ছবি : রেজাউল করিম (লেখক)
মঙ্গল নামে যত আপত্তি, আর সেই মঙ্গলবারে যাত্রা করল মঙ্গল (শুভ) নববর্ষ ১৪৩৩। স্বাগত জানাই মঙ্গল নববর্ষকে। মঙ্গল নামে কেন সংস্কৃতিবিরোধীদের আপত্তি? কারণ মঙ্গল দেবতা থেকে নামকরণ হয়েছে মঙ্গলবার ও মঙ্গলগ্রহ। একটু খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, বার ও গ্রহের নাম নামকরণ হয়েছে সনাতন দেব-দেবীর নামানুসারে।
এক. রবিবার (Sunday): রবি শব্দের অর্থ সূর্য। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী রবি বা সূর্য হলো শক্তির উৎস, জীবনীশক্তি এবং আত্মার প্রতীক এবং নবগ্রহের প্রধান। তাই সপ্তাহের প্রথম দিনটি সূর্যের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। পৌরাণিক মতে, তিনি কশ্যপ মুনি ও অদিতির সন্তান। এজন্য তাঁকে আদিত্যও বলা হয়। তিনি সাতটি ঘোড়া চালিত রথে চড়ে আকাশপথে ভ্রমণ করেন। এই সাতটি ঘোড়া সূর্যের সাতটি রঙ (বেনীআসহকলা) । যেহেতু সূর্য ছাড়া পৃথিবীর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না, তাই সম্মান প্রদর্শনপূর্বক সপ্তাহের প্রথম দিনটি সূর্যের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে।
দুই. সোমবার (Monday): সোম শব্দের অর্থ চাঁদ বা চন্দ্র। চন্দ্র শান্তি, শীতলতা এবং মনের প্রতীক। এটি মানুষের আবেগ, উর্বরতা এবং সৌন্দর্যের দেবতা হিসেবে পরিচিত। পৌরাণিক কাহিনীতে চন্দ্র দেবের আরেক নাম সোম। তাই চন্দ্রকে সোম বলা হয়। এই দিনটি চন্দ্র দেবতার নামে নামাঙ্কিত। সোম শব্দের আরেকটি অর্থ হলো অমৃত। দক্ষ প্রজাপতির ২৭টি নক্ষত্র-রূপী কন্যা হলেন চন্দ্রের স্ত্রী। হিন্দু পুরাণ মতে, চন্দ্র একজন পুরুষ দেবতা। আমরা হয়তো সৌন্দর্যের কারণে চাঁদকে নারীসুলভ মনে করি, কিন্তু প্রাচীন শাস্ত্রে তিনি সর্বদা একজন শক্তিশালী দেবপুরুষ হিসেবেই চিত্রিত। আবার সোম দেবতাকে ওষধি বা গাছপালার অধিপতিও বলা হয়। এছাড়া ‘সোম’ শব্দটি মহাদেব শিবের সাথেও যুক্ত (সোমেশ্বর), যার কারণে সোমবারকে শিবের আরাধনার জন্য বিশেষ দিন মনে করা হয়।
তিন. মঙ্গলবার (Tuesday): মঙ্গল শব্দের অর্থ শুভ বা কল্যাণ। হিন্দু পুরাণে মঙ্গলকে বলা হয় ‘ভূমিপুত্র’ বা পৃথিবীর সন্তান। মঙ্গল দেবতাকে সাহসিকতা, শক্তি এবং যুদ্ধের দেবতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জ্যোতিষশাস্ত্রে একে তেজস্বী গ্রহ হিসেবে দেখা হয়। মঙ্গল মূলত মঙ্গল গ্রহকে (Mars) নির্দেশ করে। মঙ্গলের গায়ের রঙ আগুনের মতো লাল। পুরাণে বলা হয়েছে, মহাদেবের ক্রোধ বা তেজ থেকে তাঁর জন্ম বলেই তিনি রক্তবর্ণ। আর বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, মঙ্গলের মাটিতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন অক্সাইড (মরচে) থাকায় একে লাল দেখায়।
চার. বুধবার (Wednesday): বুধ শব্দটি মূলত বোধ বা জ্ঞান থেকে এসেছে। বুধ মানে হলো বোধ, চেতনা,জ্ঞান,প্রজ্ঞা এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন কোনো সত্তা। বুধ হলেন চন্দ্রের পুত্র এবং বুদ্ধির দেবতা। তিনি বুদ্ধি, যোগাযোগ, ব্যবসা এবং বাণীর দেবতা। এ কারণে বুধবারকে বুদ্ধির দিন হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
পাঁচ. বৃহস্পতিবার (Thursday): হিন্দু দেবতত্ত্ব অনুযায়ী বৃহস্পতি হলেন দেবগুরু বা দেবতাদের গুরু। তিনি প্রজ্ঞা, বাগ্মিতার, ধর্ম এবং ভাগ্যের প্রতীক। বৃহস্পতি শব্দটি বৃহস্পতি গ্রহকে (Jupiter) নির্দেশ করে। এ গ্রহটি আকারে সবচেয়ে বড় হওয়ায় একে গ্রহরাজও বলা হয়।
ছয়. শুক্রবার (Friday): শুক্র শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো উজ্জ্বল, শুভ্র বা শুচি। যেহেতু আকাশে শুক্র গ্রহকে অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং সাদাটে দেখায়, তাই এর নাম রাখা হয়েছে শুক্র। শুক্র প্রেম, সৌন্দর্য, শিল্পকলা, সম্পদ ও বিলাসিতার প্রতীক। মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যার অধিকারী হিসেবে তাকে সম্মান করা হয়। শুক্র বা শুক্রাচার্য হলেন অসুরদের গুরু। তিনি ছিলেন মহর্ষি ভৃগুর পুত্র। শুক্র অত্যন্ত বুদ্ধিমান, নীতিবান এবং তিনি মৃত ব্যক্তিকে জীবন দান করার বিদ্যা (মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা) জানতেন। শুক্রবার শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে শুক্র গ্রহ (Venus) থেকে।
সাত. শনিবার (Saturday): শনি শব্দটি শনি গ্রহকে (Saturn) নির্দেশ করে। হিন্দু পুরাণে শনি হলেন কর্মফলের দেবতা এবং সূর্য দেবের পুত্র। তার মায়ের নাম ছায়া। শনি গ্রহের ধীর গতির কারণে একে অনেক সময় শনৈশ্চর (যিনি ধীরে চলেন) বলা হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও শনি গ্রহ সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে অনেক সময় নেয় (প্রায় ২৯.৫ বছর)। তাই প্রাচীন ঋষিগণ এর নাম রেখেছিলেন শনি। তিনি মানুষকে তার কাজের ভিত্তিতে বিচার করেন এবং ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তিনি সততা, কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং শৃঙ্খলার প্রতীক। যারা সৎ পথে চলেন, শনি দেব তাদের প্রতি প্রসন্ন থাকেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
বাংলা সপ্তাহের সাতটি দিনের নাম মূলত প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা এবং হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীর নবগ্রহের নাম অনুসারে রাখা হয়েছে। এই নামগুলো সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত এবং প্রতিটি নামই কোনো না কোনো মহাজাগতিক বস্তু বা দেবতাকে নির্দেশ করে। প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যগণ খালি চোখে যা দেখতে পেতেন এবং তার সাথে কাল্পনিক কাহিনী যোগ করে গ্রহ ও বারের নামকরণ করেছেন। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে গ্রহ বলতে যা বোঝায়, নবগ্রহের ধারণাটি ঠিক তেমন নয়। এখানে সূর্য (নক্ষত্র) এবং চাঁদকেও (উপগ্রহ) গ্রহ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তবে এই নামকরণের ধারাটি মূলত প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গ্রিক-রোমান জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি সমন্বিত প্রভাবের ফসল।
আট. রাহু (North Node): রাহু কোনো দৃশ্যমান গ্রহ নয়, এটি একটি গাণিতিক বিন্দু (ছায়া গ্রহ)। অমাবস্যার সময় সূর্য ও চাঁদের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে এর প্রভাব নির্ণয় করা হয়। একে ড্রাগনের মাথা হিসেবে কল্পনা করা হয়। রাহু অতৃপ্ত বাসনা, মোহ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এটি মানুষকে জাগতিক উন্নতির জন্য পাগল করে তোলে।
নয়. কেতু (South Node): কেতুও একটি ছায়া গ্রহ এবং ড্রাগনের লেজ হিসেবে পরিচিত। এটি মোক্ষ বা আধ্যাত্মিক মুক্তির প্রতীক। রাহু ও কেতুকে পৌরাণিক কাহিনীতে স্বরভানু নামক অসুরের দুটি অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
একসময় দেবতারা তাদের শক্তি হারিয়ে ফেললে ভগবান বিষ্ণুর পরামর্শে তারা অসুরদের সাথে মিলে সমুদ্র মন্থন শুরু করেন। উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রের তলদেশ থেকে ‘অমৃত’ উত্তোলন করা, যা পান করলে অমর হওয়া যায়। মন্থনের শেষে ধন্বন্তরি দেব অমৃতের কলস নিয়ে আবির্ভূত হন। অমৃত নিয়ে দেবতা ও অসুরদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে, অসুররা অমৃত কেড়ে নেয়। তখন শ্রী বিষ্ণু এক পরম সুন্দরী নারীর রূপ ধারণ করেন, যা মোহিনী অবতার নামে পরিচিত। মোহিনী তার রূপ ও মায়ায় অসুরদের মুগ্ধ করে ফেলেন এবং শর্ত দেন যে তিনি নিজেই দুই পক্ষকে অমৃত ভাগ করে দেবেন। আসলে মোহিনী চাতুরি করে দেবতাদের অমৃত পান করাচ্ছিলেন এবং অসুরদের সাধারণ পানীয় দিচ্ছিলেন। স্বরভানু নামক এক বুদ্ধিমান অসুর মোহিনীর এই কৌশল ধরে ফেলেন। তিনি দেবতাদের রূপ ধারণ করে চুপিচুপি দেবতাদের সারিতে গিয়ে বসেন এবং সূর্য ও চন্দ্রের মাঝখানে জায়গা করে নেন। মোহিনী যখন তাকে অমৃত পরিবেশন করেন, স্বরভানু তা পান করা শুরু করেন। স্বরভানু অমৃত পান করা মাত্রই সূর্য ও চন্দ্র তাকে চিনে ফেলেন এবং চিৎকার করে শ্রী বিষ্ণুকে সাবধান করে দেন যে, তিনি একজন অসুর। তৎক্ষণাৎ শ্রী বিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র নিক্ষেপ করেন। কিন্তু ততক্ষণে অমৃত স্বরভানুর কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। চক্রের আঘাতে স্বরভানুর দেহ রাহু ও কেতা নামে দুই খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়। অমৃত স্পর্শ করা উপরের অংশ বা মাথা হচ্ছে রাহু এবং নিচের অংশ বা শরীর হচ্ছে কেতু।
অমৃত পান করার কারণে মাথা এবং ধড় আলাদা হয়ে গেলেও তারা অমর হয়ে যায়। তখন থেকেই ব্রহ্মার বরে তারা আকাশে গ্রহের মর্যাদা পায় (ছায়া গ্রহ হিসেবে)। কিন্তু সূর্য ও চন্দ্র তাদের পরিচয় ফাঁস করে দিয়েছিল বলে, রাহু ও কেতু তাদের চিরশত্রু হয়ে ওঠে। এই প্রতিশোধ নিতেই রাহু ও কেতু সময়ে সময়ে সূর্য ও চন্দ্রকে গ্রাস করার চেষ্টা করে, যাকে আমরা সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণবলি। যেহেতু রাহুর গলা কাটা এবং কেতুর মাথা নেই, তাই তাদের গ্রাস করা সূর্য বা চাঁদ আবার বেরিয়ে আসে। যেহেতু এরা রক্ত-মাংসের গ্রহ নয় বরং গাণিতিক বিন্দু, তাই জ্যোতিষশাস্ত্রে এদের ছায়া গ্রহ বলা হয়।
এই নামকরণের ধারাটি মূলত প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গ্রিক-রোমান জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি সমন্বিত প্রভাবের ফসল। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী ও প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা অনুযায়ী, ‘নবগ্রহ’ হলো মহাবিশ্বের নয়টি বিশেষ মহাজাগতিক বস্তু বা শক্তি, যারা মানুষের ভাগ্য, কর্মফল এবং পৃথিবীর ঘটনাবলিকে নিয়ন্ত্রণ করে বলে বিশ্বাস করা হয়। প্রাচীন ভারতীয় মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী, নবগ্রহের সন্তুষ্টি জীবনের বাধা-বিপত্তি দূর করে শান্তি নিয়ে আসে। নবগ্রহ মানে নয়টি আকর্ষণকারী বা প্রভাবশালী শক্তি। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে গ্রহ বলতে যা বোঝায়, নবগ্রহের ধারণাটি ঠিক তেমন নয়। এখানে সূর্য (নক্ষত্র) এবং চাঁদকেও (উপগ্রহ) গ্রহ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
লেখক : সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক