ছবি : সংগৃহীত
গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন ও পুরস্কার ঘোষণা করার পরও পুলিশের লুট হওয়া বৈধ অস্ত্রের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ উদ্ধার হচ্ছে না। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই এসব লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি আন্ডারওয়ার্ল্ডে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রও এখন সহজলভ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে নির্বাচনের আগেই শুরু হয়েছে খুনোখুনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে ১৫৯ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪১ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে। এছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ১৬, রাজশাহী বিভাগ থেকে ২৪ এবং খুলনা বিভাগ থেকে ২১ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ডিসেম্বরে ৩৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। চলতি মাসের অর্থাৎ জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আরও ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এগুলো পুলিশের কাছ থেকে লুট করা অস্ত্র কি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেনি পুলিশ সদর দপ্তর। এসব অস্ত্রের কোনোটিই সাধারণ মানুষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সদরদপ্তর সূত্র বলছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রও যুক্ত হয়েছে। এটাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব পড়েছে। এ কারণে গত বছরের আগস্টে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র সম্পর্কে তথ্য পেতে পুরস্কার ঘোষণা করে সরকার। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা তখন জানান, লাইট মেশিনগান (এলএমজি) উদ্ধারে তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। একটি সাব-মেশিনগান (এসএমজি) উদ্ধারে তথ্য দিলে দেড় লাখ টাকা, চায়নিজ রাইফেলের জন্য ১ লাখ টাকা, পিস্তল বা শটগানের জন্য ৫০ হাজার টাকা এবং প্রতিটি গুলির জন্য ৫০০ টাকা করে পুরস্কার দেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এই ঘোষণার সময় পুলিশের হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রের সংখ্যা ছিল ১,৩৭৫টি এবং গোলাবারুদ ছিল ২,৫৭,৮৪৯টি। পুরস্কার ঘোষণার পর থেকে গত বছরের নভেম্বর মাস পর্যন্ত মাত্র ৩৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১৯০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ১,৩৪০টি অস্ত্র এবং ২,৫৭,৬৫৯ রাউন্ডেরও বেশি গুলি কোথায় তা অজানা। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে রাইফেল, সাব-মেশিনগান (এসএমজি), হালকা মেশিনগান (এলএমজি), বিভিন্ন ক্যালিবারের পিস্তল, শটগান, গ্যাসগান এবং টিয়ারগ্যাস লাঞ্চার রয়েছে।
এদিকে নির্বাচনী তপসিল ঘোষণার পর গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর মতিঝিলে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার পর সারাদেশে আন্ডারওয়ার্ল্ডে অবৈধ অস্ত্রের মজুদ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ভাবিয়ে তোলে। ৭ জানুয়ারি ফার্মগেটের তেজতুরী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মোসাব্বিরকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এর পাশাপাশি যশোর, চট্টগ্রাম, খুলনা, গাজীপুর, নারায়াণগঞ্জ, কুমিল্লা, বগুড়া, পাবনাসহ ২০ জেলায় গত ১৪ মাসে প্রতিপক্ষের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে।
ইতোমধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতা নির্বাচনকালীন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে রিপোর্ট দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। গত নভেম্বরে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত মাসের চেয়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। ডিসেম্বরের শুরু থেকে এ ধরনের হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনার সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী।
আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা একটি চরম ও ধারাবাহিক রূপ ধারণ করেছে, যা ২০২৫ সালে আরও বিস্তৃত ও সহিংসতর হয়ে ওঠে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ জন আহত এবং ১০২ জন নিহত হয়েছেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকগণ বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিপুল সংখ্যক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে। ফলে সহিংসতা, রাজনৈতিক ভীতিপ্রদর্শন এবং অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘একটি সুষ্ঠু নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত হতে না পারে সেজন্য অপরাধীগোষ্ঠী অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির জন্য এসব আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।
তবে চব্বিশের অভ্যুত্থানে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, ‘থানা থেকে লুট হওয়া কিছু অস্ত্র আছে সেগুলো এখনো উদ্ধার করা যায়নি। সেগুলো হয়ত খাল-বিল-নদীতে ফেলে দিয়েছে। এজন্য উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে পুলিশের লুট হওয়া এই অস্ত্র নির্বাচনকালে ব্যবহার করতে পারবে না এ প্রতিশ্রুতি আমি আপনাদের দিতে পারি।’