মা জেলে, আদালত প্রাঙ্গণে দেড় বছরের শিশুর অপেক্ষা!

: যথাসময় ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ সপ্তাহ আগে

ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণের একটি দেয়ালের পাশে বসে ছিলেন ধামরাই থেকে আসা সরলা বিশ্বাস। পাশের দেয়ালের ওপর তার ব্যাগটি রাখা, সেখানে কাপড়-চোপড় আর খাবার। আর কোলে দেড় বছেরের এক শিশু।

মাঝে মাঝেই কেঁদে উঠছিল শিশুটি। কখনো আবার কোল থেকে নেমে খেলছিল। আবার কখনো ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ছিল। রোববার দিনভর এভাবেই কাটল তাদের।

সরলা জানালেন, বাচ্চাটি তার বোন তপসা বিশ্বাসের ছেলে। তার বোনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে এসেছে। জামিনের আশায় তারা আদালত প্রাঙ্গণে বসে আছেন।

খোঁজ করতে গিয়ে জানা গেল, কালিয়াকৈর থানার একটি চুরির মামলায় দণ্ডিত আসামিকে ধরতে ধামরাই থানা এলাকায় অভিযানে গিয়ে শুক্রবার হামলার শিকার হয় পুলিশ। ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় দুই নারীসহ চারজনকে। পুলিশের কাজে বাধা ও মারধরের অভিযোগে মামলা হয় তাদের বিরুদ্ধে।

তপসা বিশ্বাস তাদেরেই একজন। তাকে গ্রেপ্তারের পর তার ছেলের স্থান হয়েছে খালার কোলে। তবে মায়ের জন্য কান্নাকাটি করছে সে। তাকে বাড়িতে একা রেখে আসার উপায় নেই। বাধ্য হয়ে তাকে নিয়েই আদালতে এসেছেন সরলা।

শনিবার তপসা বিশ্বাস, কিরণ মালা, বাদল চন্দ্র সরকার ও দুলাল চন্দ্র সরকারকে ওই মামলায় আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। আসামিপক্ষ থেকে রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিন আবেদন করা হয়।

ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম সোহাগ দুই নারীর রিমান্ড ও জামিন আবেদন নাকচ করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। অপর দুই আসামিকে একদিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ হয়েছে বলে প্রসিকিউশন পুলিশের এএসআই মো. কাইয়ুম হোসেন জানিয়েছেন।

দুদিন মাকে ছাড়া থাকে শিশুটিকে নিয়ে রোববার সকালে আদালতে হাজির হন খালা সরলা বিশ্বাস। দেড় বছরের ঘুমন্ত শিশুটিকে ঘুম থেকে তুলে সকালে বাসে ওঠেন। আদালতপাড়ায় পৌঁছান ১১টার কিছু সময় পর।

আইনজীবী তাদের দেখা করতে বলেছিলেন। বোনোর জামিনের জন্য তার সন্তানকে নিয়েই আদালতে আসেন সরলা। রোববার নতুন করে কোনো জামিন শুনানি হয়নি। অপেক্ষাতেই তাদের দিন কেটে যায়।

বিকাল ৫টার দিকে সেখানেই সরলা জানান, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে তার বোনসহ চারজনকে পুলিশ ধরে নিয়ে আসে। বাচ্চাটাকে দেখার মতো কেউ নাই। আমার কাছে রাখছি। মায়ের জন্য কান্নাকাটি করে। মাকে ছাড়া কি দেড় বছরের বাচ্চা রাখা যায়? কি যে একটা ঝামেলায় আছি। ও মায়ের বুকের দুধ খায়। এখন আজেবাজে খাবার খায়িয়ে রেখেছি। রাতে ঘুমায় না। বিরক্ত করে অনেক।

শিশুটিকে কী কারণে আদালতে নিয়ে এসেছেন জানতে চাইলে সরলা বলেন, শুনছি ওর মায়ের আবার জামিন আবেদন হবে। বাচ্চাটাকে দেখে যদি আদালতের দয়া হয়, এজন্য নিয়ে আসছি।

তপসার স্বামী হরিলাল বিশ্বাসের এক ভাগ্নেও আদালতে এসেছিলেন। আইনজীবীর কাছে দৌড়াদৌড়ি করছিলেন তিনি। সন্ধ্যার পর মামলার কিছু কাগজপত্র নিয়ে আদালত প্রাঙ্গণ ছাড়েন তারা।

তপসার আইনজীবী মো. ইরশাদুল হক বলেন, তপসার একটা বাচ্চা আছে, কিন্তু কাস্টডি দেওয়া হয়নি। পুলিশ বাচ্চাটাকে নিয়ে আসেনি। আদালত রিমান্ড নামঞ্জুর করেছে। কাল (সোমবার) আদালতে গিয়ে জামিন আবেদন করব, না বাচ্চাটাকে মায়ের কাছে পাঠাব, সেই সিদ্ধান্ত নেব।

মামলার বাদী ধামরাই থানার এসআই সুবোধ চন্দ্র বর্মন বলেন, গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানার একটি চুরির মামলায় বাবুল আক্তার নামে এক আসামির সাজা হয়। বাবুল ধামরাই থানার বাইশাকান্দা ইউনিয়নের বেরশ গ্রামে হরিলাল বিশ্বাসের বাড়িতে অবস্থান করছে খবর পেয়ে তারা সেখানে অভিযানে যান। কিন্তু হরিলালের লোকজন আমাদের ওপর হামলা করে। তাদের সাথে মহিলারাও ছিল। শুক্রবার ছিল স্বরস্বতী পূজা। ওই বাড়িতে অনেক লোকজন ছিল।

তিনি আরও বলেন, হরিলাল আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। সে ভেবেছিল তাকে ধরতে গেছি। এ কারণে তার নেতৃত্বে আমাদের ওপর হামলা করে। তার স্ত্রী তপসা ও ছেলে সৌরভ বিশ্বাস সবচেয়ে বেশি হামলা চালায়। এ কারণে মামলা করেছি। তবে সেখানে গিয়ে বাবুলকে পাওয়া যায়নি বলে জানান সুবোধ চন্দ্র বর্মন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ধামরাই থানার এসআই এস এম নায়েবুল ইসলাম বলেন, পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে। বিষয়টা আমরা দেখছি। তপসার বাচ্চার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার ছোট একটা বাচ্চা আছে। বাচ্চা ছাড়াই আসছে।

সুবোধ চন্দ্র বর্মন মামলায় অভিযোগ করেছেন, বাবুলকে গ্রেপ্তারের জন্য হরিলাল বিশ্বাসের বাড়িতে গেলে আগে থেকে সেখানে গোপন বৈঠকে অংশগ্রহণ করা নিষিদ্ধ সংগঠনের ২৫-৩০ জন সদস্য হাতে লাঠি-সোঁটা, লোহার রডসহ দেশীয় অস্ত্র সজ্জিত হয়ে পুলিশ সদস্যদের কাজে বাধা দেয়। তাদের উপর আক্রমণ করে। তাদের আটকে রাখে। তাদের উপর আক্রমণে সুবোধ চন্দ্র বর্মন, তার তিন এএসআই ও এক কনস্টেবল আহত হয়। পরে থানা থেকে ফোর্স গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। তপসা বিশ্বাসের স্বামী হরিলাল বিশ্বাস এবং ছেলে সৌরভ বিশ্বাসও এ মামলার আসামি।

  • আদালত প্রাঙ্গণে দেড় বছরের শিশুর অপেক্ষা!
  • মা জেলে
  • #