দেশে মাধ্যমিক শিক্ষায় বেহাল দশা

: যথাসময় ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ ঘন্টা আগে

বিগত কয়েক দশকে দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। নেওয়া হয়েছে নানা প্রকল্প। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদন বলেছে, শিক্ষা খাতে বাংলাদেশ এখনো আশানুরূপ অগ্রগতি করতে পারেনি। বিশেষত শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে মাধ্যমিক স্তর সব সূচকে সবচেয়ে পিছিয়ে। মাধ্যমিক শিক্ষার এ চিত্র উঠে এসেছে ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’-এ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) যৌথ এ জরিপ গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত হয়।

জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে গড় উপস্থিতির হার ৮৪ দশমিক ৩ শতাংশ ও তাদের ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশই এ স্তর সম্পন্ন করতে পারে। তবে মাধ্যমিক স্তরে এ হার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কম। জরিপ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন মাধ্যমিকের (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি) শিক্ষার্থীদের ক্লাসে গড় উপস্থিতির হার ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং এ স্তর সম্পন্ন করতে পারে ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ এ স্তর সম্পন্ন করতে পারে না ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের গড় উপস্থিতির হার সবচেয়ে কম মাধ্যমিক স্তর তথা নবম-দশম শ্রেণিতে, যা মাত্র ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ। এ স্তর সম্পন্ন করতে পারে মাত্র ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ এ স্তর সম্পন্ন করতে পারে না ৫৬ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থী।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং শিক্ষার উচ্চব্যয়ের কারণে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘শিক্ষার যে বিষয়গুলোতে প্রকৃতপক্ষে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, বিগত সরকারের সময় সেগুলোতে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন প্রকল্প নিলেও সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল। এসব প্রকল্পে ছিল স্বচ্ছতার অভাব।’

তিনি আরো বলেন, ‘মাধ্যমিক শিক্ষায় সবচেয়ে বড় সমস্যা পর্যাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান না থাকা এবং উচ্চব্যয়। এ সমস্যা দূরীকরণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ সরকার নেয়নি। প্রাথমিকে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের খুব বেশি দূরত্ব পাড়ি দিয়ে পড়ালেখা করতে হয় না। একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সরকারি প্রতিষ্ঠান থাকায় এ স্তরে শিক্ষা ব্যয়ও কম। কিন্তু মাধ্যমিক স্তরে চিত্রটা আলাদা। অনেক শিক্ষার্থীকে বেশ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে পড়তে যেতে হয়। এক্ষেত্রে নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা এবং যাতায়াত ব্যয়ের প্রশ্ন আছে। বিশেষত সমতলের চেয়ে পাহাড়, হাওর ও চরাঞ্চলে এ চ্যালেঞ্জ বেশি। এছাড়া বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি হওয়ায় মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা ব্যয় বেশি, যা অনেক পরিবার বহন করতে পারে না। দরিদ্র পরিবারগুলো অনেক সময় আর্থিক অস্বচ্ছতার কারণে সন্তানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না পাঠিয়ে কাজে যুক্ত করে দেয়। আবার মেয়েদের ক্ষেত্রে অনেকের বিয়ে হয়ে যায়। এসব কারণে এ স্তরে শিক্ষার্থী উপস্থিতি ও শিক্ষা স্তর সম্পন্নের হার কম।’

জরিপের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উপস্থিতির ক্ষেত্রে বিভাগ হিসেবে সবচেয়ে পিছিয়ে ময়মনসিংহ। আর নবম-দশম শ্রেণিতে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে সিলেট। ময়মনসিংহ বিভাগে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার ৫২ দশমিক ২ আর নবম-দশম শ্রেণিতে উপস্থিতির হার ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ। সিলেট বিভাগে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার ৫৪ দশমিক ৬ আর নবম-দশম শ্রেণিতে উপস্থিতির হার ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

মাধ্যমিক স্তর সম্পন্ন করার ক্ষেত্রেও সবচেয়ে পিছিয়ে সিলেট। মাত্র ৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থী দশম শ্রেণি বা মাধ্যমিক স্তর সম্পন্ন করতে পারে। এক্ষেত্রে সিলেটের পরেই আছে চট্টগ্রাম বিভাগ। এ বিভাগে ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক স্তর সম্পন্ন করে। ময়মনসিংহ আছে তৃতীয় অবস্থানে। এ বিভাগের ৪১ দশমিক ২ শতাংশ এ স্তর সম্পন্ন করে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যেসব বিভাগে শিক্ষার্থীদের গড় উপস্থিতির হার বেশি সেসব বিভাগে সংশ্লিষ্ট স্তর সম্পন্নকারীর হারও বেশি। এক্ষেত্রে তুলনামূলক এগিয়ে রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল। রাজশাহীতে দশম শ্রেণিতে উপস্থিতির হার ৫৩ দশমিক ৮ আর দশম শ্রেণি সম্পন্নকারীর হার ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ। খুলনায় দশম শ্রেণিতে উপস্থিতির হার ৪৭ দশমিক ৩ ও সম্পন্নের হার ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ। বরিশালে দশম শ্রেণিতে উপস্থিতির হার ৫৮ দশমিক ১ ও সম্পন্নকারীর হার ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ।

গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতের যে বিষয়টি আছে সেখানে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। বিশেষত আমাদের দেশে শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পার্থক্য আছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে অভিভাবক যত বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারবেন, তার সন্তান তত মানসম্মত শিক্ষা পাবে। শিক্ষায় এ বৈষম্য দূর করা জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নানা খাত সংস্কারে কমিশন গঠন করেছিল, কিন্তু শিক্ষা খাত সংস্কারে তারা কোনো কমিশন করেনি। পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি করে পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এ কমিটি দুটি প্রতিবেদন দেয়ার পরও তা যথাযথভাবে কার্যকর করা হয়নি। সরকারের উচিত ছিল শিক্ষা ও সমতানির্ভর শিক্ষাকে আরো গুরুত্ব দেয়া। অন্তত নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করা যেত, যা তারা করেনি। এটি করা হলে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হতো। এছাড়া সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সব নাগরিকের জন্য মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, কিন্তু শিক্ষাকে নাগরিক অধিকার হিসেবে স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।’

রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে রাশেদা কে চৌধুরীর প্রত্যাশা, যারাই নির্বাচিত হোক তারা যেন শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে সর্বজনীন, মানসম্মত ও জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করে। অন্তত প্রথম ধাপেই শিক্ষায় বাজেট বৃদ্ধি এবং অন্তত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করা। তার মতে, শিক্ষাকে গুরুত্ব না দিলে রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২১ হাজার ২৩২। এর মধ্যে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত আপগ্রেডেড ৬০১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ মোট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১ হাজার ২৯৫টি। আর বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৯ হাজার ৯৩৭টি। অর্থাৎ মোট বিদ্যালয়ের মাত্র ৬ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ সরকারি।

মাধ্যমিক স্তরে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯০ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২ জন। এর মধ্যে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত আপগ্রেডেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে ৬ লাখ ২৬ হাজার ৯৭০ জন আর বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে ৮৪ লাখ ৩৬ হাজার ৪৫২ জন। মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ৬ দশমিক ৯১ শতাংশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। অন্যদিকে প্রাথমিক স্তরে মোট বিদ্যালয়ের প্রায় ৪৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ সরকারি বিদ্যালয়। আর প্রাথমিক স্তরে সরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়ছে ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পরিচালক (মাধ্যমিক শাখা) প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে আমরা কাজ করছি। অন্তত ৭৫ শতাংশ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। শিক্ষার্থী যদি কম উপস্থিত থাকে, তবে তার উপস্থিতি বৃদ্ধির জন্য শিক্ষকরা চেষ্টা করেন। আর যারা নিয়মিত উপস্থিত থাকে তাদের আরো উৎসাহ দেয়া হয়, যাতে তারা এ ধারা অব্যাহত রাখে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে সেগুলো আমরাও লক্ষ করেছি। এসব সমস্যা কীভাবে দূর করা যায়, এ বিষয়ে মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় কাজ করছে।’

মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত ১০ সদস্যের পরামর্শক কমিটিতে সভাপতি হিসেবে আছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ। তিনি বলেন, ‘দেশে মাধ্যমিক স্তরে ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষা ব্যয় পরিবার বহন করে। এ স্তরে ঝরে পড়া ঠেকাতে হলে বাস্তব অর্থে ব্যয়মুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় বিশেষ সহায়তা দিতে হবে। শুধু উপবৃত্তি দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমন করা দরকার যাতে কেউ বৈষম্যের শিকার না হয়। চলতি মাসেই আমাদের সুপারিশ জমা দেব। সেখানে এ সম্পর্কিত কিছু বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’

  • মাধ্যমিক
  • শিক্ষা
  • #