গতবছর চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ২৯২টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় ১৬৮ জন নিহত এবং ২৪৮ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা ও গণপিটুনি, সাংবাদিক নির্যাতন, সীমান্ত হত্যা ও নির্যাতন, বিচার-বহির্ভূত হত্যা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ২০২৫ সালে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধপরায়ণতা, সমাবেশকেন্দ্রিক সংঘর্ষ, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও দখলকে কেন্দ্র করে ৯১৪টি সহিংস ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৫১১ জন আহত হয়েছেন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৫৪টি নির্বাচনী সহিংসতায় ৩ জন নিহত ও ৪৯৪ জন আহত হন।
গত বছর চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ২৯২টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় ১৬৮ জন নিহত এবং ২৪৮ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সারাদেশে ৩১৮টি হামলার ঘটনায় ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। এর মধ্যে ৩ জন নিহত, ২৭৩ জন আহত, ৫৭ জন লাঞ্ছিত, ৮৩ জন হুমকির মুখে পড়েন এবং ১৭ জন সাংবাদিক গ্রেফতার হন। এছাড়া ৩৪টি মামলায় ১০৭ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
আরো উল্লেখ করা হয়, সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় ২৭টি মামলায় ২৪ জন গ্রেফতার ও ৫৪ জন অভিযুক্ত হয়েছেন। পাশাপাশি ৪৭টি সভা-সমাবেশে বাধা, ১৪৪ ধারা জারি ও সংঘর্ষে ৫১২ জন আহত ও ৩৬ জন গ্রেফতার হন।
বিচার বহির্ভূত হত্যা, থানা ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ৪০ জন নিহত হন। পুলিশের ভয়ে পালাতে গিয়ে বা অসুস্থ হয়ে আরো ১০ জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া কারা হেফাজতে ৯২ জন (৩০ জন কয়েদী ও ৬২ জন হাজতি) অসুস্থতা, আত্মহত্যা ও নির্যাতনে মারা গেছেন।
২০২৫ সালে ২ হাজার ৪৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে ৮২৮ জন ধর্ষণের শিকার, যাদের ৪৭৪ জন শিশু। ১৭৯ জন গণধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর ২৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনার জেরে ১০ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। এ ছাড়া ৪১৪ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হন, যৌতুক নির্যাতনে নিহত ৩৫ জন এবং পারিবারিক সহিংসতায় ৩৮৩ জন নিহত হন। শিশু নির্যাতনের শিকার ১ হাজার ৩৭১ জন, যার মধ্যে ২৮৮ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ৩০ জন নিহত, পিটিয়ে হত্যা ২ জন, আহত ৩৯ জন ও গ্রেফতার ৬৩ জন। এ ছাড়া ৩৪৯৩ জনকে পুশইন এবং বঙ্গোপসাগর থেকে ১৪৩ জন জেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির গুলিতে ২ জন আহত, স্থলমাইন বিস্ফোরণে ১ জন নিহত ও ১২ জন আহত হন। ২১টি ট্রলারসহ ১৭৬ জন জেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ৯৬ জন নিহত ও ১০২১ জন আহত হন। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ১৬৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আইনের শাসন ও গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। মব সহিংসতা, হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যাবে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন ইজাজুল ইসলাম। সেইসঙ্গে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ করেছেন।