বিভেদ সৃষ্টি করে স্বার্থ হাসিল: ইসলামের কঠোর সতর্কবার্তা

লেখক: কামরুজ্জামান
প্রকাশ: ১৫ minutes ago
লেখক: কামরুজ্জামান

আমরা একটু খেয়াল করলেই চারপাশে দেখতে পাব পাড়ার মসজিদে দুটো গ্রুপ। অথবা পুকুরের দুইপাশে দুই মসজিদ। একে অপরের সাথে কথা বলে না, একসাথে নামাজ পড়ে না। গ্রামে দুই পক্ষ, হয়তো একই পরিবার থেকে বেরিয়ে আসা। বছরের পর বছর মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে আছে কোন তুচ্ছ বিষয় নিয়ে। অফিসে কেউ একজন আড়ালে কানে কানে বলছে, ‘ওকে বিশ্বাস করবেন না।’ রাজনীতির মাঠে নেতারা জনগণকে এ বিভিন্ন উপদল ও গ্রুপে ভাগ করে নিজেদের আসন পাকা করছেন।

এই দৃশ্যগুলো আমাদের কাছে এখন এতটাই পরিচিত যে আমরা এগুলোকে স্বাভাবিক ভেবে নিয়েছি। কিন্তু ইসলাম বলছে, এটা স্বাভাবিক নয়, এটা একটি গুরুতর জঘন্য পাপ। যে ব্যক্তি নিজের স্বার্থের জন্য মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে, সে শুধু সমাজের ক্ষতি করছে না বরং সে আল্লাহর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

কুরআনের আলোকে ফাসাদ, ফিতনা ও মুনাফিকের চরিত্র

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এমন মানুষের কথা বলেছেন যারা মুখে শান্তির কথা বলে, কিন্তু কাজে বিভেদ ছড়ায়। সূরা বাকারার আল্লাহ বলেন, মানুষের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছে, যার দুনিয়াবী কথাবার্তা তোমাকে মুগ্ধ করে। সে তার অন্তরের বিষয়ে আল্লাহকে সাক্ষী রাখে, অথচ সে ঘোর বিতণ্ডাকারী। যখন সে ফিরে যায়, তখন সে পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটাতে এবং ফসল ও মানুষের জীবন ধ্বংস করতে ছুটে বেড়ায়। আর আল্লাহ বিপর্যয় পছন্দ করেন না। আর যখন তাকে বলা হয়, ‘আল্লাহকে ভয় করো’, তখন অহংকার তাকে আরও পাপে নিমজ্জিত করে। তার জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট এবং তা কতই না নিকৃষ্ট আবাস।
এই আয়াতে “ফাসাদ ফিল আরদ” বা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। মুফাসিররা বলেছেন, এই বিপর্যয় কেবল শারীরিক ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং সম্পর্ক নষ্ট করা, মানুষে মানুষে শত্রুতা তৈরি করা, সমাজের ঐক্য ভেঙে দেওয়াও এই ফাসাদের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ এমন মানুষের কথা বলা হয়েছে, যে মুখে অত্যন্ত মিষ্টি কথা বলে, আল্লাহকে সাক্ষী রেখে দাবি করে তার নিয়ত খাঁটি। সে ভাল চায় কিন্তু আড়ালে বা ক্ষমতা ও সুযোগ পেলে সে ফসল ও মানুষের ক্ষতি করে বেড়ায়। তাকে যখন বলা হয়, ‘আল্লাহকে ভয় করো’ তখন অহংকার তাকে আরও পাপে ডুবিয়ে দেয়।

ফিতনা শব্দটি কুরআনে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে যার মধ্যে সামাজিক অস্থিরতা ও গৃহদ্বন্দ্ব তৈরি করা, সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা,ও মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য নষ্টকারী সকল কার্যক্রম অন্যতম। ফিতনা ও ফাসাদ একে অপরের সহায়ক ও মুনাফিকের হাতিয়ার। কুরআনে মুনাফিকদের যে চরিত্র বর্ণিত হয়েছে, তা আজকের সমাজের কিছু মানুষের সাথে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। সূরা মুনাফিকুনের ৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে তারা দেখতে সুন্দর, কথা শুনতে মধুর, কিন্তু তারা আসলে ঠেস দিয়ে রাখা কাঠের মতো ফাঁপা। তারা মুমিনদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ায়।

হাদিসের আলোকে বিভেদের বিষয়ে রাসুলের কঠোর সতর্কতা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিষয়ে যে সতর্কবার্তা দিয়ে গেছেন, তা শুনলে গা শিউরে ওঠে। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬০৫৮ তে রাসুল (সা) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ মানুষ হলো সে, যে দুই পক্ষের কাছে দুইরকম কথা বলে বেড়ায়।’ হাদীসে বর্ণিত এই ধরনের মানুষদেরকে আমরা চিনি। যারা এক কানে মানুষের শোনে আর আরেক কানে পৌঁছে দেয়, কিন্তু সবসময় কথার মধ্যে পরিবর্তনসহকারে ও মশলা মিশিয়ে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই, দুই পক্ষকে বিপরীতমুখী রাখা, যাতে নিজের গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে। এদেরকে রাসুল (সা) মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ মানুষ হিসেবে চিন্হিত করেছেন। এদের থেকে দূরে থাকা প্রতিটি পরহেজগার মুসলমানের কর্তব্য।

সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬০১১ ও সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৮৬ তে হযরত নু’মান ইবনে বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা) বলেন “মুমিনরা একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতিতে একটি দেহের মতো। শরীরের এক অঙ্গে ব্যথা পেলে পুরো শরীর জ্বর ও নিদ্রাহীনতায় কষ্ট পায়।” হাদিসে রাসূল (সা) মুসলিম উম্মাহকে একটি দেহের সাথে তুলনা করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি এই দেহে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষত তৈরি করে, সে কেবল অন্যের ক্ষতি করছে না বরং পুরো সমাজকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
বর্তমান বাস্তবতার আলোকে আমাদের চারপাশ

রাজনীতির ময়দানে এই ফিতনা ও ফাসাদ ব্যবহারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। নির্বাচনের আগে মানুষকে বিভিন্ন পরিচয়, ধর্ম, অঞ্চল বা জাতিসত্তার ভিত্তিতে বিভক্ত করা হয়। একটি গোষ্ঠীকে অন্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়। সুবিধা হাসিল হয়ে গেলে সেই উস্কানিদাতারা নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়, আর সাধারণ মানুষ পড়ে থাকে ক্ষত-বিক্ষত সম্পর্কের কঠিন ভার নিয়ে।
সামাজিক পর্যায়ে দেখা যায়, গ্রামের সালিশে প্রায়ই এমন মানুষ থাকে, যে আসলে বিরোধ মেটাতে আসে না। তারা আসে বিরোধ টিকিয়ে রাখতে, কারণ এসব সামাজিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মামলা-মোকাদ্দমা চলতে থাকলে তাদের উপস্থিতির মূল্য থাকে আর তাদের আয় উপার্জনও হয়। পরিবারেও এই চিত্র কম দেখা যায় না। ভাইয়ে ভাইয়ে জমি-জমা নিয়ে বিরোধ থাকলে কেউ কেউ প্রত্যেক পক্ষকে আলাদাভাবে উসকে দেয়, মধ্যস্থতার নামে আসলে আগুনে ঘি ঢালে। মসজিদ কমিটি থেকে শুরু করে সর্বত্র এমন কিছু মুখ আছে যারা সবসময় মানুষদেরকে দুই দলে ভাগ করে রাখতে ভালোবাসে। কারণ তারা জানে, একতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা হলে তাদের ভূমিকা শেষ হয়ে যাবে।

বিভেদে দুনিয়া ও আখিরাতের ক্ষতিকর পরিণতি

এই সমস্ত কাজের পরিণতি দুই জগতেই ভয়াবহ। দুনিয়ায় ক্ষতি হলো, যে সমাজে বিভেদ থাকে, সেখানে উন্নয়ন হয় না। মানুষ একসাথে কাজ করতে পারে না, একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারে না। পরিবারগুলো ভেঙে যায়, সম্পদ মামলায় শেষ হয়ে যায়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম শত্রুতার বোঝা বহন করে। আর যে ব্যক্তি এই বিভেদ তৈরি করেছিল, সে একসময় নিজেও একা হয়ে পড়ে, কারণ যে সমাজকে বিশ্বাস করতে শেখেনি, সে সমাজও তাকে আর বিশ্বাস করে না।

আখিরাতের ক্ষতি হলো, কুরআন ও হাদিসের আলোকে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে মুমিনদের মধ্যে বিভেদ ছড়ায়, তাদের জন্য কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে। সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৬৩ তে রাসূল (সা) বলেছেন, চোগলখোর, অর্থাৎ যে দুই পক্ষের মধ্যে কথা বলে বেড়ায় বিভেদ তৈরির উদ্দেশ্যে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

ইসলামের আলোকে বিভেদের সমাধান

ইসলাম কেবল সমস্যা চিহ্নিত করেই থামেনি, সমাধানও দিয়েছে। প্রথমত, সত্য যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ৬ নং এ আল্লাহ নির্দেশ দেন, “কোনো দুর্বৃত্ত যদি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করুন।” তাই কারো কথা শুনেই সিদ্ধান্ত নেবেন না, বিশেষত যখন তা কাউকে ছোট করে বা দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে। দ্বিতীয়ত, ইসলাহ বা সংশোধনের সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। দুই মুসলিমের মধ্যে বিরোধ হলে সেটা মেটানো ফরজের কাছাকাছি। সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৯১৯ এ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘বিরোধ মেটানো নফল নামাজ ও রোজার চেয়ে উত্তম।’ তৃতীয়ত, বিভেদ-সৃষ্টিকারীকে সামাজিকভাবে প্রতিহত করতে হবে। তার কথায় কান না দেওয়া, তাকে প্রশ্রয় না দেওয়া আর এটাই তার সবচেয়ে বড় শাস্তি।

বিভেদ ও শত্রুতা শুধু সমাজকে নয়, মানুষের শরীর ও মনকেও ধ্বংস করে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, ক্রোধ ও বিদ্বেষ রক্তচাপ বাড়ায়, হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। যে মানুষ বিভেদ বুনে বেড়ায়, সে নিজেও এই বিষের মধ্যে ডুবে থাকে, তার ঘুম নষ্ট হয়, মন অশান্ত থাকে, শরীর রোগাক্রান্ত হয়। পক্ষান্তরে, ইসলাম যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ঐক্যের কথা বলেছে, বিজ্ঞানও সেই একই কথা বলছে, শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক ও সামাজিক বন্ধন মানুষকে দীর্ঘজীবী ও সুস্থ রাখে। ইসলামের শিক্ষা তাই শুধু আখিরাতের পথ নয়, এটি একটি সুস্থ, সুখী ও দীর্ঘ জীবনের পথও বটে।

উপসংহার

আমরা এমন একটি সময়ে বসবাস করছি যখন সমাজে বিশ্বাসের সংকট চরমে পৌঁছেছে। মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করতে পারছে না, কারণ বিভেদ সৃষ্টিকারীরা বছরের পর বছর ধরে আমাদের মনে অবিশ্বাসের বীজ বুন রেখেছে। কিন্তু ইসলাম আমাদের বলছে যে, এই অবস্থা মেনে নিও না। যে ব্যক্তি স্বার্থের জন্য মানুষে মানুষে ফাটল ধরায়, সে সমাজের শত্রু, আল্লাহরও শত্রু এবং সে রাসূলের উম্মত বলে দাবি করার যোগ্যতা হারিয়েছে। আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করিযে, কারো বিভেদমূলক কথায় কান দেব না, নিজেরা কোনো বিভেদ ছড়াব না, এবং যেখানে বিরোধ আছে সেখানে ঐক্য ফেরাতে চেষ্টা করব। এটাই ইসলামের শিক্ষা, এটাই মানবতার দাবি। আর বিভেদ যে বোনে, সে নিজেই একদিন একা হয়ে পড়ে। আর যে ঐক্য গড়ে, সে দুনিয়া ও আখিরাত দুই জায়গায়ই সম্মানিত হয়।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

 

  • গ্রুপ
  • মসজিদ