ছবি : বীরেন মুখার্জী
একটি জাতির নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ হলো তার ভাষা। ভাষার প্রবহমানতা সেই ভাষাটিকে টিকিয়ে রাখে। বাংলা ভাষা গণমানুষের মুখের ভাষা অর্থাৎ মাঠে-ঘাটে, অফিস-আদারত, পাড়া-মহল্লা সর্বত্রই এই ভাষার প্রচলন। ভাষাবিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী, ভাষার পরিবর্তন, রূপান্তর ও অপব্যবহার ঘটলে ভাষার প্রবহমানতা বাধাগ্রস্ত হয়। ভাষা বিকৃত কিংবা রূপান্তর হতে থাকলে উদ্দিষ্ট ভাষাটি একসময় দুর্বল হয়ে বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যায়। বিশ্বে বহু ভাষা-বিকৃতি ও রূপান্তরের মাধ্যমে ভাষার বিলুপ্তি ঘটেছে, এমন উদাহরণও পাওয়া যাবে।
বাংলাভাষার দূষণ-মিশ্রণ-বিকৃতি-প্রবমানতা-রূপান্তর নিয়ে আশঙ্কার শেষ নেই। ‘বাংলা ভাষা বিপদগ্রস্ত’ এমন উদ্বেগ বেশ আগে থেকেই চলে আসছে। একসময় সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘বাঙালি ভদ্রলোক সন্তানরা পরস্পর কথা বলে ইংরেজিতে, চিঠিপত্র লেখে ইংরেজিতে, এবং হয়তো সেদিন বেশি দূরে নয়, যখন লোকে দুর্গাপূজার আমন্ত্রণপত্রও ইংরেজিতে লিখবে।’ একসময় ঔপনিবেশিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষার প্রবল প্রতাপ ছিল। বাংলা ভাষাভাষী দেশীয় অভিজাত শ্রেণি সে প্রতাপ মেনে নিয়েছিলেন। মেনে না নিয়ে উপায়ও ছিল না তখন। কিন্তু এখন আমরা জাতি হিসেবে স্বাধীন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীও অতিক্রম করেছি। আমাদের মাতৃভাষা, রাষ্ট্রীয়ভাষা বাংলা। রাষ্ট্রের সর্বত্র বাংলাভাষার প্রচলন নিয়েও নানা সময়ে কথা হয়েছে, নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। এছাড়া, একমাত্র বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য লড়াই-আন্দোলন হয়েছে। বিশ্বে যা বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ ঘটনা আমাদের জন্য গর্বের। সুতরাং রক্তের বিনিময়ে যে মার্যার মর্যাদা রক্ষা করেছেন বাংলার জনগন, সেই ভাষা দূষণ-বিকৃতির শিকার হলে তার মতো লজ্জাজনক পরিস্থিতি আর কি হতে পারে।
ভাষা নিয়ে গভীর অভিনিবেশ করলে প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে ভাষা দুষণ ও বিকৃতির শিকার হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। ক্ষেত্র তিনটি হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যম মাধ্যম এবং ব্যক্তিগত আলাপচারিতা। একটু কান খোলা রাখলেই ভাষা বিৃতির বিষয়টি ধরা পড়ে। এটা ঠিক যে, গণমাধ্যমের নিজস্ব ভাষারীতি থাকে। তবে তা প্রমিত বাংলাকে পাশ কাটিয়ে হতে পারে না। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় আমাদের গণমাধ্যম এখন যথেষ্ট সমৃদ্ধ। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ধারায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে গণমাধ্যমের সংখ্যা। বেতার শিল্পেও নতুন ধারা যুক্ত করেছে প্রাইভেট এফএম রেডিও চ্যানেলগুলো। এসব রেডিওর উপস্থাপকগণ (তাদের ভাষায় রেডিও জকি বা সংক্ষেপে আরজে) শ্রোতাদের মনোরঞ্জনের জন্য বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ও বাংলাকে ইংরেজির মতো করে ‘বাংলিশ’ ভাষায় কথাবার্তা বলেন অনেক সময়। নতুন প্রজন্ম নিজেদের স্মার্ট প্রমাণের জন্য এগুলো অন্ধভাবে অনুকরণ করে। এসব তরুণরা আড্ডায়, এমনকি সাধারণ কথাবার্তায়ও ‘আবার জিগায়’, ‘এক্সট্রা খাতির’, ‘তোর বেইল নাই’, ‘খাইলেই দিলখোশ’ ইত্যাদি শব্দবন্ধ উচ্চারণ করে। আবার নাটকের নামেও দেখা যায় ‘লাভ ডটকম’, ‘বাংলা টিচার’, ইত্যাদি। ‘ভাল্লাগছে ভাইয়া’, ‘খাইয়াম’, ‘খাইতে মুঞ্চায়’-এগুলো কোন ধরনের ভাষা! ভাষা বিকৃতির নতুন ক্ষেত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক। ব্যবহারকারীরা কী লিখছে, তা বোধকরি নিজেরাও ঠিকমতো বুঝতে পারে না। এরূপ মিশ্রণকে অনেকে ‘বাংলিশ’ আখ্যা দেন। এভাবে ভাষাবিকৃতি বাড়ছে। মূলত তরুণ প্রজন্মের অনেকে যে ভাষা প্রয়োগ করছে তা আঞ্চলিকও নয়, প্রমিতও নয়। এটাকে ‘জগাখিচুড়ি’ ভাষা বলা যেতে পারে। ভাষার আঞ্চলিকতায় সমস্যা হওয়ার কথা নয়, কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে, প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রমিত বা শুদ্ধরূপ বজায় থাকা সঙ্গত নয় কি? একজন তরুণ যখন কোনো রিকশাওয়ালা বা দোকানদারকে ‘মাম্মা’ সম্বোধন করে তখন তা অত্যন্ত লজ্জার কারণ হয়ে ওঠে বৈকি।
ভাষা রক্ষায় আত্মত্যাগ করে বিশ্বে মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করা একটি জাতির নিজস্ব ভাষার এমনতর অপপ্রয়োগ শুধু লজ্জার নয়, অপরাধও। আমরা স্বাধীন, তাহলে উপনিবেশিত মন কেন থাকবে আমাদের। বিদেশি ভাষা-সংস্কৃতির আগ্রাসন থাকে, আমাদেরও আছে। প্রয়োজনে বিদেশি ভাষা প্রয়োগ-ব্যবহারও দোষের নয়। বিদেশি ভাষা শিক্ষার ব্যাপারে বিরোধও নেই। কিন্তু তা শুদ্ধরূপে হওয়া বাঞ্ছনীয়। ভাষাপ্রশ্নে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য অনেক। ফলে বাংলা ভাষা ব্যবহার করে যে কাজটি করা যায়, তা নিখুঁতভাবেই প্রমিত বাংলা ভাষা দিয়ে সম্পন্ন করা যৌক্তিক। মানুষ অনেক সময় প্রমিত ভাষার জন্য বাংলা একাডেমির ওপর আস্থা রাখে। কিন্তু বাংলা একাডেমির নানান পরিপত্র, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন নামি প্রতিষ্ঠানের অফিসের চিঠিতেও বানান ভুলের প্রাচুর্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল হতে দেখা গেছে। বাস্তবতা হলো, ট্রলকারীদের ভাষাও প্রমিত ভাষা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। সুতরাং মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, সত্যিকার অর্থেই বাংলা ভাষার দুর্দিন চলছে।
অধ্যাপক ও সাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘ভাষা দূষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী’ শীর্ষক নিবন্ধে ‘বাংলা ভাষা যে সত্যি সত্যি একটি মিশ্র ভাষা হয়ে যাচ্ছে এবং এর নানা স্থানচ্যুতি ঘটছে’ তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। তৎকালীন হাইকোর্টের বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ২০১২ সালের ওই লেখাটি আমলে নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বেশ কয়েকদফা নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে রেডিও ও টেলিভিশনে ‘বিকৃত উচ্চারণে’ এবং ‘ভাষা ব্যঙ্গ’ করে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার না করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া বাংলা ভাষার দূষণ, বিকৃত উচ্চারণ, ভিন্ন ভাষার সুরে বাংলা কথন, সঠিক শব্দ চয়ন না করা এবং বাংলা ভাষার অবক্ষয় রোধে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। ওই কমিটি ৯ দফা সুপারিশও পেশ করে। কিন্তু বিশেষজ্ঞ কমিটির ওই সুপারিশ কোথায় কী অবস্থায় আছে তা জানার সুযোগ আমাদের সীমিত। গণমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে দেখেছিলাম, বিশেষজ্ঞ কমিটির ওই সুপারিশ হাইকোর্টে ফাইলবন্দি অবস্থায় আছে। হাইকোর্টের যে বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত আদেশ দিয়েছিলেন, সেই বেঞ্চ বিলুপ্ত হওয়ায় ওই সুয়োমোটো মামলাটির আর শুনানি হচ্ছে না। অপরদিকে এক রিটে ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেট ও বিভিন্ন দপ্তরের নামফলকে বাংলা ব্যবহার করতে বলা হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৪ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্টের বোর্ডগুলোকে আদেশটি কার্যকর করতে বলে। কিন্তু এর পর আর দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। আদালত যেকোনো বিষয়ে নির্দেশনা দিতে পারেন। আর নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব তো রাষ্ট্রপরিচালকদের ওপরই বর্তায়।
‘ভাষার বিকৃতি ও দূষণ চলছে বহুদিন ধরে। এটি চলতে থাকবে যতদিন ভাষা বিপ্লব না হয়। এর মূল কারণ ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ শাসন করছি, নিজ ভাষা অবহেলিত হচ্ছে। বিষয়কে একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা না করা পর্যন্ত দূষণ বিকৃতি চলতেই থাকবে। আর সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন সম্ভব। ইউরোপের দেশ-চীন-জাপানের দিকে খেয়াল করুন, তারা পেরেছে। চীন-জাপানের ভাষা প্রাগৈতিহাসিক চিত্রলিপির বর্ণমালা। ওই বর্ণমালা দিয়ে যদি আণবিকশক্তি গবেষণা, মহাকাশ গবেষণা সম্ভব হয়, আমরা কেন পারব না? এর জন্য সদিচ্ছা দরকার। শাসনযন্ত্র, শিক্ষিত-সুধীসমাজ যতক্ষণ মাতৃভাষা গ্রহণ না করবে, মাতৃভাষাকে প্রাধান্য না দেবে, ততক্ষণ সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন সম্ভব হবে না।’ বাংলা ভাষা নিয়ে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের এই অনুধাবন ও মন্তব্য বাংলা ভাষার ব্যবহার-প্রচলন-সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে প্রতীয়মান হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় আধিপত্য, বাণিজ্য ইত্যাদি কারণে একেকটি ভাষা অন্য একটি ভাষার শব্দে নিজের স্থান করে নেয়। বাংলা ভাষার সঙ্গেও ইংরেজি, আরবি, হিন্দি, উর্দু, ফারসি ভাষার মিশ্রণ আছে। এসব বিদেশি ভাষা বাংলায় এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছে যে সেগুলো এখন বাংলার মতোই ব্যবহার ও উচ্চারিত হয়। কিন্তু আধুনিকতার দোহাই দিয়ে বাংলা ভাষাকে দূষিত-বিকৃত করার যে প্রবণতা চলছে তা অবশ্যই দোষের। কেননা, এসব ভাষার ব্যবহার সরাসরি মূল ভাষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাঙালির অহঙ্কার যে, বাংলা ভাষা এই জাতির গর্বের ভাষা। মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলা ভাষার সাংবিধানিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫২ সালে। এর মাধ্যমে বিশ্বে সূচিত হয় এক নতুন ইতিহাসের। অন্যদিকে ২০০০ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় বাংলা ভাষা অধিকতর উচ্চ আসনে উন্নীত হয়েছে। ফলে বাংলা ভাষার মর্যাদাজ্ঞাপক ব্যবহারের দিকে অধিকতর নজর দেওয়া আবশ্যক। মহান স্বাধীনতার ৫৪ বছরে অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ নানান খাতে এগিয়ে এসেছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। সেখানে ভাষা নিয়ে এই দীনতা, এই হ-য-র-ল-ব অবস্থা কিছুতেই মাতৃভাষার মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিষয়টি ভীষণ লজ্জারও।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও সংবাদকর্মী