প্রবীণদের নিঃসঙ্গ মৃত্যু : আমাদের সমাজের আয়নায় দেখা এক নির্মম বাস্তবতা

লেখক: শেখ আলী আহমেদ
প্রকাশ: ২ ঘন্টা আগে
ছবি : শেখ আলী আহমেদ

একটি নগর ফ্ল্যাটে কয়েক দিন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। প্রতিবেশীদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে যে দৃশ্য দেখল, তা কেবল একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য লজ্জার। ৭৫ বছর বয়সী এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ পড়ে আছে ঘরের এক কোণে—নিঃসঙ্গ, পরিত্যক্ত ও অনাদরে। একই ছাদের নিচে থেকেও তার মৃত্যু এক-দুই দিন কারও নজরে পড়েনি। এই একটি ঘটনাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে—আমরা আসলে কেমন সমাজে বাস করছি?

একটি সমাজ কতটা মানবিক, ন্যায়পরায়ণ ও সভ্য—তা কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো বা উন্নয়নের সূচক দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং সেই সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল ও নির্ভরশীল মানুষদের—বিশেষত প্রবীণ ও শিশুদের—কতটা নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা দিতে পারে, সেটিই তার প্রকৃত মানবিকতার মাপকাঠি। এই পরীক্ষায় আমরা কতটা উত্তীর্ণ হচ্ছি, তা নিয়ে এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

বাংলাদেশ দ্রুত বার্ধক্যমুখী সমাজে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং জাতিসংঘের জনসংখ্যা পূর্বাভাস অনুযায়ী দেশে ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-দশমাংশ প্রবীণ, এবং আগামী দুই দশকে এই হার আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রবীণদের সুরক্ষা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের প্রশ্নটি আর কেবল পারিবারিক বিষয় নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জননীতি (public policy) ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের সমাজ একসময় পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। যৌথতা, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ছিল এর প্রধান শক্তি। যৌথ পরিবার কেবল সহাবস্থানের একটি কাঠামো ছিল না; এটি ছিল অনুভূতি, দায়িত্ব ও আন্তঃপ্রজন্মীয় সম্পর্কের এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। প্রবীণরা ছিলেন সেই কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা শুধু পরিবারের সদস্য ছিলেন না; ছিলেন অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার, মূল্যবোধের ধারক এবং পরিবারের আবেগিক কেন্দ্রবিন্দু। তাদের উপস্থিতি পরিবারকে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে একটি ধারাবাহিক সংযোগ প্রদান করত।

কিন্তু সময় বদলেছে। দ্রুত নগরায়ন, জীবিকার প্রয়োজনে স্থানান্তর, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব সেই পারিবারিক কাঠামোকে গভীরভাবে পরিবর্তন করেছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে রূপান্তরিত হয়েছে; কমেছে পারস্পরিক নির্ভরতা ও দায়বোধ। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে প্রবীণদের। যারা একসময় পরিবারের কেন্দ্র ছিলেন, তারা আজ অনেক ক্ষেত্রে প্রান্তিক, উপেক্ষিত, এমনকি অপ্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হচ্ছেন।

সাম্প্রতিক ঘটনাটি এই রূপান্তরের একটি নির্মম প্রতীক। আরও বেদনাদায়ক হলো, ওই নারীর সন্তানরা সমাজের তথাকথিত সফল মানুষ—কেউ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। তবুও জীবনের শেষ সময় তাকে এমন নিঃসঙ্গ ও অবহেলিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এটি কেবল একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়; এটি আমাদের সময়ের নৈতিক সংকটের প্রতিফলন।

এই ঘটনা একটি প্রচলিত ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা প্রায়ই মনে করি, সন্তানদের উচ্চশিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা বার্ধক্যে পিতা-মাতার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়। বাস্তবতা বলছে, তা সবসময় সত্য নয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষকে দক্ষ করে, প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে এবং পেশাগত সাফল্য এনে দিতে পারে; কিন্তু সেই শিক্ষা যদি সহমর্মিতা, নৈতিকতা ও মানবিক দায়বোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তবে তা অসম্পূর্ণ মানুষ তৈরি করে। তখন আমরা সফল হই, কিন্তু সংবেদনশীল হই না; প্রতিষ্ঠিত হই, কিন্তু দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলি।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো সামাজিক পুঁজির ক্ষয়। সমাজবিজ্ঞানীরা পারস্পরিক আস্থা, সম্পর্ক ও সহযোগিতার নেটওয়ার্ককে সামাজিক পুঁজি (social capital) বলে অভিহিত করেন। শহুরে জীবনে এই সামাজিক পুঁজি দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। পাশের ফ্ল্যাটে কে আছে, কেমন আছে, কোনো সমস্যায় আছে কি না—এসব জানার প্রয়োজনীয়তাও আমরা অনেক সময় অনুভব করি না। ফলে একজন মানুষ দিনের পর দিন নিঃসঙ্গ থাকলেও তা অদৃশ্য থেকে যায়। এমনকি মৃত্যুর পর দুর্গন্ধ ছড়ানো পর্যন্ত সমাজ তা জানতে পারে না। এই বিচ্ছিন্নতা কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক অসুখের লক্ষণ।

বাংলাদেশে প্রবীণদের সুরক্ষার জন্য ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ রয়েছে। আইনটি সন্তানদের ওপর পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ, চিকিৎসা, যোগাযোগ এবং যত্নের দায়িত্ব আরোপ করেছে। কাগজে-কলমে এটি একটি প্রগতিশীল উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট।

প্রথমত, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগ ছাড়া আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয় না। দ্বিতীয়ত, সামাজিক বাস্তবতায় প্রবীণরা নিজের সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে অনিচ্ছুক। তৃতীয়ত, বিচারপ্রক্রিয়ার জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা অনেকের জন্য এই পথকে প্রায় অকার্যকর করে তোলে। চতুর্থত, অবহেলাজনিত মৃত্যুর মতো বিষয় প্রমাণ করাও সহজ নয়। ফলে বহু ঘটনা নীরবে চাপা পড়ে যায়।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—শুধু একটি ভালো আইন কি যথেষ্ট? অভিজ্ঞতা বলছে, নয়। আইন প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কার্যকর প্রয়োগ আরও গুরুত্বপূর্ণ। আইনের সঙ্গে যদি সহজ প্রতিকারব্যবস্থা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা যুক্ত না হয়, তবে আইন অনেক সময় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

তাই সমস্যার সমাধান কেবল আইন কঠোর করা নয়; বরং আইনকে কার্যকর করার পাশাপাশি একটি সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তৃতীয় পক্ষের অভিযোগের সুযোগ সৃষ্টি, ঝুঁকিপূর্ণ প্রবীণদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা এবং জরুরি সহায়তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে প্রবীণদের জন্য আরও কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করতে হবে।

তবে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আইন বা প্রশাসনের নয়; এটি মূল্যবোধের প্রশ্ন। পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেই মানুষ হয়ে ওঠার বীজ রোপিত হয়। যদি একটি প্রজন্ম এই শিক্ষা না পায় যে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন কোনো দয়া নয়, কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং স্বাভাবিক মানবিক কর্তব্য—তবে আইনের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব নয়।

এই ধরনের ঘটনা আমাদের জন্য কেবল সংবাদ নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। আমরা যদি এখনই পরিবার, শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তিকে পুনর্গঠন করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা ও অবহেলা আরও গভীর সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

প্রবীণদের প্রতি আমাদের আচরণই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্ম কী শিখবে। আজ আমরা যদি আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের একা ফেলে যাই, কাল সেই একাকীত্বই আমাদের প্রতীক্ষা করবে। তাই এই সংকট কেবল অন্য কারও নয়; এটি আমাদের সবার ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।

সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার যদি সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নেয়, আইনকে কার্যকর করে, সামাজিক সচেতনতা বাড়ায় এবং মানবিক মূল্যবোধকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে, তবে এই অমানবিকতা রোধ করা সম্ভব। অন্যথায় নিঃসঙ্গতা ও অবহেলায় ভরা বার্ধক্য আমাদের সময়ের এক নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হবে, যা কোনো উন্নয়নের সূচক দিয়ে আড়াল করা যাবে না।

সময়ের আগে যদি আমরা সতর্ক না হই, তবে একদিন হয়তো আমাদের শহরগুলো নীরব, বন্ধ দরজা আর নিঃসঙ্গ মৃত্যুর খবরেই ভরে যাবে। উন্নয়নের আলো তখনও জ্বলবে, কিন্তু তার ছায়ায় লুকিয়ে থাকবে মানবিকতার গভীর অন্ধকার।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক

  • নগর
  • নিঃসঙ্গ
  • পরিবার
  • ফ্ল্যাট
  • সমাজ