পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্ম জনগণের রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর ২০২৫ সালের বার্ষিক রিপোর্ট’ প্রকাশ করেছে। জেএসএসের সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা সই করা এই রিপোর্ট বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) প্রকাশ করা হয়।
রিপোর্টে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক সংবিধানসহ চলমান সংস্কার কার্যক্রমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত জুলাই সনদেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিষয়ে কোনও উল্লেখ নেই। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি গভীর বৈষম্যের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে বলে দাবি করা হয়।
রিপোর্টে আরও বলা হয়, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কোনও অগ্রগতি হয়নি। ফলে চুক্তির মৌলিক বিষয়সহ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে।
চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় ২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, ২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সেনা-মদদপুষ্ট সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠী, রোহিঙ্গা সশস্ত্র জঙ্গি, মুসলিম বাঙালি সেটেলার ও ভূমিদস্যুদের দ্বারা মোট ২৬৮টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৬০৬ জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন।
২০২৫ সালে সংঘটিত ২৬৮টি ঘটনার মধ্যে নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা ১৬৩টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় ২২৪ জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন। রিপোর্টে দাবি করা হয়, পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতো অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচার-বহির্ভূত হত্যার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এক মারমা ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর গুলিতে তিনজন জুম্ম নিহত হন। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে ৮ জন জুম্ম হত্যার শিকার হয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনও মামলা দায়ের হয়নি এবং কাউকে বিচারের আওতায় আনা হয়নি বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
রিপোর্ট অনুযায়ী, অস্ত্র গুঁজে দেওয়া, মিথ্যা মামলা এবং সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগে নিরীহ জুম্মদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশের হাতে ১১৭ জন জুম্ম গ্রেফতার হন। এর মধ্যে ৪৭ জনকে সাময়িক আটক রেখে নির্যাতনের পর ছেড়ে দেওয়া হয় এবং বাকি ৭০ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়। একই সময়ে সেনাবাহিনী ও বিজিবি কমপক্ষে ১৯৩টি জুম্ম অধ্যুষিত গ্রামে তল্লাশি অভিযান চালায়। এসব অভিযানে অন্তত ৬৫ জন জুম্মকে মারধর, হুমকি ও আহত করা হয়। দুটি বৌদ্ধ মন্দিরসহ ৪৩টি বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে জিনিসপত্র তছনছ করা হয়।
২০২৫ সালে নিরাপত্তা বাহিনী ও মুসলিম বাঙালি সেটেলারের দ্বারা জুম্ম নারী ও শিশুর ওপর ২৬টি সহিংস ঘটনা সংঘটিত হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। এতে ৩২ জন জুম্ম নারী ও শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, যৌন হয়রানি ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
রিপোর্টে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ ও দেশের আদিবাসী জনগণের ওপর ব্যাপক আকারে দুটি নৃশংস সাম্প্রদায়িক হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। খাগড়াছড়ি জেলা সদরের সিঙ্গিনালা এলাকায় এক জুম্ম কিশোরীকে সেটেলার বাঙালি কর্তৃক গণধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর ইন্ধনে ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর বাঙালি মুসলিম সেটেলাররা জুম্মদের ওপর নৃশংস হামলা ও অগ্নিসংযোগ চালায় বলে অভিযোগ করা হয়। এতে খাগড়াছড়ির গুইমারা রামসু বাজার ও আশপাশের জুম্ম বসতিতে সেনাবাহিনী ও বাঙালি সেটেলারদের সম্মিলিত হামলায় তিনজন জুম্ম নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত হন। এ ছাড়া রামসু বাজারে জুম্মদের ৫৪টি দোকান, ২৬টি ঘরবাড়ি ও ১৬টি মোটরসাইকেল অগ্নিসংযোগে ভস্মীভূত হয়।
রিপোর্টে বলা হয়, জুম্মদের ওপর ওই সাম্প্রদায়িক হামলা এবং সেনাবাহিনীর গুলিতে তিনজন নিহত হলেও উল্টো পুলিশ বাদী হয়ে সহিংসতা ও ভাঙচুরের অভিযোগে জুম্মদের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করে।
এছাড়া বান্দরবান জেলার লামা, আলিকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও বান্দরবান সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় বহিরাগত কোম্পানি এবং সরকারি-বেসরকারি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উদ্যোগে রাবার বাগান, হর্টিকালচার ও পর্যটন কেন্দ্রের নামে জুম্মদের শ্মশান, বৌদ্ধ বিহার, জুম ভূমি ও বসতভূমি বেদখল, উচ্ছেদ, মিথ্যা মামলা, হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ করা হয়। ২০২৫ সালে সংঘটিত ২৬৮টি ঘটনার মধ্যে মুসলিম বাঙালি সেটেলার ও ভূমিদস্যুদের দ্বারা ৪১টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এতে ৩০ জন ম্রো শিশুকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরসহ ২২৮ জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন এবং কমপক্ষে ৩০০ একর ভূমি বেদখল হয়েছে বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়।
রিপোর্টে আরও বলা হয়, বান্দরবানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। অনুপ্রবেশের সময় পুলিশ মাত্র ৬৭ জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালে রোহিঙ্গা সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন আরসা-আসো নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম এলাকা থেকে তিনজন তঞ্চঙ্গ্যা গ্রামবাসীকে অপহরণের পর হত্যা করেছে।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের সময় অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে জুম্ম জনগণের প্রতি ঐতিহাসিক অন্যায়-অবিচার শুরু হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরও পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার পাকিস্তানের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে বাংলাদেশের একের পর এক সরকার জুম্ম জনগণের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভূমি বেদখল, উচ্ছেদ ও ধর্মান্তরের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘন চালিয়ে যাচ্ছে বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়।