ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জাপানি কনসোর্টিয়ামকে দ্রুত সংশোধিত প্রস্তাব জমা দিতে বলেছে বাংলাদেশ। বিলম্বিত এই টার্মিনালটি দ্রুত চালু করার লক্ষ্যে দুই পক্ষ পুনরায় আলোচনা শুরু করার পর এই আহ্বান জানানো হলো।
গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়। সভায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কর্মকর্তারা এবং জাপানি প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিলেন।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক শর্তে প্রায় এক বছর পর দুই পক্ষ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালু করার লক্ষ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা এই সভাকে ফলপ্রসূ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, উভয় পক্ষই দ্রুত নতুন টার্মিনাল চালুর লক্ষ্যে কাজ করছে।
সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমাদের আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা যত দ্রুত সম্ভব থার্ড টার্মিনালটি সচল করার চেষ্টা করছি। আমরা আশা করি, জাপানের সঙ্গে একটি সম্মানজনক চুক্তির মাধ্যমে নতুন এ টার্মিনালটি চালু করতে পারব।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগগুলো বিবেচনা করে দ্রুত সংশোধিত প্রস্তাব জমা দেওয়ার জন্য জাপানি প্রতিনিধিদলকে অনুরোধ করেছেন।
সভায় টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত জাপানি পক্ষের দেওয়া একটি প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দুই পক্ষ। এ সময় এমবারকেশন ফি, রাজস্ব ভাগাভাগির পদ্ধতি ও অগ্রিম অর্থ প্রদানের কাঠামোর মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত জানান, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত আগের চুক্তিতে কিছু চার্জ ও পরিচালনা-সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, বেসামরিক বিমান চলাচল চুক্তিতে সাধারণত তিন ধরনের চার্জ থাকে। এগুলোর কিছু বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, উভয় পক্ষ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। বাংলাদেশ তার প্রস্তাব পেশ করেছে এবং জাপানি পক্ষও তাদের অবস্থান তুলে ধরেছে। জাপানি পক্ষ বাংলাদেশের প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করে দ্রুত একটি সংশোধিত প্রস্তাব জমা দিতে সম্মত হয়েছে বলেও তিনি জানান।
নবগঠিত বিএনপি সরকারের অধীনে এটিই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। প্রায় সম্পন্ন হওয়া টার্মিনালটি যে চুক্তিভিত্তিক ও পরিচালনা-সংক্রান্ত অচলাবস্থার কারণে অলস পড়ে ছিল, তা নিরসনে সরকারের নতুন করে নেওয়া উদ্যোগের প্রতিফলন এই আলোচনা।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
জাপানের প্রতিনিধিদলে ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানি দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স তাকাহাশি নাওকি এবং জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সহকারী ভাইস মিনিস্টার রিকো নাকায়ামা-সহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ও প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত আলোচনাকে ইতিবাচক বলে অভিহিত করেন। শিগগিরই উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানে আসা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।
হুমায়ুন কবির বলেন, সরকার জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। তিনি আরও বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। আমরা আশা করছি শীঘ্রই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাবে।
বেবিচক কর্মকর্তারা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, পরিচালনগত নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারায় এ টার্মিনাল চালু করতে বিলম্ব হচ্ছে।
জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর এই সর্বশেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো।
এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে রয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো কর্পোরেশন, সোজিৎজ কর্পোরেশন ও নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট কর্পোরেশন। প্রকল্পটির অর্থায়নের সিংহভাগই দিয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)।
২০১৭ সালে অনুমোদিত এবং ২০১৯ সালে কাজ শুরু হওয়া থার্ড টার্মিনালের নির্মাণ ব্যয় প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। প্রায় ৫ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটার জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই টার্মিনালটি বছরে অতিরিক্ত ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী এবং প্রায় ৯ লাখ টন কার্গো বা পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা রাখে।
সূত্র : বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড