নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন : পুরো মানবজাতিকে সংকটে ফেলছে নিয়ন্ত্রণহীন যুদ্ধ

: বিশ্বপরিস্থিতি ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ ঘন্টা আগে
ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা এবং ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এক ভয়াবহ সংকটের মধ্যে রয়েছে। ইউক্রেনে বেসামরিক এলাকায় বোমা হামলা, গাজায় ফিলিস্তিনিদের অনাহারে রাখা, শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করাসহ আগ্রাসী দেশগুলোর যুদ্ধবাজ প্রবণতা বিশ্বের পুরো মানবজাতি ভয়াবহ সংকটে ফেলতে যাচ্ছে যাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু এসব অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় পড়বে এমনটাই নয়, বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং বিশ্বের মানুষ ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে পড়বে। বিশ্বব্যবস্থা এমন  দিকে যাচ্ছে যেখানে কোনো নিয়ম থাকছে না। আর সেই পথ দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই। সত্যিই এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছে পুরো মানবজাতি।

ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর রাশিয়া বেসামরিক এলাকায় বোমা হামলা চালিয়েছে এবং মানুষের বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। গাজায় ফিলিস্তিনিদের অনাহারে রেখেছে ইসরাইল, শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। এমন অভিযোগ করেছে জাতিসংঘের একটি কমিশন। সুদানে সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত একটি মিলিশিয়া বেসামরিক মানুষকে অনাহারে রেখেছে এবং গণহত্যা ও গণধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িত হয়েছে।

গাজায় ব্যবহৃত অস্ত্রের বড় অংশ সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আবার আমিরাতের কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও তারা তেমনভাবে করেনি। তবু যুক্তরাষ্ট্র এখনও- কখনও দ্বিধাগ্রস্তভাবে যুদ্ধের আইন রক্ষার দাবি করে। কিন্তু ইরানে চলমান যুদ্ধে আমরা হয়তো সেই নীতিগুলো থেকেও আরও পিছিয়ে যাচ্ছি। একসময় যে মানবিক নীতির কথা আমরা বলতাম, তা যেন এখন শিথিল হয়ে যাচ্ছে।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিশেষজ্ঞ উনা হ্যাথাওয়ে আমেরিকান সোসাইটি অব ইন্টারন্যাশনাল ল-এর নির্বাচিত সভাপতি। তিনি বলেছেন, ইরানের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করতে পারে। মার্কিন ও ইসরাইলি হামলা সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নও তুলতে পারে।

মেয়েদের একটি স্কুলে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার খবর এসেছে। সেখানে প্রায় ১৭৫ জন নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদি এটি সত্যিই একটি ভুল হয়, তবে তা যুদ্ধাপরাধ নাও হতে পারে।

ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র একটি পানিশোধন কেন্দ্রেও হামলা করেছে, যা ৩০টি গ্রামে পানি সরবরাহ করত, যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দায় অস্বীকার করেছে। ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, হামলায় ১৭ হাজারের বেশি বাড়ি, ৬৫টি স্কুল ও ১৪টি চিকিৎসাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে ইউনিসেফ জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন দেশে এ পর্যন্ত ১১০০-এর বেশি শিশু নিহত বা আহত হয়েছে।

মার্কিন আইন বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক যুদ্ধাপরাধ প্রসিকিউটর ডেভিড ক্রেন বলেন, যদি কোনো স্থাপনা প্রধানত বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়, যেমন পানিশোধন কেন্দ্র, তাহলে সেটিতে হামলা করা যুদ্ধাপরাধ। তিনি সতর্ক করেছেন, আমরা এখন ‘আইনহীন যুদ্ধের যুগে’ প্রবেশ করছি এবং যুক্তরাষ্ট্রও এ প্রবণতাকে উসকে দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আমি আশঙ্কা করি, যদি প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়েন এবং লক্ষ্যবস্তুর তালিকা ফুরিয়ে আসে, তাহলে তিনি হয়তো বিদ্যুৎব্যবস্থা, সড়ক বা সেতুর মতো দ্বৈত ব্যবহারের অবকাঠামোতে হামলার প্রলোভনে পড়তে পারেন, যাতে ইরানকে শাস্তি দেয়া যায় এবং এমন দুর্ভোগ সৃষ্টি করা যায় যা জনগণের মধ্যে অসন্তোষ উসকে দেবে।

আসলে প্রেসিডেন্ট ও তার ঘনিষ্ঠদের বক্তব্যেই এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, আমরা তাদের এমনভাবে আঘাত করব যে তারা বা তাদের সাহায্যকারী কেউই ওই অঞ্চলকে আর পুনর্গঠন করতে পারবে না।

সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেছেন, আমরা তাদের ওপর ভয়াবহভাবে হামলা চালাব। সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, যদি ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ‘ইরানকে এমনভাবে ধ্বংস করা হবে, ইরানের পুনর্গঠন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে- মৃত্যু, আগুন ও তাণ্ডব নেমে আসবে।’

মার্কিন সামরিক কৌশল বিশ্লেষক ফিলিপস ও’ব্রায়েনের ভাষায়, এটা যেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধাপরাধগুলোর একটির হুমকি।

অন্যান্য দেশও বিষয়টি লক্ষ্য করছে। কিছু নেতা ইরানের ওপর হামলাকে সমর্থন করলেও স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধকে বেপরোয়া ও অবৈধ বলেছেন। সুইজারল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, মার্কিন হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডোমিনিক দ্য ভিলপাঁ বলেছেন, এই যুদ্ধ অবৈধ, অযৌক্তিক, অকার্যকর এবং বিপজ্জনক। তিনি নিষেধাজ্ঞা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিছু মানুষের চোখে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে একটি ‘নিয়ন্ত্রণহীন রাষ্ট্রে’ পরিণত করার দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

ইরানের একনায়কতন্ত্রকে পতন ঘটাতে পারেনি; বরং নতুন ও সম্ভবত আরও কঠোর নেতা মোজতবা খামেনিকে ক্ষমতায় এনেছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়ছে এবং সার সরবরাহও হুমকির মুখে পড়েছে। অসংখ্য প্রাণহানি ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও আপাতত আমেরিকান ও ইরানি- উভয় জনগণই আগের চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে। অবসরপ্রাপ্ত চারতারকা জেনারেল ওয়েসলি ক্লার্ক আমাকে বলেছেন, এই যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

জাতিসংঘের মানবিক প্রধান টম ফ্লেচার সতর্ক করেছেন, যুদ্ধের ভয়াবহতা সীমিত করার জন্য যে আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল তা এখন ভেঙে পড়ছে। জার্মানির ভাইস চ্যান্সেলর লার্স ক্লিংবাইল বলেছেন, আমরা এমন এক বিশ্বব্যবস্থার  দিকে এগোচ্ছি যেখানে আর কোনো নিয়ম থাকবে না। আর দুঃখজনকভাবে, সেই পথ দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই। যদি সত্যিই তা ঘটে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো মানবজাতি।

  • ইরান
  • ইসরায়েল
  • মধ্যপ্রাচ্য
  • যুক্তরাষ্ট্র
  • #