরিন একটা বই বের করলো সহজ উর্দু ভোকাবোলারি। কি বলেন?’ তবে উর্দুতে কথা বলার পক্ষেও মত দিয়েছেন কেউ কেউ। পুলিন বকশী নামের একটি ফেসবুক আইডিতে ভিডিওটি শেয়ার করে লেখা হয়েছে, ‘ইংরেজি একটি স্মার্ট ল্যাঙ্গুয়েজ। এখনকার হুজুররাও ফটাফট ইংরেজিতে নানা শব্দ বলেন। কিন্তু উর্দু! না বাবা এ ভাষা বলা যাবে না। এ ভাষায় বলে দেশটাকে পাকিস্তান বানানো যাবে না। মুরব্বি…উহু…’

কী আলাপ করছিলেন তারা?

৩৮ সেকেন্ডের ভিডিওটির বেশিরভাগ অংশজুড়েই ধর্মীয় বক্তা কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে ২০১৩ সালের ৫ মে নিয়ে আলাপ করতে দেখা যায়।

১১ বছর আগের সেই দিনটিতে কয়েকজন ব্লগারের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ ও নারী নীতির বিরোধিতাসহ ১৩ দফা দাবিতে ঢাকা অবরোধ এবং শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়েছিলেন হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীরা। কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনটির সেই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ছড়িয়েছিল দিনভর উত্তেজনা ও সহিংসতা।

আলাপচারিতায় সেই প্রসঙ্গ টেনে কাজী ইব্রাহিম বলেন, ‘৫ইমে জো কাতালে আম হুয়া ভোহা মে মজুদ থা। আখরি শাকস জো স্টেজ সে উৎরা ভো মে থা। তাব মৌলানা সাইদুর রহমান মুঝকো ওয়াহা উঠা লিয়া।’ বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, ‘৫ মে যখন গণহত্যা চলছিল তখন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। স্টেজ থেকে নামা শেষ ব্যক্তিও আমি ছিলাম। তখন মাওলানা সাইদুর রহমান আমাকে ওখান থেকে তোলেন।’

তার পরপরই মামুনুল হক ‘মগার’ বা ‘কিন্তু’ দিয়ে শুরু করে কিছু একটা বলেন যেটা ভিডিওতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে না।

সেখান থেকে কাজী ইব্রাহিম আবারও বলা শুরু করেন, ‘ভো এক বাত হ্যাঁ, মুসলমান যাব কাতিল কে সাথ হাত জোর লেতে হ্যা না তাব মুসলমান হার যাতে হ্যাঁ’ বাংলায় যেটি এমন দাঁড়ায়, ‘একটা কথা আছে যে মুসলমান যখন হত্যাকারীর সঙ্গে হাত মেলায় তখন মুসলমান হেরে যায়।’

এরপর বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সুনিয়ে জানাব, আগার হাম মওকে কা বাত কারতে হ্যাঁ তো ইস মওকে কো আগার হাম ইস্তেমাল নেহি কারে তো হাম…’

যার অর্থ দাঁড়ায়, ‘শুনুন জনাব, যদি আমি সুযোগের কথা বলি তাহলে আমরা যদি এই সুযোগের সদ্ব্যবহার না করি তবে…’এটুকু বলেই যারা ভিডিও করছে তাদের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে তিনি কিছু একটা বলতে শুরু করলে ভিডিও শেষ হয়ে যায়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ  বলেন, ‘জাস্ট এক-দুই মিনিট ওনারা হয়তো ওই ল্যাংগুয়েজে (উর্দু ভাষায়) কথা বলেছেন…সবাই ওখানে বাংলাতেই কথা বলেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা হেফাজতে ইসলামের বারিধারার মাদ্রাসায় ইফতারের দাওয়াতে গিয়েছিলাম। মাগরিবের নামাজের পর আমাদের চা খাওয়ানোর জন্য বসিয়েছে। ওখানে আলেমরা কমফোর্ট ফিল (স্বাচ্ছন্দ্য বোধ) করে যে ভাষায়, হয়তো কিছুটা কথাবার্তা বলেছে।’

এই বিএনপি নেতা বলেন, ‘মাওলানা সাহেব শাপলা চত্বরে–ওনাদের ভাষায় কতলে আম মানে গণহত্যার কথা তুলে বলছিলেন যে ওখানে উনি ছিলেন এবং উনিই সর্বশেষ ব্যক্তি ছিলেন যিনি স্টেজ থেকে নেমেছেন। এই কথাটাই উনি নিজের ভাষায় বলেছেন।’

দীর্ঘ দশ বছর ভারতে থাকার কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন জানান সেখানে এই ভাষাটি চলতো। এসময় উর্দু ও হিন্দি ভাষায় ডিপ্লোমা আছে উল্লেখ করে আরবিও কিছুটা চর্চা করা হয় বলে জানান এই বিএনপি নেতা।

এদিকে হাসনাত আব্দুল্লাহ বিবিসি বাংলাকে জানান, ইফতারের পর একটি ঘরে বসলে কেউ সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে উর্দুতে একটা কথা বলেন।

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘সালাহউদ্দিন সাহেবতো উর্দুতে অনেক পারদর্শী। তখন এটাকে উনি উর্দুতে রিপ্লাই (জবাব) দেন এবং ওখানে দুই-এক মিনিটের মতো উর্দুতে কথা হয়। ওই ক্লিপটাকেই ধরা হয়েছে, আর কিছুই না।’

প্রতিক্রিয়ার কারণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

তবে উর্দু ভাষায় কথায় বলায় এমন তীব্র প্রতিক্রিয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে বলেই মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফার।

তিনি বলেন, ‘বাংলাকে রিপ্লেস (বদল) করে যেহেতু উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, তারপরে আন্দোলন করে, জান দিয়ে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার অন্তর্ভুক্ত করতে হয়েছিল, সেটাতো আসলে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যেটা আমরা পার হয়েছি।’

সামিনা লুৎফা আরও বলেন, ‘এটা যদি উর্দু ভাষা না হয়ে ফ্রেঞ্চ ভাষা হতো তাহলে নিশ্চয়ই এত সমালোচনা হতো না। কারণ ফ্রেঞ্চ ভাষাভাষীদের সাথে আমাদের এরকম রিসেন্ট (সাম্প্রতিক) অতীতে এত বড় রাজনৈতিক ঘটনার ইতিহাস নাই।’

তিনি বলেন, ‘আমরাতো আসলে এই রাজনৈতিক ঘটনাগুলো দিয়েই নাগরিক হিসেবে নিজেদেরকে নির্মাণ করছি।’

সূত্র : বিবিসি বাংলা
  • আলাপচারিতা
  • উর্দু ভাষা
  • বিএনপি
  • হেফাজত নেতা
  • #