রামেবি ক্যাম্পাসের শত শত গাছ লুটের অভিযোগ

: যথাসময় ডেস্ক
প্রকাশ: ১ সপ্তাহ আগে

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি) ক্যাম্পাসের সিলিন্দায় ২০৫ বিঘা আয়তনের বিশাল জমিতে আমবাগান, মেহগনি বাগান ছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ছিল। গাছগুলো কেটে লুটপাটের অভিযোগ উঠছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, ক্যাম্পাসজুড়ে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার গাছ। সেখান থেকে কিছু গাছ বিক্রির জন্য নম্বর দেওয়া হয়েছিল। তবে, এখনো কোনো দরপত্র হয়নি, কাউকে কার্যাদেশও দেওয়া হয়নি। তারপরও ১০ মাস ধরে গাছ কাটা চলছিল। বিশেষ করে, গত এক মাসে বাগান ধরে ধরে ব্যাপক হারে গাছ কাটা হয়েছে। ফলে একসময় সবুজে ভরা ক্যাম্পাস এখন অনেকটাই ফাঁকা।

অভিযোগ উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশে বালু ভরাটের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব গাছ কেটে বিক্রি করেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যাখ্যা দিতে বলেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ক্যাম্পাসে বালু ভরাটের কাজ করছে ঢাকার মিরপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হোসাইন কন্সট্রাকশন প্রাইভেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানের রাজশাহীর ব্যবস্থাপক দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমরা শুধু বালু ভরাট করছি। যেদিকে গাছ কাটা হয়েছে, সেদিকে আমাদের কোনো কাজ নেই। কারা গাছ কেটেছে আমরা জানি না।

রামেবি ক্যাম্পাসের শত শত গাছ লুটের অভিযোগ

সরেজমিনে বুধবার (২০ আগস্ট) বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, অসংখ্য গাছ গোড়া থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। কাটা অংশ মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। কোথাও মাটি খুঁড়ে গাছ কেটে ফেলে রাখায় বৃষ্টির পানি জমে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ক্যাম্পাসজুড়ে এমন অগণিত গর্তে পানি জমে আছে। পূর্ব পাশে সীমানাপ্রাচীর ও ড্রেন নির্মাণের জন্য কয়েকশ গাছ আগেই কেটে ফেলা হয়েছে।

পূর্বপাশের রাস্তার ধারে শ্রমিকদের টিনের ঘর রয়েছে। সেখানে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কারা গাছ কেটেছে তারা তা জানেন না। দক্ষিণ দিকে গেলে চোখে পড়ে ডালপালা কেটে ফেলা গাছের সারি। পশ্চিম দিকে গিয়ে দেখা যায়, গাছ কেটে ফাঁকা করা জমিতে পুঁইশাকের চাষ হচ্ছে। প্রায় ১০ বিঘা জায়গার একটি বাগানে সারি সারি গাছ কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। হাঁটুসমান পানিতে পড়ে থাকা গাছগুলো এখনও সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়নি। তবে কাটা গাছগুলোতে নম্বর দেওয়া ছিল।

আবদুল মমিন নামে এক কিশোর জানায়, মাসে ১০ হাজার টাকা বেতনে সে এবং তার নানা কাজিম, নানি বিউটি বেগম ক্যাম্পাসের এই অংশটুকু দেখাশোনার কাজ করে। গাছ কারা কাটে জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে সে কথা বলতে চায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা ববিতা বেগম জানান, মাসখানেক ধরে প্রতিদিনই গাছ কাটা হচ্ছিল। ট্রলির পর ট্রলি গাছ এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই গাছ বিক্রি করছে।

ক্যাম্পাসসংলগ্ন খালের ওপারের বাসিন্দা শারমিন বেগম জানান, গত মঙ্গলবার সকালে দুই ট্রলি গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়। তার আগের দুই দিনেও চার ট্রলি গাছ সরানো হয়। তার ভাষ্য এখানেও বাগান ছিল, এখন সব ফাঁকা।

শারমিন বেগমের সঙ্গে থাকা নাসিমা খাতুন বলেন, এখানে মুটা মুটা গাছ ছিল। সব কাইট্টা সাবাড় কইরা দিল। আমরা শুধু খড়ি কুড়াইছিলাম। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকজন এসে বলে গেছে, খড়ি না নিতে, না হলে পুলিশ ধরবে।

সিলিন্দায় ক্যাম্পাসের এই অংশে হাফিজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির গরু ও ভেড়ার খামার ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জমি অধিগ্রহণের পরও তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে জায়গার দেখভালের দায়িত্বে আছেন। তিনিই কিশোর আবদুল মমিন, কাজিম ও বিউটি বেগমকে বেতন দিয়ে রেখেছেন বলে জানা যায়। গাছ কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে হাফিজুল বলেন, আমি কিছুই বলতে পারব না। ফার্ম তো অধিগ্রহণ করেছে সরকার। তারপর আমার কাজ শেষ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র দাবি করেছে, হাফিজুল এ বছর আমের মৌসুমে প্রায় ৪০ লাখ টাকার আম বিক্রি করেছেন। সাবেক ছাত্রনেতা নামমাত্র মূল্যে বাগান ইজারা নিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে গাছখেকো একটি চক্র জড়িত। ওই চক্রের সঙ্গে হাফিজুল, সাবেক ওই ছাত্রনেতা, হোসাইন কন্সট্রাকশন, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. হাসিবুল হোসেন এবং উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী নাজমুল হোসেন জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়াও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক ও পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক প্রকৌশলী সিরাজুম মুনীরসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা বিষয়টি আগেই জানতেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

রামেবি ক্যাম্পাসের শত শত গাছ লুটের অভিযোগ

অভিযোগের বিষয়ে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. হাসিবুল হোসেন বলেন, গাছ কাটার বিষয়টি অফিসিয়ালি হয়নি। আমি প্রকল্প এলাকায় যাই না, তাই আমার নাম আসার কথা নয়।

উপাচার্যের সহকারী নাজমুল হোসেনও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি কিছুই জানি না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, প্রায় ১০ মাস ধরে গাছ কাটা হচ্ছিল। মাসখানেক ধরে ব্যাপক হারে গাছ কাটা শুরু হলে এবং ট্রলিতে করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হলে বিষয়টি আলোচনায় আসে। তখন জানা যায়, গাছ কাটার কোনো দরপত্র হয়নি। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বালু ভরাটের কাজ পাওয়া হোসাইন কন্সট্রাকশনকে শোকজ করে।

সিরাজুম মুনীর গাছ কাটার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, গাছ আমাদের পক্ষ থেকে কাটা হয়নি। ঠিকাদার বেআইনিভাবে গাছ কেটেছেন। আমরা তাকে শোকজ করেছি। জবাব অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমরা যদি জড়িত হতাম, শোকজ করতাম না। আমাদের চুক্তিতে গাছ কাটার অনুমতি নেই। বিষয়টি জানার পরপরই ব্যবস্থা নিয়েছি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির রাজশাহীর ব্যবস্থাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমরা গাছ কাটিনি। আমাদের কাজের এলাকা ওইদিকে নয়। বনবিভাগের লোকজনকেও একই কথা বলেছি। শোকজের জবাবও সেভাবে দেব।

সূত্র : রাইজিংবিডি.কম

  • অভিযোগ
  • ক্যাম্পাস
  • গাছ
  • রামেবি
  • লুট
  • #