টানা এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো গত বছর বিশ্বে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা কমেছে। এর কারণ হিসেবে অনেক মানুষ অনিরাপদ ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর বৃহস্পতিবার জানায়, ২০২৫ সালের শেষে বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ছিল ১১ কোটি ৭৭ লাখ ৮০ হাজার। এক বছর আগের তুলনায় এটি ৫৪ লাখ কম। তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে- যুদ্ধ, সহিংসতা ও নিপীড়নের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এখনও অগ্রহণযোগ্যভাবে বেশি। দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতি কমাতে আগামী দশকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
ইউএনএইচসিআর তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই হ্রাসের প্রধান কারণ হলো শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের (আইডিপি) বড় একটি অংশের নিজ দেশে ফিরে যাওয়া। ২০২৫ সালে মোট ১ কোটি ৪৭ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ তাদের নিজ এলাকায় ফিরে গেছে। এর মধ্যে ৪৪ লাখ শরণার্থী তাদের নিজ দেশে ফিরে গেছে, যা গত ৬০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের ঘটনা।
২০২৫ সালের শেষে বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ১৬ লাখকে শরণার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ ওই বছরের মধ্যেই সীমান্ত পেরিয়ে শরণার্থী হয়েছে। নতুন শরণার্থীদের ৬০ শতাংশ এসেছে মাত্র আটটি দেশ থেকে। এর মধ্যে সুদান থেকে প্রায় ১০ লাখ এবং ইউক্রেন থেকে প্রায় ৮ লাখ মানুষ পালিয়ে গেছে।
প্রতিবেদনটি আরও বলেছে, চলতি বছরের শুরু থেকে কয়েকটি বড় সংকট নতুন বাস্তুচ্যুতির কারণ হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ফেব্রুয়ারিতে শুরু করা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে ইরানে ৩২ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া লেবাননে মার্চ থেকে ইসরাইলি হামলায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে। ইরান ও লেবাননের সংঘাতের কারণে সেখানে আশ্রিত অনেক শরণার্থীও বছরের শুরু থেকে নিজ দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছে, যার মধ্যে সিরিয়া ও আফগানিস্তানও রয়েছে।
ইউএনএইচসিআর শরণার্থী পুনর্বাসনের সুযোগ কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয় শরণার্থীর সংখ্যা ২৯ লাখে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে পুনর্বাসনের জন্য স্থান ছিল ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮০০টি, যা গত চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু গত বছর তা অর্ধেকেরও বেশি কমে ৮১ হাজার ৮০০-এ নেমে আসে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী গ্রহণ কমে যাওয়াকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউএনএইচসিআর সতর্ক করে বলেছে, চাহিদা ও সুযোগের মধ্যে ব্যবধান অত্যন্ত বড় এবং তা আরও বাড়ছে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক প্রধান বারহাম সালেহ জেনেভায় সাংবাদিকদের বলেন, গত বছর শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের ৯০ শতাংশেরও বেশি ঘটেছে আফগানিস্তান, সুদান ও সিরিয়ায়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব প্রত্যাবর্তনের অনেকগুলোই নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিস্থিতিতে হয়নি, বরং চাপের মধ্যে হয়েছে। তিনি বলেন, তারা এমন দেশে ফিরে গেছে যেখানে নিরাপত্তাহীনতা এখনও বিদ্যমান, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত এবং মৌলিক সেবা ও অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত। যেসব প্রত্যাবর্তন নিরাপদ নয়, সেগুলো কোনো সমাধান নয়, বরং এটি নতুন বাস্তুচ্যুতির চক্র শুরু করতে পারে।
