বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার শাহনূর আলম (৬০) কারা হেফাজতে মারা গেছেন। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। গত শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে তাঁকে কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সেখানে ভর্তি করা হয়েছিল।
শাহনূর আলম সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের নিজবলাইল গ্রামের বাসিন্দা। তার পরিবার ও স্বজনদের অভিযোগ, থানায় কোনো মামলা না থাকা সত্ত্বেও তাকে মারধর করে তুলে নেওয়া হয় এবং পরে একটি পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
শাহনূরের স্ত্রী মরিয়ম সুলতানা গতকাল শনিবার জানিয়েছেন, তার স্বামী উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। প্রায় সাত বছর আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় একটি পা হারান তিনি। হাতে রড বসানো ছিল। এক পায়ে ভর দিয়ে ক্রাচের সাহায্যে চলাফেরা করতেন। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটিতে নাম থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলা ছিল না।
মরিয়ম সুলতানার অভিযোগ, গত ৩ জানুয়ারি রাতে বগুড়া শহরের নারুলী এলাকায় বিএনপির কয়েকজন নেতা–কর্মী মব সৃষ্টি করে শাহনূরকে মারধরের পর তুলে নিয়ে যান। এরপর তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। টাকা না দেওয়ায় তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বগুড়া সদর থানায় সহযোগিতা চাওয়া হলে পুলিশ অপহরণকারীদের আটক না করে শাহনূরকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়।
মরিয়ম সুলতানার অভিযোগ, থানায় কোনো মামলা না থাকা সত্ত্বেও বগুড়া সদর থানার পুলিশ শাহনূর আলমকে দুই দিন আটকে রাখে। পরে বিস্ফোরক আইনে তদন্তাধীন একটি পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গত ৫ জানুয়ারি তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
কারাগারে যাওয়ার পর থেকে শাহনূর আলমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে বলে পরিবারের দাবি। এক সপ্তাহ পর গুরুতর অসুস্থ হলে তাঁকে বগুড়া জেলা কারাগার থেকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কয়েক দিন চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পাঠানো হয়।
শাহনূরের ছেলে রাকিব হোসেনের অভিযোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হলেও তাঁর বাবাকে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। ৫ মার্চ কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে তাঁর বাবাকে আবার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নেওয়া হয়। তখন তাঁর কিডনি কাজ করছিল না। চিকিৎসকেরা তাঁকে জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে আবার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে ফিরিয়ে নেয়। পরে গুরুতর অবস্থায় আবার হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত ১০টার দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুনিরুল ইসলাম মুঠোফোনে সাড়া দেননি।
২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৩ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ১৬ মাসে বগুড়ায় কারা হেফাজতে আওয়ামী লীগের ছয় নেতার মৃত্যু হয়েছে। তাদের অধিকাংশই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে চিকিৎসকদের বরাতে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।
এর মধ্যে গত বছরের ১১ মার্চ বগুড়া জেলা কারাগারে বন্দি অবস্থায় গাবতলী উপজেলার দক্ষিণপাড়া ইউনিয়নের লাংলু দক্ষিণপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক (৫২) মারা যান। ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর কারাগারে মারা যান গাবতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আবদুল মতিন (৬৫)। একই বছরের ২৬ নভেম্বর কারা হেফাজতে মারা যান বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শাহাদত আলম (৫৭)। ২৫ নভেম্বর মারা যান শিবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুল লতিফ (৬৭)। এ ছাড়া ১১ নভেম্বর কারা হেফাজতে মারা যান বগুড়া পৌরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম (৫৮)।
সূত্র : প্রথম আলো