হামের এ মৃত্যুমিছিল কি রোধ করা যেত না?

লেখক: মুমতা হেনা মীম
প্রকাশ: ৪ ঘন্টা আগে
ছবি : মুমতা হেনা মীম

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে জনস্বাস্থ্যের আঙিনায় বাংলাদেশ যখন একের পর এক সাফল্যের জয়তিলক পরছিল, তখন ‘হাম’ বা মিজলস ছিল এক পরাসৃত শত্রুর নাম। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI)-এর অভূতপূর্ব সাফল্যে আমরা যখন বৈশ্বিক রোল মডেলে উন্নীত হয়েছিলাম, তখন কল্পনা করাও কঠিন ছিল যে, ২০২৬ সালের এই বসন্ত-পরবর্তী দাহকালে আমাদের আবার শিশুদের নিথর দেহের সারি গুনতে হবে। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, প্রতিদিন শিশুদের প্রাণ ঝরছে; মোট মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫৩-এ। আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান না বরং এটা একটা জাতীয় ট্র্যাজেডি এবং আমাদের জনস্বাস্থ্য কাঠামোর চরম এক পরাজয়ের দলিল।

প্রশ্ন উঠছে, বিজ্ঞানের এই স্বর্ণযুগে একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য ব্যাধি কেন মহামারির রূপ নিল? এই মৃত্যুমিছিল কি আমাদের প্রশাসনিক উদাসীনতা ও কাঠামোগত ব্যর্থতার এক অনিবার্য পরিণতি নয়? বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের ইতিহাসে টিকাদান কর্মসূচি ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই উজ্জ্বলতাকে ম্লান করে দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ-এর তথ্যমতে, কোনো জনপদে হামের সংক্রমণ রুখতে হলে ন্যূনতম ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনা জরুরি। একে বলা হয় ‘হার্ড ইমিউনিটি’। অথচ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা দেখছি এক বিপরীতমুখী যাত্রা।

২০১৯ সালে যেখানে হামের প্রথম ডোজের কভারেজ ছিল ৮৮.৬ শতাংশ, তা বর্তমানে ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে। আরও ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে দ্বিতীয় ডোজের ক্ষেত্রে—৮৯ শতাংশ থেকে পতন ঘটে তা এখন ৮০.৭ শতাংশে এসে ঠেকেছে। এই যে প্রায় ১৫-২০ শতাংশ শিশুর মধ্যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা সুরক্ষা-বিচ্যুতি তৈরি হলো, তারাই আজ ভাইরাসের সহজ শিকারে পরিণত হয়েছে। পরিসংখ্যানের এই ব্যবধান কেবল সংখ্যার খেলা নয়; এটি হাজার হাজার শিশুর জীবনের ঝুঁকি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা প্রশাসনিক পালাবদলকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানোর সুযোগ নেই; কারণ জনস্বাস্থ্য কোনো সাময়িক রাজনৈতিক এজেন্ডা হতে পারে না!

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে তথ্যের চেয়েও দ্রুত ছড়ায় ‘ভুল তথ্য’ (Misinformation)। করোনা মহামারি-পরবর্তী সময়ে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে যে একধরনের অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছিল, তা প্রান্তিক পর্যায়ে এক গভীর আস্থার সংকট তৈরি করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞানবর্জিত অপপ্রচার এবং ধর্মীয় অপব্যাখ্যার সংমিশ্রণে এক বিষাক্ত বলয় তৈরি হয়েছে, যা অনেক অভিভাবককে টিকাদান কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে পুষ্টিহীনতার এক দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। বিশেষ করে গ্রামীণ ও শহরের বস্তি এলাকার শিশুদের মধ্যে ভিটামিন-A এর অভাব প্রকট। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, ভিটামিন-A এর স্বল্পতা হামের জটিলতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত অন্ধত্ব, নিউমোনিয়া বা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জনস্বাস্থ্য বিভাগ পেরেছে কি এই পুষ্টিহীনতা আর অপপ্রচারের যুগপৎ আক্রমণ ঠেকাতে? উত্তরটি আজ বুকের মানিক হারা শত শত মায়ের আর্তনাদে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।

হাম কেবল একটি দেশের সমস্যা নয়, এটা একটা অত্যন্ত সংক্রামক বায়ুবাহিত রোগ। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভৌগোলিক সান্নিধ্য এবং অবাধ যাতায়াত এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশের ৫৮টি জেলায় ভাইরাসের এই বিস্তার প্রমাণ করে যে, প্রাথমিক পর্যায়ে সংক্রমণ শনাক্ত এবং ‘রিং ভ্যাসিনেশন’ করার ক্ষেত্রে আমাদের নজরদারি ব্যবস্থা (Surveillance system) শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। যখন একটি সংক্রমণ একটি নির্দিষ্ট পকেট থেকে জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন বুঝতে হবে আমাদের ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ শুধুমাত্র কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল!

একসময় মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের যে তৎপরতা ছিল, তাতে ভাটা পড়েছে কেন? টিকাদান কর্মসূচিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারা এবং সময়মতো ‘ক্যাচ-আপ’ ক্যাম্পেইন (ঝরে পড়া শিশুদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি) পরিচালনা না করা একটি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ‘হাম কর্নার’ স্থাপনে বিলম্ব এবং আইসোলেশন ব্যবস্থার অপ্রতুলতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।

আমরা দেখেছি, যখন কোনো সংকট ঘনীভূত হয়, তখন দাপ্তরিক ফাইল চালাচালি বা একে অপরের ওপর দোষারোপের সংস্কৃতি প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু এই আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার মূল্য দিতে হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোর রুটিন কাজের বাইরে গিয়ে জরুরি অবস্থা মোকাবিলার যে সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন ছিল, তার অভাব আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এই অন্ধকার সময় কাটিয়ে উঠতে হলে আমাদের প্রথাগত চিন্তার বাইরে এসে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করতে হবে। আমাদের দাবিগুলো কেবল প্রশাসনের প্রতি নয়, বরং সচেতন প্রতিটা মানুষের প্রতিও।

জরুরি ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’: প্রতিটি দুর্গম অঞ্চল, চর এলাকা এবং শহরের বস্তিতে চিরুনি অভিযানের মাধ্যমে টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। একটি শিশুও যেন ভ্যাকসিনের আওতার বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান ব্যবস্থা পুনরায় সচল করতে হবে। ভ্যাকসিনের প্রতি ভীতি দূর করতে কেবল সরকারি বিজ্ঞাপন যথেষ্ট নয়। মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, শিক্ষক এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের মাধ্যমে ভুল ধারণার বিনাশ ঘটাতে হবে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সাপোর্ট, ভিটামিন-A সাপ্লিমেন্ট এবং আইসোলেশন বেড নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকদের জন্য বিশেষায়িত প্রোটোকল এবং লজিস্টিক সহায়তা দিতে হবে যাতে জটিল রোগীদের রেফারেল সিস্টেম দ্রুততর হয়।

নজরদারি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা: কেন নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সংক্রমণ বেশি, কেন টিকার হার কমল, এ নিয়ে নিবিড় গবেষণার প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এমন মহামারি ঠেকাতে একটি স্বাধীন ‘জনস্বাস্থ্য কমিশন’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি। এই যে লক্ষ্যমাত্রা থেকে বিচ্যুতি ঘটল, এর পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি পয়সা এবং প্রতিটি টিকার ডোজ যেন সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন।

একটি জাতির উন্নয়নের মাপকাঠি কেবল তার জিডিপি বা অবকাঠামো নয়, বরং তার শিশুদের জীবনের নিরাপত্তা। হামে আক্রান্ত হয়ে একটি শিশুর মৃত্যু মানে কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, বরং এটা আধুনিক রাষ্ট্রের ব্যর্থতার স্মারক। আমরা উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশের দিকে ধাবিত হচ্ছি, অথচ আমাদের শিশুরা আদিম এক রোগে মারা যাচ্ছে, এই বৈপরীত্য মেনে নেওয়া যায় না।

আমরা আর কোনো পরিসংখ্যান চাই না, আর কোনো শোক সংবাদের শিরোনাম চাই না। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশুর সুরক্ষা পাওয়া তার সাংবিধানিক অধিকার, মৌলিক অধিকার! হামের এই মৃত্যুমিছিল এখনই থামাতে হবে। আজকের গৃহীত পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে আমাদের আগামীর প্রজন্ম একটি রোগমুক্ত শৈশব পাবে, নাকি আবারো কোনো অব্যবস্থাপনার বলি হবে। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে তবে এখনো সবটুকু শেষ হয়ে যায়নি। সরকার এবং জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ আর সদিচ্ছাই পারে এই বিপর্যয় থেকে আমাদের রক্ষা করতে।

লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক; শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

  • জনস্বাস্থ্য
  • মৃত্যু
  • হাম