মাজার ভাঙার আগে সুফি-সাধকদের জীবনদর্শন বুঝতে হবে। এরপরই না হাতুড়ি দিয়ে ভাঙতে যাই, কিংবা কবর থেকে লাশ তুলে আগুন দিয়ে পোড়াই, কিংবা জীবিত সাধকদের পিটিয়ে হত্যা করি। কিন্তু এসব করার আগে তাদের জীবনদর্শনটা কি কখনও বোঝার চেষ্টা করছি?
বাগেরহাটের খানজাহান আলীর মাজার, কেন আমার কাছে প্রিয়, একটু খোলাসা করি। খানজাহান আলী (১৩৬৯-১৪৫৯) ছিলেন সুফিসাধক ও স্থানীয় শাসক। এ সাধকের চিন্তাদর্শন আজকের মোল্লা-মৌলবির থেকে অনেক উন্নত ছিল। তিনি তার সময়ের মানুষের কথা চিন্তা করে বড় দিঘি খনন করে। আমি মনে করি, মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানির যোগান দিতেই তিনি এ দিঘি খনন করেছিলেন। এ পানি সে সময়ে জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষ পান করতেন। তাই আজও সবার কাছে পূজনীয় তিনি।
তাছাড়া খানজাহান আলী কুমিরের মতো হিংস্র প্রাণীকে ভালোবাসা দিয়ে তিনি পোষ মানিয়েছেন। ভালোবাসার এ দিকটি বিশ্লেষণ করলে বুঝতে পারবেন Love for Nature…কিংবা Back to the nature (প্রকৃতির কাছে ফিরে যাও)। এস টি কোলরিজের ‘দ্য রাইম অব দি অ্যানশিয়েন্ট ম্যারিনার’ বুঝতে হলে আগে আমাদের বুঝতে হবে খানজাহান আলীকে। ইংরেজি রোমান্টিক কবিদের জন্মের প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর আগে তিনি কতোটই প্রকৃতিপ্রেমী ও মানবপ্রেমী ছিলেন। এটা একটু বুঝতে হবে।
মিরপুরের শাহ আলীর মাজারে প্রতিদিন একবেলা খাবার বিতরণ করা হয়। এ খাবার সাধারণত ছিন্নমূল, অসহায়, গরিব ও অভুক্ত মানুষেরা খেয়ে থাকেন। এ খাবার কোনো বিশেষ বিশ্বাসে বিশ্বাসী গোষ্ঠীর জন্য নয় শুধু, সব ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য। এ মাজরটিও মানবকূলসহ অন্যান্য প্রাণীরও সেবায় নিয়োজিত।
সিলেটের শাহজালালের মাজারের দিঘি গজাল মাছ রয়েছে। আবহমানকাল ধরে এ মাছের এ দিঘির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে আসছে। এছাড়াও শাহজালালের মাজারে শান্তির প্রতীক কবুতর পালনের নান্দনিক দৃষ্টান্ত রয়েছে। গজাল মাছ ও কবুতর পালের এ নান্দনিক দিকটি শাহজালালের জীবনদর্শনের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলেই আবহমানকাল ধরে এ ঐতিহ্য আজও দিকে আছে তার মাজারে। কোন মানসিকতা নিয়ে এ ঐতিহ্যকে ধ্বংস করতে আমরা মরিয়া হয়ে উঠছি। একটু ভাবতে হবে আমাদের।
বায়েজিদ বোস্তামির দরগাহের দিঘিতে কচ্ছপের মতো নিরীহ প্রাণীর নির্বিঘ্ন পদচারণা রয়েছে। আবহমানকাল ধরে বায়েজিদ বোস্তামির মাতৃভক্তের গল্প শুনে শুনে বড় হচ্ছে আমাদের এ প্রজন্ম।
কাজেই এ আঘাত মাজারে নয়, আঘাত আমাদের ঐতিহ্যে, আঘাত আমাদের প্রাণে, আঘাত আমাদের অস্তিত্বে। এ সত্য অনুধাবন না করতে পারলে, আমাদের আরও বড় বিপদে পড়তে হবে।
আমি এপিটাফের পক্ষে, প্রতিটি মানুষ তার জীবনদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ দুটি লাইন তার মাজারে লিখে রেখে যাক। প্রজন্ম-পরম্পরা এ স্মৃতিচিহ্ন দেখে তার পূর্বপুরুষদের অস্তিত্ব খুঁজুক, ভালো-মন্দের বিচার-বিশ্লেষণ করুক আত্মদর্শনের জায়গা থেকে। মাজার ভাঙুন আর যা-ই করুন, অস্তিত্বে আঘাত করতে যাবেন না, পরিণতি শুভকর হবে না।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক
