এমএসএফের প্রতিবেদন : মার্চে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৪, বেড়েছে নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা

: যথাসময় ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ ঘন্টা আগে

দেশে মার্চ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এবং সড়কে মৃত্যু বেড়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় মার্চে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। আগের মাস অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে এ ধরনের সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছিল ২।,মার্চে ২৮৯টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে; যা গত মাসের তুলনায় ৩৬টি বেশি। মার্চে রাজনৈতিক সহিংসতার সংখ্যা আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে তিন গুণের বেশি। ১৭ থেকে ২৬ মার্চ ২০২৬ ভোর পর্যন্ত ১০ দিনে সারা দেশে মোট ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৭৪ জন। মার্চে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে ৫৩টি এবং কারা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের।

এছাড়া ৩০ জন সাংবাদিক দেশের বিভিন্ন জেলায় পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় নানাভাবে হামলা, হয়রানি, হুমকি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মার্চ মাসে দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে মানবাধিকার প্রতিবেদন তৈরি করে।

রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছে: এমএসএফ বলেছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছে। সহিংসতার বেশির ভাগ ঘটনায় সরকারি দল বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং আধিপত্য বিস্তারের প্রভাব ছিল। এটি জনমনে আতঙ্ক তৈরি করছে। এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৬টি ঘটনায় সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৪০৪ জন। সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে নারীসহ ১৪ জন নিহত এবং ৩৯০ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ১০ জন, জামায়াতের ২ জন, ১ জন নারী এবং ১ জনের রাজনৈতিক পরিচয় সঠিকভাবে জানা যায়নি। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ১৮টি সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় দুজন নিহত হন এবং আহত হন ১১৩ জন।

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে: সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুলতানা কামাল স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চে ২৮৯টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে; যা গত মাসের তুলনায় ৩৬টি বেশি। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ৪৮টি, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ১৫টি, ধর্ষণ ও হত্যা ৩টি। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪ জন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী।

এমএসএফ জানায়, নারী ও শিশুদের ওপর ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো ঘটনা যে হারে বেড়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই সময়ে ধর্ষণচেষ্টা, যৌন নিপীড়ন, আত্মহত্যা, হত্যা এবং জীবিত বা মৃত নবজাতক উদ্ধারও বেড়েছে।

কারা হেফাজতে মৃত্যু ১১ জনের : এমএসএফ জানিয়েছে, এক মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কারা হেফাজতে মোট ১১ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে আরও ২ জনের। এমএসএফ মনে করে, বন্দিদের চিকিৎসা নিরাপত্তা নিশ্চিত করে হেফাজতে মৃত্যুর কারণ যথাযথভাবে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হলে এ ধরনের মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

এমএসএফের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। রাজনৈতিক সহিংসতা আগের চেয়ে বেড়েছে এ মাসে। এর মধ্যে শাসক দলের মধ্যেই বেশি ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীলতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এ মাসে কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে অনেকগুলো। নারীর প্রতি সহিংসতাও বেড়েছে। এ সবই মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনমনের চিত্র তুলে ধরে।

মতপ্রকাশে হস্তক্ষেপ: মার্চে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা এবং আক্রান্ত সাংবাদিকের সংখ্যা কিছুটা কমলেও সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাধা প্রদানে সরকারি দলের সংশ্লিষ্টতা গণমাধ্যমের জন্য হুমকি তৈরি করেছে বলে মনে করে এমএসএফ। সংস্থাটি জানায়, মার্চে ১০টি ঘটনায় ৩০ জন সাংবাদিক দেশের বিভিন্ন জেলায় পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় নানাভাবে হামলা, হয়রানি, হুমকি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার ৫টিতে বিএনপি, ১টিতে বহিষ্কৃত বিএনপির কর্মী, ১টিতে মব, ১টিতে ডাক্তার, ১টিতে বিআইডব্লিউটিসির কর্মচারী ও ১টিতে ভুয়া ফেসবুক আইডির সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

অজ্ঞাত লাশ : এমএসএফ জানায়, মার্চে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে ৫৩টি। এর মধ্যে ২ জন শিশু, ২ জন কিশোর, ১৩ জন নারী ও ৩৬ জন পুরুষ ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ঘটনা জনজীবনের নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
সংখ্যালঘু নির্যাতন: গণমাধ্যম ও এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী মার্চে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের ৪টি এবং আদিবাসী নির্যাতনের ৪টিসহ মোট ৮টি ঘটনা ঘটেছে। আর সনাতনী সংখ্যালঘুদের ১০টি মন্দিরে চুরির ঘটনা ঘটেছে।

এছাড়া প্রতিবেদনে এমএসএফ জানায়, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর অপব্যবহার, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর গ্রেপ্তার, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, অস্বাভাবিক ও ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে নিহত, সীমান্তে হত্যা, দুর্বৃত্ত কর্তৃক নিহত, গণপিটুনি ও মব সন্ত্রাসের ঘটনা অনবরত ঘটছে।

এমএসএফ মনে করে, জননিরাপত্তা নিয়ে সরকারের কার্যকর ভূমিকা না থাকায় নাগরিকদের জীবনে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক চর্চা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমমর্যাদা ও নাগরিক জীবনে নিরাপত্তার বিষয়গুলোর নিশ্চয়তা দিতে কর্তৃপক্ষের কাছে এমএসএফ জোর দাবি জানায়।

বড় উদ্বেগ সড়কের মৃত্যু: এমএসএফ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বরাতে জানায়, ১৭ থেকে ২৬ মার্চ ২০২৬ ভোর পর্যন্ত ১০ দিনে সারা দেশে মোট ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৭৪ জন।

প্রতিষ্ঠানটি জানায়, মহাসড়কগুলোতে বেপরোয়া গতিতে, ওভারটেকিং, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ, বিশ্রামহীন গাড়ি চালানোর দুর্ঘটনাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে হাইওয়ে পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবে আইনের যথাযথ প্রয়োগ দেখা যায় না। ফলে মহাসড়কে অটোরিকশা, ভ্যান ও সিএনজির অনিয়ন্ত্রিত চলাচল একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করছে, যা দুর্ঘটনার আশঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

  • এমএসএফ
  • প্রতিবেদন
  • সহিংসতা
  • #