জঙ্গি হামলার শঙ্কা, তদন্ত কতদূর!

লেখক: যথাসময় ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ ঘন্টা আগে

২৯ এপ্রিল পাকিস্তানের নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) মতাদর্শী ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত ৩ এপ্রিল নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’র সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে এক কিশোরকে হেফাজতে নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদের একটি মাদ্রাসায় তৈরি করা বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলার পরিকল্পনা ছিল জঙ্গিদের। মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত মোট ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদিকে, মাদারীপুর সদর উপজেলার ছোট দুধখালী গ্রামের আব্দুল আউয়াল মোড়লের ছেলে ফয়সাল মোড়ল পাকিস্তানে গিয়ে সে যোগ দেন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ‘তেহরিক ই তালিবান’-এ। পরে তাদের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে সে সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছে। 

নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন টিটিপি মতাদর্শী ৪ জন গ্রেপ্তার, ড্রোন-অস্ত্র জব্দ:

পাকিস্তানের নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) মতাদর্শী ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ২৯ এপ্রিল ডিবি প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়  অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মো. ইমরান চৌধুরী (২৯), মো. মোস্তাকিম চৌধুরী (২৫), রিপন হোসেন শেখ (২৮) এবং আবু বকর (২৫)। তাদের মধ্যে ইমরান ও মোস্তাকিম দুই ভাই। অভিযানের পর পুলিশ কামরাঙ্গীরচর থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করেছে।

জঙ্গি হামলার শঙ্কা, তদন্ত কতদূর!

মামলার এজাহারে বলা হয়, মঙ্গলবার ভোর ৩টার দিকে কামরাঙ্গীরচরের কয়লাঘাট এলাকা থেকে প্রথমে ইমরানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কেরানীগঞ্জের জিয়ানগর থেকে মোস্তাকিম এবং বিকেলে কামরাঙ্গীরচরের রসুলপুর এলাকা থেকে রিপন ও আবু বকরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃতরা সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করা এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম ও অস্ত্র সংগ্রহ করেছিল।

এজাহারে আরও বলা হয়, অভিযানে তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ওয়ান-শুটার, ১৪ রাউন্ড গুলি, বেশ কিছু গুলির খোসা, একাধিক স্মার্টফোন, একটি মেটাল ডিটেক্টর, একটি ড্রোন ও ড্রোন সংক্রান্ত সরঞ্জাম, সামরিক পোশাকের কাপড়, ‘জিহাদি’ বই ও লিফলেট উদ্ধার করা হয়।

এরই মধ্যে জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় উগ্রবাদীদের হামলার শঙ্কা নিয়ে পুলিশ সদরদপ্তরের দেওয়া সতর্কবার্তা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট।

সম্প্রতি ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন উগ্রবাদীদের হামলার শঙ্কা নিয়ে পুলিশ কথা বলেছেন। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন বা গোষ্ঠীর নাম এখন প্রকাশ করেননি তিনি।

হামলার আশঙ্কা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হলেও তা নাকচ করে দিয়ে মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, আমরা এই তথ্যটা পেয়েছি এবং সিটিটিসি সাইবার ইন্টেলিজেন্স এটা নিয়ে কাজ করছে। আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা কাজ করছি, ইনশাল্লাহ আমরা এটাকে মোকাবিলা করতে পারব।

রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তো আমাদের সিকিউরিটি প্ল্যানিং, এটা আমার মনে হয় আপনাদের কাছে বলার বিষয় না। তবে যেসব স্থানের বিষয়ে তথ্য এসেছে, সিকিউরিটি প্ল্যানিং অনুযায়ী আমরা সেগুলোতে কাজ করব।

হামলার পরিকল্পনাকারী বা মাস্টারমাইন্ডদের শনাক্ত করা গেছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি জানান, বর্তমানে তদন্ত চলছে এবং এ মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করা সঠিক হবে না। এছাড়া এ ঘটনায় সশস্ত্র বাহিনীর কতজন সদস্য গ্রেপ্তার আছেন, সে বিষয়ে তার কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী মন্তব্য করেছিলেন যে ‘দেশে কোনো জঙ্গি নেই’ এবং বিষয়টিকে তিনি ‘আওয়ামী লীগের জঙ্গি নাটক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটিটিসির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘দেখেন আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। আমরা (জঙ্গি) পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’

সম্প্রতি নিষিদ্ধঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নাশকতার পরিকল্পনা করছে বলে পুলিশ সদরদপ্তর থেকে একটি সতর্কবার্তা জারি করা হয়। গত বৃহস্পতিবার পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট প্রধানদের কাছে পাঠানো ওই বার্তায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

পুলিশের ওই বার্তায় নির্দিষ্ট সংগঠনের নাম উল্লেখ না থাকলেও জানানো হয়েছে যে, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া ইশতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদ নামের এক উগ্রবাদীর সঙ্গে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত দুই সদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে জাতীয় সংসদ, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, উপাসনালয়, বিনোদন কেন্দ্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, এই জঙ্গি গোষ্ঠীটি হামলা চালানোর জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহারের চেষ্টা করছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে পুলিশ সদরদপ্তর সংশ্লিষ্ট সব ইউনিটকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করা, নজরদারি বৃদ্ধি ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। এই সতর্কবার্তাটি অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), সিটিটিসি-সহ পুলিশের সব প্রধান প্রধান ইউনিট ও জেলার পুলিশ সুপারদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ও পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন এই সতর্কবার্তা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের অভ্যন্তরীণ ওই চিঠির তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকজন ব্যক্তি নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন। তারা বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে সুসমন্বিত হামলার পরিকল্পনা করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানান, এ ধরনের সতর্কতা নিয়মিত সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অংশ। তবে এটি উগ্রবাদী হুমকির বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন সতর্কতার প্রয়োজনীয়তাকেই তুলে ধরে। নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

নব্য জেএমবি সন্দেহে কিশোরকে হেফাজতে নিল সিটিটিসি:

নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’র সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে এক কিশোরকে হেফাজতে নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। গত ৩ এপ্রিল ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আরিফা আখতার প্রীতি এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

২ এপ্রিল দুপুরে হবিগঞ্জ সদর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে সিটিটিসির একটি দল ওই কিশোরকে হেফাজতে নেয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, শেরে বাংলা নগর থানায় দায়ের করা একটি সন্ত্রাসবিরোধী মামলার এজাহারভুক্ত আসামি আহসান জহির খান, ড্যানিয়েল ইসলাম হাসান এবং রাসেল ওরফে পলাশ ওরফে আবু বাছের আল ফারুকীর সাথে কিশোরের যোগাযোগ ছিল।

এসি আরিফা আখতার প্রীতি গণমাধ্যমমে দেওয়া ভাষ্য- হেফাজতে নেওয়া কিশোর অনলাইনে অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। সে তথাকথিত দাওলাতুল ইসলাম (আইএস)-এর পক্ষে উগ্রবাদী পোস্ট শেয়ার করে সদস্য সংগ্রহের কাজ করত।

এছাড়া অনলাইনে বোমা তৈরির পিডিএফ ফাইল শেয়ার এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে শিয়া মসজিদ, পুলিশের চেকপোস্ট ও ইসকন মন্দিরে হামলার পরিকল্পনা ও উসকানি দিত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বিধি অনুযায়ী কিশোরকে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

পুলিশ সদরদপ্তরের দেওয়া সতর্কবার্তা : দ্য ডিসেন্ট থেকে নেওয়া তথ্য

পুলিশ সদরদপ্তরের দেওয়া সতর্কবার্তা চিঠির প্রথম পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘সম্প্রতি গ্রেপ্তারকৃত নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী আবু বক্কর আবু মোহাম্মদ এর সাথে চাকরিচ্যুত দুই জন সেনাসদস্যের (কপি সংযুক্ত) নিয়মিত যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহে (জাতীয় সংসদ, বাংলাদেশ পুলিশ/সেনাবাহিনীর সদস্য অথবা স্থাপনাসমূহ, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্রসমূহ, শাহবাগ চত্বর প্রভৃতিতে) বোমা বিস্ফোরণ এমনকি দেশীয় ধারালো অস্ত্র কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা করতে পারে মর্মেও জানা যায়। এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্রাগারে হামলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকতে পারে। দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য তারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এমতাবস্থায়, বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহের নিরাপত্তা জোরদারকরণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। এছাড়াও নজরদারি বৃদ্ধিসহ বর্ণিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও অনুরোধ করা হলো।’ পরের পৃষ্ঠায় ‘হামলা পরিকল্পনাকারী ব্যক্তিদের নাম এবং পরিচয়’ হিসেবে দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে।

তাদের একজন হলেন, মোহাম্মদ রাহেদ হোসেন মাহেদ এবং অন্যজন মো. রাকিব হাসান। এদের উভয়ের বিভিন্ন ছদ্মনাম রয়েছে। পুলিশ ও গোয়েন্দাদের একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়েছে, এই দুই ব্যক্তির মধ্যে মাহেদ সেনা সদস্য; যার বাড়ি সিলেটে। রাকিব সেনা সদস্য নন। তার বাড়ি ঢাকার ধামরাই এলাকায়। এদের মধ্যে মাহেদ কোথায় আছেন বা তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছ কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে রাকিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক সূত্র। তাকে ঢাকার নিকটবর্তী একটি থানায় তাকে রাখা হয়েছে। গোপনীয় চিঠিতে দুই সেনাসদস্যের কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে একজন মোহাম্মদ রাহেদ হোসেন মাহেদ। কিন্তু অন্যজনের নাম চিঠিতে নেই।

মাহেদের ফেসবুক প্রোফাইলে যা পাওয়া গেছে: দ্য ডিসেন্ট থেকে নেওয়া তথ্য

গোপনীয় চিঠিতে সেনাসদস্য মাহেদ এবং সিভিলিয়ান রাকিবের ফেসবুক প্রোফাইল পোস্ট বিশ্লেষণ করেছে দ্য ডিসেন্ট।
দেখা গেছে, সাবেক এই সেনাসদস্য নিয়মিত উগ্রপপন্থি বিভিন্ন ধরনের কন্টেন্ট শেয়ার দিতেন। সিলেটকেন্দ্রিক অনলাইনে কাপড়ের ব্যবসা করার পাশাপাশি নিয়মিত উগ্রপন্থি লেখালেখি করতেন। এমনকি ভিন্ন চিন্তার ব্যক্তিদের হত্যার আকাঙ্ক্ষা জানিয়ে পোস্ট দিতেন তিনি। আল-কায়েদা নেতা আনোয়ার আল আওলাকির ছবিও পোস্ট করতেন তিনি।

২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট তিনি ফেসবুকে লেখেন, ‘সেনাবাহিনী দলগত মুরতাদ। প্রথমত এর কারণে বারাত। দ্বিতীয় বারাতের কারণ হলো ওরা জালেম। তৃতীয় বারাতের কারণ হলো ওরা আওয়ামী দোসর।’ সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখ এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আল্লাহর জমিন প্রশস্ত। সুতরাং যে জমিনে আল্লাহর সঙ্গে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাফরমানি করতে হয়, শিরক করতে হয়, তাগুতের কাছে বিচার চাইতে হয়, সে জমিন হয় ফিতনামুক্ত করার চেষ্টা করো তলোয়ার দ্বারা, অথবা সে জমিন ত্যাগ করো।’ ৫ সেপ্টেম্বর এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘মাজারপূজারি, মিলাদুন্নবী পালনকারীরা মুশরিক, বেদাতি। এদেরকে হত্যা করা বৈধ, রক্ত সর্বাবস্থায় হালাল। সুতরাং, হে মুমিনরা প্রস্তুতি গ্রহণ করো।’

জুলাইয়ের ১৬ তারিখে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘তারা জঙ্গি বলে আমাদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ফেলতে চায়। জানিয়ে দাও, এটাই আমাদের পরিচয়। আমি কে, তুমি কে—জঙ্গি, জঙ্গি।’ ২০২৫ এর ১৫ আগস্ট মাহেদের একটি পোস্ট ভাইরাল হয় ফেসবুকে। সেটিতে লিখেছিলেন, ‘১৫ আগস্ট সারা দিন…বঙ্গবনল্ডুকে তাকফির করার দিন…। পুরো শেখ পরিবার কাফের শুধু নাবালক বাচ্চারা ছাড়া , শেখের অনুসারীরা কাফের, তার দলের নেতারা কাফের, কর্মীরা কাফের। তাদেরকে মুসলমান মনে করা শায়েখরাও কাফের।’

দ্বিতীয় যে সেনাসদস্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে (নাম উল্লেখ করা হয়নি) চিঠিতে তার পরিচয় জানাতে পারেনি কোনো সূত্র।তবে চিঠিতে উল্লেখিত সিভিলিয়ান রাকিব হাসান ছদ্মনামে একাধিক ফেসবুক আইডি পরিচালনা করেন। তার মূল আইডিটি ডিএক্টিভ থাকলেও অন্য আরও দুটি আইডি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিনি জঙ্গি সংগঠন আইএস এর সমর্থনে বিভিন্ন কন্টেন্ট শেয়ার করতেন। শেষে ‘উসামা’ নামের একটি আইডি থেকে ইরাকে আইএস জঙ্গিদের পতাকা বহনের একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশন দেয়া হয়েছে, ‘দুটি পথ আছে: হয় বিজয়, যা আমরা অর্জন করি, অথবা জান্নাত, যেখানে রয়েছে সবচেয়ে মনোরম আবাস। আমরা হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করি না, হাজার হাজার বীর জড়ো করেও নয়। আমরা সেই বিশ্বাস নিয়ে যুদ্ধ করি, যার পতাকা আমাদের প্রাথমিক দিনগুলোতে বিজয় নিশ্চিত করেছিল। দারুল ইসলাম।’

মাদ্রাসায় বিস্ফোরণে ভেস্তে যায় বড় হামলার পরিকল্পনা:

গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর কেরাণীগঞ্জের হাসনাবাদের উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ বোমা দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলার পরিকল্পনা ছিল জঙ্গিদের। একইসঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হুমকি দেওয়ারও চেষ্টা করছিল নিষিদ্ধ একটি জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা। গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গত প্রায় চার মাসেও ঘটনার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত মোট ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা বিস্ফোরক ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে হামলার পরিকল্পনা ছিল তাদের। পাশাপাশি এসব বিস্ফোরণের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যও ছিল।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃতরা নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশের (জেএমজেবি) সমর্থক। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংগঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহ, সমর্থন ও প্ররোচনা দিয়ে আসছিল।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, মাদ্রাসার আড়ালে সেখানে জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালিত হতো। আস্তানা গড়ে বোমা তৈরি করা হচ্ছিল, যার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির পরিকল্পনা ছিল। তবে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাতেই তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
ঘটনার পর বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে মূল অভিযুক্ত জঙ্গি নেতা ও বোমা তৈরির কারিগর আল আমিন শেখসহ মোট ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মামলার তদন্ত সংস্থা এন্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)। তাদের মধ্যে সাতজন এজাহারভুক্ত আসামি।

তদন্ত সূত্র জানায়, গ্রেফতারকৃতদের কয়েক দফা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এসময় গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, যা যাচাই-বাছাই চলছে। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, শেখ আল আমিনসহ গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে কয়েকজন এর আগেও অন্তত পাঁচ থেকে সাতবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তবে জামিনে বেরিয়ে আবারও একই কাজ শুরু করেন। জানা গেছে, শেখ আল আমিনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ ৭টি মামলার তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মামলাগুলো বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, বিস্ফোরণের আলামত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। তবে প্রতিবেদন এখনও পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদন হাতে পেলে তদন্ত কার্যক্রম আরও গতি পাবে এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত সহজ হবে।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন, ২০২২ সালের ১ এপ্রিল মাসিক ১০ হাজার টাকায় জনৈক পারভীন বেগমের কাছ থেকে বাড়িটি ভাড়া নেন মুফতি হারুন নামে এক ব্যক্তি। পরে সেখানে ‘উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা’ নামে প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়। তবে মাদ্রাসার আড়ালে সেখানে বোমা তৈরি ও জঙ্গি সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলতো বলে ধারণা তদন্ত সংশ্লিষ্টদের।

জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে দীর্ঘদিন কাজ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, এজাহারে উল্লেখিত জেএমজেবি মূলত জেএমবির একটি উপ-সংগঠন ছিল। জেএমবির শীর্ষ নেতা ছিলেন শায়খ আব্দুর রহমান এবং জেএমজেবি পরিচালিত হতো সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে। পরবর্তীকালে সংগঠনটির সদস্যরা ‘নব্য জেএমবি’ নামে আত্মপ্রকাশ করে এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতাদর্শ অনুসরণ শুরু করে।

এটিইউ’র পুলিশ সুপার (মিডিয়া অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস উইং) মাহফুজুল আলম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ঘটনাগুলোগুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এখনই বলার মতো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।

 

  • জঙ্গি
  • তদন্ত
  • শঙ্কা
  • হামলা