চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গল সলিমপুরে পুলিশ ও বিশেষ বাহিনীর যৌথ অভিযানে অন্তত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে পাঁচটি আগ্নেয়াস্ত্র। গতকাল ভোর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে শুরু হওয়া এই কঠোর অভিযান চলবে আজ মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, অভিযানে প্রায় ৫৫০ জন সেনা সদস্য, ১ হাজার ৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩৩০ এপিবিএন, ৪০০ র্যাব এবং ১২০ জন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অভিযানের শুরুতেই জঙ্গল সলিমপুরের সব প্রবেশ ও বাহিরের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বসানো হয়েছে তল্লাশি চৌকি, যাতে কোনো চিহ্নিত অপরাধী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় বাহিনীর সদস্যরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি পরিচালনা করে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আকাশপথে নজরদারির জন্য ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি মাটির নিচে বা ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারে কাজ করছে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডগ স্কোয়াড।
পুলিশ জানায়, জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হবে, যেখানে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া অপরাধীদের কোনো আশ্রয় না থাকার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের এডিশনাল ডিআইজি নাজমুল হাসান সাংবাদিকদের জানান- সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের চার হাজারের বেশি সদস্য ভূমি এবং পরিবেশ সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযানে অংশ নিয়েছে। অনেকগুলো টিম ভাগ হয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরকে দেশের ভেতরে আরেক দেশ বলা হতো। দেশের ভেতরে দেশ থাকতে পারবে না। এখানে আমাদের ক্যাম্প করার পরিকল্পনা আছে।’
এই অভিযানের মূল লক্ষ্য চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান, ওরফে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়া। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকাভুক্ত অনেক সন্ত্রাসীর বসবাস রয়েছে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায়। কয়েকটি গ্রুপ এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যে রয়েছে ইয়াসিন গ্রুপ, রোকন গ্রুপ ও রিদোয়ান গ্রুপ। এদের মধ্যে ইয়াসিন গ্রুপকে সবচেয়ে শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এলাকার বেশির ভাগ অংশ তাদের দখলে রয়েছে। বায়েজিদ লিংক রোডের উত্তর পাশে প্রায় তিন হাজার ১০০ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই এলাকা। বর্তমানে সেখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বাড়ি রয়েছে, যেখানে অন্তত এক থেকে দেড় লাখ মানুষের বসবাস। বাসিন্দাদের বড় অংশই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে বসতি গড়েছেন। এলাকাটি পাহাড়ি ও দুর্গম হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রবেশ দীর্ঘদিন ধরেই কঠিন ছিল। সেই সুযোগে এটি অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ বাহিনীর সদস্যরাও সেখানে অবস্থান নিয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
এছাড়া গত ১৯শে জানুয়ারি এই জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালানোর সময় সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব-৭ এর উপ-সহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। ওই ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় মামলা করে র্যাব। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় মোহাম্মদ ইয়াসিনকে। এতে ইয়াসিন ও নুরুল হক ভান্ডারীসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামি ধরতে গেলে ইয়াসিনের নির্দেশে রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোটা নিয়ে র?্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় আটক এক আসামিকে ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং চার র?্যাব সদস্যকে অপহরণ করা হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাদের উদ্ধার করে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. আহসান হাবীব পলাশ জানান, ২০০৩ সাল থেকে একটি চক্র সরকারি নিয়মকানুন উপেক্ষা করে এখানে অবৈধভাবে জমির কাগজ তৈরি, জমি দখল ও হস্তান্তরের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। পরিস্থিতি এমন ছিল যে- সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এলাকায় প্রবেশ করতে ভয় পেতো। এর আগে চারবার এই এলাকায় অভিযান চালানোর চেষ্টা করা হলেও সফল হওয়া যায়নি। এবার পঞ্চমবারের মতো অভিযান চালিয়ে যৌথ বাহিনী সফল হয়েছে।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, ভবিষ্যতে এই এলাকার উন্নয়নের জন্য সরকার যে পরিকল্পনাগুলো গ্রহণ করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত সহযোগিতায় সেই বাধা দূর হয়েছে।