রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আবারও পেছানো হচ্ছে জ্বালানি লোডিং

: যথাসময় ডেস্ক
প্রকাশ: ১ সপ্তাহ আগে

লাইনেন্স না পাওয়ায় আগামী ৭ এপ্রিল হচ্ছে না রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং। প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন প্রকল্পে জ্বালানি লোডিং ফের পেছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ব্যয়বহুল এ প্রকল্প এর আগে উৎপাদনে যাওয়ার সময় একাধিকবার পিছিয়েছে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অগ্নিনিরাপত্তা ইস্যুতে লাইসেন্স না পাওয়ায় আটকে গেছে পারমাণবিকের প্রথম ইউনিটের জ্বালানি লোডিং। দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এখন দৃশ্যমান হয়েছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ব্যয়বহুল এ প্রকল্প এর আগে উৎপাদনে যাওয়ার সময় একাধিকবার পিছিয়েছে। এমনকি প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের জন্য রাশিয়া থেকে প্রায় দুই বছর আগে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) এসেছে। অবশেষে চলতি বছরের ১৫ মার্চ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক পত্রে জানানো হয়েছিল, আগামী ৭ এপ্রিল প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের উদ্বোধন। অর্থাৎ পারমাণবিক চুল্লিতে বিক্রিয়ার জন্য সরবরাহ করা হবে জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম রড। এ সময় বলা হয়েছিল, জ্বালানি লোডিংয়ের উদ্বোধনের সময় ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জ্বালানি লোডিং এর আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশনের (আইএইএ) তত্বাবধায়নে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পেতে হয় লাইসেন্স। এই বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) গভীর রাত পর্যন্ত বৈঠক চললেও মেলেনি জ্বালানি লোডিং-এর অনুমোদন।

অনুমোদন না পাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বলেন, সবই ঠিক ছিল, কিন্তু এখন একটু ক্রিটিক্যাল সমস্যা দেখা দিয়েছে। এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য বলা হয়েছে। সেজন্য বেশি না, অল্প কয়েকদিনের জন্য জ্বালানি লোডিং শিফট করবে।

তিনি আরও বলেন, ‘সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এই জন্য আমরা মসজিদ-মন্দির-উপসনালয়েও সবাইকে প্রার্থনা করার জন্য অনুপ্রাণিত করছি।’

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানান, এর আগে নভেম্বরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কমপ্রিহেনসিভ সেফটি সিস্টেম টেস্ট সম্পন্ন হয়। ফিজিক্যাল স্টার্টআপের (জ্বালানি লোডিং) প্রস্তুতির সামগ্রিক অবস্থা নিরীক্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, রাশিয়ার শিল্প ও কর্মক্ষেত্র নিরাপত্তা তদারকি সংক্রান্ত সংস্থা-ভিও সেফটি তিনটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদল গত ৭ নভেম্বর থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের বিস্তৃত ও সুনির্দিষ্ট পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। এসময় ২৫৭টি অবজারভেশন চিহ্নিত করা হয়। এসব অবজারভেশনের মধ্যে ফের কিছু ক্ষেত্রে পুনঃপরীক্ষা এবং অতিরিক্ত কিছু এসেসমেন্ট করার জন্য বলা হয়েছে। আশা করছি কয়েকদিনের মধ্যেই এগুলো সম্পন্ন হবে এবং তাড়াতাড়ি আমরা জ্বালানি লোডিংয়ের লাইসেন্স পেয়ে যাবো।

প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন জানান, জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য যেসব ডকুমেন্টস দেওয়ার কথা ছিলো সেগুলো আমরা দিয়েছি। বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আমাদের কন্ডিশনাল লাইসেন্স দিবে; যদি আমাদের কোনো গ্যাপ থাকে । যেহেতু ওনারা রেগুলেটরি ইনডিপেনডেন্ট বডি, ওনাদের আরও কিছু অবজারভেশন আসছে। সেটা করতে আমাদের একটু সময় লাগবে।

পিডি ড. কবীর হোসেন আরও বলেন, মূলত সমস্যা হয়েছে ফায়ার ফাইটিং সিষ্টেম-ফায়ার মেজারমেন্টে। ফায়ার ফাইটিং ডিপার্টমেন্টে ওনারা ফারদার ইন্সপেকশনে আসবেন। ফায়ার ইন্সপেকশন করবেন। প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হয়তো সময় লেগে যেতে পারে। তার জন্য জ্বালানি লোডিংয়ে তারিখ শিফট করতে হতে পারে। মনে হয় ৭ এপ্রিলে হয়তো করতে পারবো না।

তিনি আরও জানান, যে বিষয়গুলো নজরে আনা হয়েছে- তা সমাধান করে দ্রুতই লাইসেন্স পেতে চেষ্টা করা হবে। জ্বালানি লোডিংয়ের লাইসেন্স পাওয়ার আগে দুই দেশের (বাংলাদেশ ও রাশিয়া) সরকার প্রধানের সময় নিয়ে উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করায় অস্বস্তিতে পড়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। গত মঙ্গলবার মাঝরাত পর্যন্ত বৈঠক চলে বিজ্ঞান ভবনে। পরে জানানো হয়, পেছানো হচ্ছে জ্বালানি লোডিং উদ্বোধনের তারিখ।

জানা গেছে, জ্বালানি লোডিংয়ের উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই রসাটমের একটি টিম বাংলাদেশে এসেছে। রসাটমের উচ্চ পর্যায়ের আরও কয়েকজন প্রতিনিধি আসার অপেক্ষায় রয়েছে।

প্রসঙ্গত, আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে নির্মাণ করা হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া প্রকল্পটিতে অর্থায়ন এবং কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে। মূল প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১২.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার সমান। এই ঋণ পরিশোধ শুরু হবে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে। তবে করোনা মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করে ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত ধার্য করা হয়েছে। এখন ধারণা করা হচ্ছে, ঋণ পরিশোধ শুরু করার সময়ও কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে।

প্রথম ইউনিটের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে, বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ২০২৭ সালের প্রথম দিকে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ এখনও শেষ হয়নি। প্রকল্প সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এটি আগামী বছরের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সবমিলিয়ে, পুরো প্রকল্পের কাজ ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই অনুযায়ী, আগামী বছরের শুরুর দিকে রূপপুর থেকে প্রথম ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা। ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ আরও ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের কথা রয়েছে।

সূত্র : ইত্তেফাক

  • জ্বালানি
  • পারমাণবিক
  • বিদ্যুৎকেন্দ্র
  • রূপপুর
  • লোডিং
  • #